বিজ্ঞানের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে সংঘটিত রাসায়নিক বিপ্লবের মতো নাটকীয় রূপান্তর খুব কমই দেখা যায়। ১৭৭৫ সালের পূর্বেও রসায়ন ছিল মূলত গুণগত বর্ণনামূলক এক বিভ্রান্তিকর বিদ্যা—যেখানে ছিল রহস্যময় ফ্লজিস্টনের আধিপত্য এবং অবৈজ্ঞানিক নামের বিশৃঙ্খলা। কিন্তু মাত্র পনেরো বছরের মধ্যে এক ফরাসি রাজকীয় রাজস্ব কর্মকর্তা ও গবেষক অঁতোয়ান-লরেন্ট দ্য লাভোয়াজিয়ে (১৭৪৩–১৭৯৪) এবং তাঁর প্রতিভাধর সহধর্মিণী ও চিত্রশিল্পী মারি-অ্যান পলজ (১৭৫৮–১৮৩৬) রসায়নকে একটি নির্ভুল, গাণিতিক এবং পরিমাণগত বিজ্ঞানে রূপান্তর করেন।
লাভোয়াজিয়ের প্রধান হাতিয়ার ছিল প্যারিসের দক্ষ কারিগরদের নির্মিত অতিসূক্ষ্ম রাসায়নিক পাল্লা (ব্যালেন্স), যা মিলিগ্রামের ভগ্নাংশ পর্যন্ত ওজন নির্ভুলভাবে মাপতে পারত। পূর্ববর্তী গবেষকরা যেখানে কেবল রঙের পরিবর্তন বা বুদবুদ পর্যবেক্ষণ করতেন, লাভোয়াজিয়ে সেখানে বিক্রিয়ক, পাত্র, উত্তাপ এবং আবদ্ধ গ্যাস—প্রতিটি উপাদানের নিখুঁত ওজন লিপিবদ্ধ করতেন।
ফ্লজিস্টন তত্ত্বের ঐতিহাসিক অবসান
খোলা পাত্রে সীসা বা টিন পোড়ালে দেখা যেত উৎপন্ন ছাই বা ক্যালক্স ধাতুর চেয়ে ভারী। ফ্লজিস্টনপন্থীরা এই অসঙ্গতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দাবি করতেন ফ্লজিস্টনের নাকি ‘ঋণাত্মক ওজন’ রয়েছে—যা নিউটনের মহাকর্ষীয় পদার্থবিদ্যার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। লাভোয়াজিয়ে একটি আবদ্ধ পদ্ধতির পরীক্ষার মাধ্যমে এই ভুলের চির অবসান ঘটান।
তিনি একটি নির্দিষ্ট ওজনের টিন নির্দিষ্ট পরিমাণ বাতাসসহ একটি কাচের রিটর্টে আবদ্ধ করে মুখ সিল করে দেন এবং সম্পূর্ণ ব্যবস্থার প্রাথমিক ওজন নেন। তীব্র উত্তাপে টিন পুড়ে সাদা পাউডারে পরিণত হয়। পাত্রটি খোলার পূর্বে পুনরায় ওজন মেপে দেখা যায় তার ওজন একবিন্দুও পরিবর্তন হয়নি—ঠিক শূন্য। কিন্তু যখনই তিনি কাচের মুখ ভাঙলেন, তীব্র শব্দে বাইরে থেকে বাতাস ভেতরে প্রবেশ করল। দেখা গেল, ধাতুটি বাতাসের যে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করে ভারী হয়েছিল, পাত্রের বাতাস ঠিক সমপরিমাণ হালকা হয়েছিল। অর্থাৎ, দহন কোনো রহস্যময় ফ্লজিস্টনের নিষ্ক্রমণ নয়; দহন হলো বাতাসের এক সক্রিয় উপাদানের সাথে ধাতুর সরাসরি রাসায়নিক মিলন বা জারণ।
ভরের নিত্যতা সূত্র
এই আবদ্ধ সিস্টেমের পরীক্ষা থেকে লাভোয়াজিয়ে আধুনিক বিজ্ঞানের অন্যতম অমর সত্য প্রতিষ্ঠা করেন—ভরের নিত্যতা বা সংরক্ষণ সূত্র:
$$sum m_{text{বিক্রিয়ক}} = sum m_{text{উৎপাদ}}$$
“প্রকৃতিতে বা গবেষণাগারে কোনো বস্তুই আপনা-আপনি সৃষ্টি বা ধ্বংস হয় না; যেকোনো রাসায়নিক পরিবর্তনের পূর্বে ও পরে পদার্থের মোট ভর সর্বদা সমপরিমাণ ও অপরিবর্তিত থাকে।”
— অঁতোয়ান লাভোয়াজিয়ে, ত্রেতে এলমেঁতের দ্য শিমি (১৭৮৯)
১৭৮৯ সালে মারি-অ্যান পলজের চিত্রিত ও অনূদিত বিখ্যাত বই ত্রেতে এলমেঁতের দ্য শিমি-তে লাভোয়াজিয়ে শতাব্দীর প্রাচীন অবৈজ্ঞানিক পরিভাষাগুলো বাতিল করে দেন। ‘লেড সুগার’ পরিণত হলো লেড অ্যাসিটেটে, ‘মাখন অব অ্যান্টিমণি’ হলো অ্যান্টিমণি ট্রাইক্লোরাইড। হাজার বছর ধরে একক মৌলিক উপাদান ভাবা জলকে তিনি হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের যৌগ হিসেবে প্রমাণ করেন। ১৭৯৪ সালে ফরাসি বিপ্লবের সন্ত্রাসকালে গিলোটিনে লাভোয়াজিয়ের মর্মান্তিক মৃত্যু হলেও তাঁর প্রতিষ্ঠিত গাণিতিক ভিত্তি আধুনিক রসায়নের চিরন্তন ভাষারূপে টিকে রয়েছে।