বিশেষ আপেক্ষিকতা তড়িৎ-চৌম্বকবিদ্যার সাথে বলবিদ্যাকে সুসংহত করলেও তাতে একটি মারাত্মক সীমাবদ্ধতা ছিল: এটি কেবল ত্বরণহীন জড় কাঠামোর জন্য কার্যকর ছিল এবং এটি নিউটনের সার্বজনীন মহাকর্ষ সূত্রের সাথে সাংঘর্ষিক ছিল (যেখানে মহাকর্ষকে অসীম দূরত্বে তাৎক্ষণিক ক্রিয়াশীল বল মনে করা হতো)। ১৯০৫ থেকে ১৯১৫—দীর্ঘ দশ বছরের অবিরাম তাত্ত্বিক সংগ্রামের পর আলবার্ট আইনস্টাইন মহাকর্ষকে স্থান-কালের জ্যামিতিতে রূপান্তর করেন এবং জন্ম নেয় সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব।
জীবনের সবচেয়ে সুখকর ভাবনা: সমতুল্যতার নীতি
১৯০৭ সালের এক সকালে পেটেন্ট অফিসে বসে আইনস্টাইন এক যুগান্তকারী চিন্তায় নিমগ্ন হন, যাকে তিনি পরবর্তীকালে বলেছিলেন তাঁর “জীবনের সবচেয়ে সুখকর ভাবনা”:
“যদি কোনো ব্যক্তি মুক্তভাবে নিচে পতিত হয়, তবে সে নিজের ওজন অনুভব করবে না। সে নিজেকে মহাকর্ষহীন একটি শান্ত অঞ্চলে অনুভব করবে।” — আলবার্ট আইনস্টাইন
এই উপলব্ধি জন্ম দিল সমতুল্যতার নীতি (Equivalence Principle): স্থানীয়ভাবে মহাকর্ষের প্রভাব এবং একটি রকেটের ত্বরণের প্রভাবের মধ্যে কোনো পরীক্ষামূলক পার্থক্য নেই। জড় ভর ($m_i$) এবং মহাকর্ষীয় ভর ($m_g$) প্রকৃতির মৌলিক স্তরে হুবহু এক।
এই কাল্পনিক পরীক্ষা থেকেই আইনস্টাইন বুঝলেন যে মহাকর্ষের কারণে আলোকেও বেঁকে যেতে হবে: একটি ত্বরান্বিত লিফটের ভেতর দিয়ে যাওয়া আলোক রশ্মি মেঝের দিকে প্যারাবলিক পথে বেঁকে যায়। সুতরাং মহাকর্ষ আলোর গতিপথকে বাঁকিয়ে দেয়।
অ-ইউক্লিডীয় জ্যামিতি ও ফিল্ড সমীকরণ
স্থান ও সময় যদি ভর দ্বারা দুমড়ে-মুচড়ে যায়, তবে ইউক্লিডের সাধারণ সমতল জ্যামিতি সেখানে অচল। গণিতবিদ বন্ধু মার্সেল গ্রসম্যানের সহায়তায় আইনস্টাইন দ্বারস্থ হলেন বের্নহার্ড রিম্যান ও কার্ল ফ্রিডরিখ গাউসের তৈরি করা অ-ইউক্লিডীয় বক্র জ্যামিতির।
মহাজাগতিক স্থান-কাল হলো একটি চার-মাত্রিক রিম্যানীয় ম্যানিফোল্ড। ১৯১৫ সালের ২৫ নভেম্বর প্রুশিয়ান একাডেমি অব সায়েন্সেসে আইনস্টাইন তাঁর চূড়ান্ত ফিল্ড সমীকরণ (Einstein Field Equations) উপস্থাপন করলেন:
$$G_{munu} + Lambda g_{munu} = frac{8pi G}{c^4} T_{munu}$$
যেখানে $G_{munu}$ হলো স্থান-কালের জ্যামিতিক বক্রতা নির্দেশক আইনস্টাইন টেনসর, আর $T_{munu}$ হলো মহাবিশ্বের ভর, শক্তি ও ভরবেগের বিন্যাস নির্দেশক এনার্জি-মোমেন্টাম টেনসর।
বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী জন আর্কিবাল্ড হুইলার এই সমীকরণের অন্তর্নিহিত রূপ ব্যাখ্যা করেছেন এক অমর বাক্যে: “স্থান-কাল পদার্থকে বলে কীভাবে চলতে হবে; আর পদার্থ স্থান-কালকে বলে কীভাবে বেঁকে যেতে হবে।”
বুধ গ্রহের অসংগতি এবং ১৯১৯ সালের সূর্যগ্রহণ
দশকের পর দশক ধরে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বুধ গ্রহের কক্ষপথের অনুসূর বিন্দুর (Perihelion) এক অদ্ভুত চলন নিয়ে বিভ্রান্ত ছিলেন—প্রতি শতাব্দীতে ৪৩ আর্কসেকেন্ডের যে বিচ্যুতির ব্যাখ্যা নিউটনের মহাকর্ষ তত্ত্ব দিয়ে মেলানো যাচ্ছিল না। আইনস্টাইন তাঁর সমীকরণে বুধের কক্ষপথ বসাতেই কোনো বাড়তি অনুমিতি ছাড়াই কাঁটায় কাঁটায় সেই ৪৩ আর্কসেকেন্ডের উত্তর বেরিয়ে এলো।
আর চূড়ান্ত প্রমাণ এলো ১৯১৯ সালের ২৯ মে পূর্ণ সূর্যগ্রহণে। ব্রিটিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী স্যার আর্থার এডিংটন পশ্চিম আফ্রিকার প্রিন্সিপে দ্বীপে গিয়ে সূর্যের পাশ দিয়ে আসা তারার আলোর বিচ্যুতি ক্যামেরাবন্দি করলেন। আইনস্টাইনের তত্ত্ব অনুযায়ী আলো বাঁকার কোণ হওয়ার কথা ছিল:
$$theta = frac{4GM}{c^2 R} approx ১.৭৫ text{ আর্কসেকেন্ড}$$
এডিংটনের ছবিগুলো আইনস্টাইনের পূর্বাভাসকে সত্য প্রমাণ করল। ৭ নভেম্বর ১৯১৯ লন্ডনের দ্য টাইমস শিরোনাম করল: “বিজ্ঞানে মহাবিপ্লব — মহাবিশ্বের নতুন তত্ত্ব — নিউটনের ধারণার পতন।” আইনস্টাইন বিশ্বজোড়া কিংবদন্তিতে পরিণত হলেন, আর মহাবিশ্ব নিজেকে মেলে ধরল এক গতিশীল জ্যামিতিক ক্যানভাস হিসেবে।