১৯৫০-এর দশকের শেষ নাগাদ ক্লাসিক্যাল পারমাণবিক সারল্য—ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রনের শান্তিপূর্ণ জগত—এক চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলায় রূপ নিল। শক্তিশালী কণা ত্বরকযন্ত্রে (Particle Accelerators) পরমাণু চূর্ণবিচূর্ণ করে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করতে লাগলেন শত শত নতুন কণা: পাইয়ন, কাওন, ল্যাম্বডা, সিগমা, ডেল্টা। বিজ্ঞানী উইলিস ল্যাম্ব নোবেল বক্তৃতায় রসিকতা করে বলেছিলেন, নতুন কোনো কণা আবিষ্কারকারীকে দশ হাজার ডলার জরিমানা করা উচিত! এই বিশৃঙ্খল ‘কণা চিড়িয়াখানায়’ শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে আধুনিক স্ট্যান্ডার্ড মডেলের পথ তৈরি করেন ক্যালটেকের বহুভাষাবিদ পদার্থবিজ্ঞানী মারে গেল-ম্যান।
স্ট্রেঞ্জনেস ও অষ্টমার্গ (Eightfold Way)
নতুন আবিষ্কৃত কণাগুলোর একটি অদ্ভুত স্বভাব ছিল: তারা সবল নিউক্লীয় বলের মাধ্যমে খুব দ্রুত ($১০^{-২৩}$ সেকেন্ডে) তৈরি হতো, কিন্তু দুর্বল বলের মাধ্যমে অতি ধীরগতিতে ($১০^{-১০}$ সেকেন্ডে) ক্ষয় হতো। ১৯৫৩ সালে গেল-ম্যান এবং কাজুহিকো নিশজিমা একটি নতুন কোয়ান্টাম সংখ্যা প্রবর্তন করলেন: স্ট্রেঞ্জনেস বা অদ্ভুততা ($S$):
$$Q = I_3 + frac{B + S}{2}$$
১৯৬১ সালে গেল-ম্যান গণিতের Lie গ্রুপ $SU(3)$ প্রয়োগ করে কণাগুলোকে ষড়ভুজ ও অষ্টভুজের মতো নান্দনিক জ্যামিতিক প্যাটার্নে সাজালেন। বৌদ্ধ দর্শনের অষ্টাঙ্গিক মার্গ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি এই ব্যবস্থার নাম দিলেন অষ্টমার্গ (The Eightfold Way)।
ওমেগা-মাইনাস (Ω⁻) কণার ঐতিহাসিক ভবিষ্যদ্বাণী
স্পিন-$3/2$ বেরিয়ন কণাগুলোকে যখন দশটি ঘরের পিরামিডে সাজানো হলো, তখন দেখা গেল পিরামিডের চূড়ার স্থানটি সম্পূর্ণ খালি। গেল-ম্যান ঘোষণা করলেন যে সেখানে একটি অনাবিষ্কৃত কণা থাকা আবশ্যক: ওমেগা-মাইনাস ($Omega^-$), যার চার্জ হবে $-1$ এবং ভর হবে প্রায় ১৬৮০ $text{MeV}/c^2$।
১৯৬৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্রুকহ্যাভেন ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিতে বুদবুদ চেম্বারের ১ লাখ ছবি বিশ্লেষণ করে অবিকল সেই বৈশিষ্ট্যের ওমেগা-মাইনাস কণাটি শনাক্ত করা হলো। এটি ছিল মেন্ডেলিভের পর্যায় সারণির মতো বিজ্ঞানের এক বিশাল বিজয়।
কোয়ার্ক হাইপোথিসিস
কণাগুলো কেন এরকম জ্যামিতিক বিন্যাস মেনে চলে? ১৯৬৪ সালে গেল-ম্যান (এবং স্বাধীনভাবে জর্জ জয়েগ) এক বৈপ্লবিক প্রস্তাব দিলেন: প্রোটন ও নিউট্রন আসলে কোনো মৌলিক কণা নয়! তারা তৈরি হয়েছে ভগ্নাংশ চার্জযুক্ত স্পিন-$1/2$ বিশিষ্ট অতি ক্ষুদ্র উপাদান দিয়ে।
জেমস জয়েসের উপন্যাস ‘ফিনেগানস ওয়েক’-এর একটি রহস্যময় লাইন “Three quarks for Muster Mark!” থেকে গেল-ম্যান এদের নাম দিলেন কোয়ার্ক (Quark):
- আপ কোয়ার্ক ($u$): চার্জ $= +frac{2}{3}e$
- ডাউন কোয়ার্ক ($d$): চার্জ $= -frac{1}{3}e$
- স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক ($s$): চার্জ $= -frac{1}{3}e$
এই সরল বিন্যাসে প্রোটন হলো দুটি আপ ও একটি ডাউন কোয়ার্কের মিলন ($uud to +frac{2}{3} + frac{2}{3} – frac{1}{3} = +1$), আর নিউট্রন হলো একটি আপ ও দুটি ডাউন কোয়ার্কের সমষ্টি ($udd to +frac{2}{3} – frac{1}{3} – frac{1}{3} = 0$)।
স্ল্যাকের গভীর অস্থিতিস্থাপক বিচ্ছুরণ ও স্ট্যান্ডার্ড মডেল
১৯৬৮ থেকে ১৯৭১ সালের মধ্যে স্ট্যানফোর্ডের SLAC এক্সিলারেটরে ২০ বিলিয়ন ইলেকট্রন-ভোল্ট শক্তিতে প্রোটনের ওপর ইলেকট্রন আঘাত করা হলো। রাদারফোর্ডের পরীক্ষার মতো ইলেকট্রনগুলো প্রোটনের ভেতরের শক্ত বিন্দু-সদৃশ কণায় আঘাত খেয়ে ছিটকে গেল—প্রমাণিত হলো কোয়ার্ক নিছক গাণিতিক কল্পনা নয়, বাস্তব ভৌত কণা।
পরবর্তীতে আরও তিনটি ভারী কোয়ার্ক আবিষ্কৃত হয়: চার্ম ($c$), বটম ($b$) এবং টপ ($t$)। গ্লুয়ন বাহিত সবল নিউক্লীয় বলের মাধ্যমে আবদ্ধ হয়ে এই কোয়ার্কগুলোই গড়ে তুলেছে আধুনিক কণা পদার্থবিজ্ঞানের স্ট্যান্ডার্ড মডেল (Standard Model):
$$SU(3)_C times SU(2)_L times U(1)_Y$$