বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে জ্যোতির্বিজ্ঞান দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী দর্শনে বিভক্ত ছিল: ফ্রেড হয়েলের ‘স্থির অবস্থা মডেল’ (Steady State Model), যেখানে মহাবিশ্বকে চিরন্তন ও অবিনশ্বর মনে করা হতো; এবং জর্জ গ্যামোর ‘বিগ ব্যাং মডেল’ (Big Bang Model), যেখানে মহাবিশ্বকে এক আদিম মহাবিস্ফোরণের সৃষ্টি হিসেবে ভাবা হতো। ১৯৬৪ সালের বসন্তে নিউ জার্সির ক্রফোর্ড হিলে বেল ল্যাবরেটরির এক বিশালাকার রেডিও অ্যান্টেনা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দুই তরুণ জ্যোতির্বিজ্ঞানী এক অমীমাংসিত ফিসফিসানি শব্দের সন্ধান পেলেন—যা ছিল মহাবিশ্ব সৃষ্টির সরাসরি সাক্ষ্য।

জর্জ গ্যামোর আদিম অগ্নিকুণ্ডের ভবিষ্যদ্বাণী

১৯৪৮ সালে রুশ-আমেরিকান পদার্থবিজ্ঞানী জর্জ গ্যামো এবং রাল্ফ অ্যালফার হিসাব কষে দেখান যে মহাবিশ্বের সূচনালগ্নে যখন তাপমাত্রা ছিল কোটি কোটি ডিগ্রি, তখন পুরো মহাবিশ্ব ছিল এক তীব্র কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণে ভরা প্লাজমা।

স্থান-কালের প্রসারণের সাথে সাথে এই আদিম ফোটন তরঙ্গের দৈর্ঘ্যও মহাজাগতিক স্কেল ফ্যাক্টরের অনুপাতে প্রসারিত হতে থাকে:

$$lambda_{text{obs}} = lambda_{text{emit}} (1 + z)$$

অ্যালফার ও রবার্ট হারম্যান ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে সেই মহাজাগতিক সৃষ্টির উত্তাপ ১৩৮০ কোটি বছর ধরে প্রসারিত হয়ে শীতল হতে হতে আজ মহাবিশ্বজুড়ে এক হিমশীতল তাপমাত্রায় (প্রায় ৫ কেলভিন) অবশিষ্ট থাকার কথা।

হলমডেলের হর্ন অ্যান্টেনা ও কবুতরের উৎপাত

১৯৬৪ সালে বেল ল্যাবসের আর্নো পেনজিয়াস এবং রবার্ট উইলসন একটি ২০-ফুট হর্ন অ্যান্টেনা নিয়ে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির রেডিও তরঙ্গ মাপার কাজ করছিলেন। কিন্তু অ্যান্টেনায় ৭.৩৫ সেন্টিমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যে সার্বক্ষণিক এক অতিরিক্ত গোলমাল বা নয়েজ ধরা পড়তে লাগল, যা প্রায় ৩.৫ কেলভিন তাপমাত্রার বিকিরণের সমতুল্য।

দিন বা রাত, গ্রীষ্ম বা শীত—অ্যান্টেনা আকাশের যে প্রান্তেই তাক করা হোক না কেন, এই হিসহিস শব্দ অবিকল সমান। তাঁরা অ্যান্টেনার যন্ত্রাংশ পরিষ্কার করলেন, ফাটল টেপ দিয়ে মুড়ে দিলেন, এমনকি অ্যান্টেনায় বাসা বাঁধা দুটি পায়রাকে তাড়িয়ে তাদের ফেলে যাওয়া সাদা বিষ্ঠাও ধুয়ে মুছে ফেললেন। কিন্তু সেই রহস্যময় মহাজাগতিক গুঞ্জন একটুও কমল না!

প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংযোগ ও কসমিক ডিকপলিং

মাত্র ৩০ মাইল দূরে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে রবার্ট ডিক এবং জিম পিবলসের দল তখন বিগ ব্যাং-এর অবশিষ্ট বিকিরণ খোঁজার জন্য একটি অ্যান্টেনা বানাচ্ছিলেন। পেনজিয়াস যখন হতাশ হয়ে ডিককে ফোন করলেন, ডিক তাৎক্ষণিকভাবে বুঝলেন কী ঘটেছে। ফোন রেখে তিনি তাঁর সহকর্মীদের বললেন: “বন্ধুরা, আমাদের কাজটা অন্যরা করে ফেলেছে!”

১৯৬৫ সালে দুটি দল যৌথভাবে গবেষণা প্রকাশ করল। পেনজিয়াস ও উইলসন যা পেয়েছিলেন তা হলো মহাজাগতিক অণুতরঙ্গ পটভূমি বিকিরণ (Cosmic Microwave Background – CMB)। মহাবিশ্বের বয়স যখন মাত্র ৩ লাখ ৮০ হাজার বছর ছিল ($z approx ১১০০$), তখন ইলেকট্রন ও প্রোটন মিলিত হয়ে নিরপেক্ষ হাইড্রোজেন তৈরি করে। ফলে ফোটনগুলো স্বাধীনভাবে মহাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে এবং দীর্ঘ ১৩৮০ কোটি বছর ধরে পথ চলে আজ আমাদের টেলিস্কোপে এসে ধরা দেয়।

প্রকৃতির বিশুদ্ধতম কৃষ্ণবস্তু

১৯৮৯ সালে নাসা মহাকাশে পাঠায় কোবে (COBE) স্যাটেলাইট। জন ম্যাথারের নেতৃত্বে FIRAS যন্ত্র যখন CMB-এর বিকিরণ বর্ণালী মাপল, তখন দেখা গেল প্লাঙ্কের কৃষ্ণবস্তুর তাত্ত্বিক বক্ররেখার সাথে ডেটার প্রতিটি বিন্দু হুবহু মিলে গেছে:

$$T_0 = ২.৭২৫৪৮ pm ০.০০০৫৭ text{ কেলভিন}$$

একই সাথে জর্জ স্মুট CMB-এর ভেতর এক লক্ষ ভাগের এক ভাগ তাপমাত্রার সূক্ষ্ম তারতম্য বা ‘কোয়ান্টাম দোলনা’ আবিষ্কার করলেন—যার মহাকর্ষীয় টানেই পরবর্তীতে গড়ে উঠেছে মহাবিশ্বের সমস্ত ছায়াপথ, নক্ষত্র এবং আমাদের সৌরজগৎ। জ্যোতির্বিজ্ঞান পরিণত হলো এক নিখুঁত পদার্থবিজ্ঞানে।