প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে মধ্যযুগ পর্যন্ত পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলকে একটি অবিভাজ্য ও একক উপাদান হিসেবে ভাবা হতো: “বায়ু”। বাতাসকে কোনো সক্রিয় রাসায়নিক উপাদান নয়, বরং জীবনের শ্বাসপ্রশ্বাস গ্রহণ এবং শব্দ সঞ্চালনের একটি নিস্ক্রিয় মাধ্যম হিসেবে গণ্য করা হতো। বাতাস যে বিভিন্ন স্বতন্ত্র গ্যাসীয় উপাদানের মিশ্রণ হতে পারে—যার কোনোটি শ্বাসরোধকারী, কোনোটি অতিদাহ্য, আবার কোনোটি জীবনের জন্য অপরিহার্য—এমন ধারণা সপ্তদশ শতাব্দীর বিজ্ঞানীদের কাছে ছিল সম্পূর্ণ অকল্পনীয়। এই ভুল ধারণা ভাঙার ঐতিহাসিক বৈজ্ঞানিক অভিযানই রসায়নের ইতিহাসে নিউম্যাটিক বিপ্লব নামে খ্যাত।

নিউম্যাটিক রসায়নের সূচনা ঘটে ১৭৫০-এর দশকে স্কটিশ চিকিৎসক জোসেফ ব্ল্যাক-এর (১৭২৮–১৭৯৯) মাধ্যমে। ম্যাগনেসিয়াম কার্বনেট মৃদু তাপে উত্তপ্ত করে এবং নির্গত গ্যাসকে তরলের ওপর আবদ্ধ করে ব্ল্যাক আবিষ্কার করেন “স্থির বায়ু” বা কার্বন ডাই-অক্সাইড ($CO_2$)। সাধারণ বায়ুর বিপরীতে এই গ্যাস জ্বলন্ত মোমবাতি নিভিয়ে দিত এবং প্রাণীদের শ্বাসরোধ করত। এর কিছুদিন পর ইংরেজ বিজ্ঞানী হেনরি ক্যাভেন্ডিশ (১৭৩১–১৮১০) দস্তা ও লোহার ওপর সালফিউরিক অ্যাসিড ঢেলে এক অতি হালকা ও বিস্ফোরক গ্যাস পৃথক করেন, যার নাম তিনি দেন “দাহ্য বায়ু” বা হাইড্রোজেন ($H_2$)। বাতাস যে আর একক কোনো উপাদান নয়, তা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ফ্লজিস্টন তত্ত্বের কর্তৃত্ব

কিন্তু গবেষণাগারে একের পর এক নতুন গ্যাস আবিষ্কৃত হলেও তৎকালীন রসায়ন এক ভ্রান্ত ধারণায় আচ্ছন্ন ছিল: জার্মান রসায়নবিদ গেয়র্গ আর্নস্ট স্টাল (১৬৫৯–১৭৩৪) কর্তৃক প্রচারিত ফ্লজিস্টন তত্ত্ব। এই তত্ত্ব অনুসারে, সকল দাহ্য পদার্থ—কাঠকয়লা, গন্ধক, ফসফরাস এবং ধাতু—এর ভেতরে থাকে ‘ফ্লজিস্টন’ নামের এক ওজনহীন বা ঋণাত্মক ওজনের দাহ্য অগ্নি-উপাদান। যখন কাঠ পোড়ে বা ধাতুতে মরিচা ধরে, তখন সেই ফ্লজিস্টন মুক্ত হয়ে বায়ুমণ্ডলে মিশে যায়:

$$text{ধাতু} longrightarrow text{ধাতব ছাই (ক্যালক্স)} + text{মুক্ত ফ্লজিস্টন}$$

বাতাস কেবল এই নির্গত ফ্লজিস্টনকে শুষে নেওয়ার একটি স্পঞ্জ হিসেবে কাজ করে। আবদ্ধ পাত্রে মোমবাতি নিভে গেলে ফ্লজিস্টনপন্থীরা দাবি করতেন বাতাস ফ্লজিস্টনে এতটাই পরিপূর্ণ হয়ে গেছে যে তা আর নতুন ফ্লজিস্টন গ্রহণ করতে পারছে না।

জোসেফ প্রিস্টলি ও আতশি কাচের পরীক্ষা

যিনি এই রহস্যের সমাধান উন্মোচন করেন, কিন্তু কৌতূহলজনকভাবে সারাজীবন ফ্লজিস্টন তত্ত্বের কট্টর সমর্থক ছিলেন, তিনি হলেন ইংরেজ বিজ্ঞানী জোসেফ প্রিস্টলি (১৭৩৩–১৮০৪)। লিডস শহরের এক মদের কারখানার পাশে বাস করার সুবাদে প্রিস্টলি গেঁজে ওঠা বিয়ারের ভ্যাট থেকে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইড নিয়ে পরীক্ষা করতেন। তিনি তৈরি করেন সোডা ওয়াটার এবং জলের পরিবর্তে পারদ ব্যবহার করে এমন এক বায়ু-সংগ্রাহক ড্রাম তৈরি করেন যা জলে দ্রবীভূত হয় এমন গ্যাস (যেমন অ্যামোনিয়া, সালফার ডাই-অক্সাইড, হাইড্রোজেন ক্লোরাইড) সংগ্রহ করতে পারত।

১৭৭৪ সালের ১ আগস্ট উইল্টশায়ারের বাউউড হাউসের ল্যাবরেটরিতে প্রিস্টলি এক ঐতিহাসিক পরীক্ষা পরিচালনা করেন। ১২ ইঞ্চি ব্যাসের এক বিশাল আতশি কাচ দিয়ে তিনি সূর্যের তীব্র রশ্মিকে পারদের ওপর আবদ্ধ লাল রঙের পারদ-ভস্ম (মারকিউরিক অক্সাইড, $HgO$) এর ওপর কেন্দ্রীভূত করেন:

$$2HgO_{(s)} xrightarrow{Delta} 2Hg_{(l)} + O_{2(g)}$$

মুহূর্তের মধ্যে কাচের নলের গায়ে রূপালী পারদের ফোঁটা জমতে শুরু করে এবং ওপরে জমতে থাকে এক বর্ণহীন গ্যাস। প্রিস্টলি যখন এই গ্যাস পরীক্ষা করেন, তখন তিনি স্তম্ভিত হয়ে যান: একটি টিমটিমে জ্বলন্ত কাঠের কাঠি এই গ্যাসে প্রবেশ করানোর সাথে সাথে তা চোখ ধাঁধানো উজ্জ্বল শিখা নিয়ে দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে; এবং সাধারণ বাতাসের তুলনায় একটি ইঁদুর এই গ্যাসে দ্বিগুণ সময় বেঁচে থাকে। প্রিস্টলি নিজে যখন এই গ্যাস শ্বাস নিয়ে গ্রহণ করেন, তখন তিনি এক অসাধারণ ফুরফুরে অনুভূতি রেকর্ড করেন: “কিছুক্ষণের জন্য আমার বুক অত্যন্ত হালকা ও সতেজ বোধ হয়েছিল… কিন্তু কে জানে ভবিষ্যতে এই বিশুদ্ধ বায়ু হয়তো ধনীদের এক বিলাসিতার বস্তুতে পরিণত হবে!”

দুই তত্ত্বের ঐতিহাসিক সংঘাত

ফ্লজিস্টন তত্ত্বের মোহে অন্ধ হয়ে প্রিস্টলি এই নতুন গ্যাসের নাম দেন ডিফলজিস্টিকেটেড বায়ু। তিনি ভাবলেন, এই গ্যাসে ফ্লজিস্টন একেবারেই নেই বলেই এটি জ্বলন্ত বস্তু থেকে পাগলের মতো ফ্লজিস্টন চুষে নেয়। ১৭৭৪ সালের অক্টোবর মাসে প্রিস্টলি প্যারিস সফরে যান এবং এক নৈশভোজে ফরাসি অভিজাত রসায়নবিদ অঁতোয়ান লাভোয়াজিয়ে-এর সাথে দেখা করেন। সেখানে প্রিস্টলি তাঁর নতুন গ্যাসের পরীক্ষার কথা সবিস্তারে বর্ণনা করেন। লাভোয়াজিয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে শোনেন—এবং মুহূর্তেই অনুধাবন করেন যা প্রিস্টলি দেখতে পাননি: এটি কোনো ‘ডিফলজিস্টিকেটেড বায়ু’ নয়, এটি হলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের প্রধান সক্রিয় অক্সিজেন উপাদান এবং রসায়ন বিজ্ঞানের বহু প্রতীক্ষিত বৈপ্লবিক চাবিকাঠি।