দিমিত্রি মেন্ডেলিফের পর্যায় সারণি রসায়নকে আলোকিত করেছিল ঠিকই, কিন্তু এর গভীরে এক হতাশাজনক কূটাভাস লুকিয়ে ছিল। মেন্ডেলিফ মৌলগুলোকে সাজিয়েছিলেন পারমাণবিক ভরের ক্রমানুসারে। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে কঠোরভাবে পারমাণবিক ভর অনুসরণ করলে পর্যায় সারণির পরিবারগুলো এলোমেলো হয়ে যেত। টেলুরিয়ামের পারমাণবিক ভর (১২৭.৬) আয়োডিনের (১২৬.৯) চেয়ে বেশি হওয়া সত্ত্বেও রাসায়নিক ধর্মের কারণে টেলুরিয়ামকে আগে বসাতে হতো। আর্গনের ভর (৩৯.৯৫) সক্রিয় ক্ষার ধাতু পটাসিয়ামের (৩৯.১০) চেয়ে বেশি; কিন্তু ভর মেনে চললে একটি নিস্ক্রিয় গ্যাসকে ক্ষার ধাতুর সারিতে ঠেলে দিতে হতো। বিজ্ঞানীরা বাধ্য হয়ে হাত দিয়ে এগুলো উল্টে দিতেন, কিন্তু কোনো তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা তাঁদের জানা ছিল না।
এই রহস্যের যবনিকা পতন ঘটান ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে আর্নেস্ট রাদারফোর্ডের ল্যাবরেটরিতে কর্মরত এক তরুণ ব্রিটিশ পদার্থবিদ: হেনরি গুইন জেফ্রিস মোজলি (১৮৮৭–১৯১৫)। মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে মোজলি বিজ্ঞানের ইতিহাসের অন্যতম দুঃসাহসিক গবেষণায় হাত দেন।
এক্স-রে বর্ণালীবীক্ষণ ও মোজলির সূত্র
ম্যাক্স ফন লাউয়ে ও ব্র্যাগ পিতা-পুত্রের ক্রিস্টাল ডিফ্রেকশন আবিষ্কারের পর মোজলি লক্ষ্য করেন ক্যাথোড রশ্মির তীব্র ইলেকট্রন কোনো ধাতব লক্ষ্যবস্তুকে আঘাত করলে ধাতু থেকে নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ এক্স-রে বর্ণালী রেখা নিঃসৃত হয়—যা প্রতিটি ধাতুর জন্য একান্তই নিজস্ব ফিঙ্গারপ্রিন্ট।
১৯১৩–১৯১৪ সালে মোজলি একটি ভ্যাকুয়াম টিউবের ভেতর অ্যালুমিনিয়াম (১৩) থেকে সোনা (৭৯) পর্যন্ত ডজন ডজন ধাতব পাতের ওপর ক্যাথোড রশ্মি নিক্ষেপ করেন এবং পটাসিয়াম ফেরোসায়ানাইড ক্রিস্টাল দিয়ে বিচ্ছুরিত এক্স-রে ফোটোগ্রাফিক প্লেটে রেকর্ড করেন।
মোজলি যখন নিঃসৃত এক্স-রে তরঙ্গের কম্পাঙ্কের বর্গমূল ($sqrt{nu}$) বনাম মৌলের অবস্থানের ছক তৈরি করলেন, তখন পারমাণবিক ভরের মতো কোনো আঁকাবাঁকা রেখা বের হলো না—বেরিয়ে এলো এক নিখুঁত, জাদুকরী সরলরেখা:
$$sqrt{nu} = mathcal{C} cdot (Z – sigma)$$
এটিই হলো পদার্থবিজ্ঞানের বিখ্যাত মোজলির সূত্র। মোজলি ঘোষণা করলেন এই $Z$ কোনো সাধারণ আনুমানিক সংখ্যা নয়; এটি হলো পরমাণুর নিউক্লিয়াসে থাকা ধনাত্মক চার্জের পরম বাস্তব সংখ্যা—যাকে আমরা আজ বলি পারমাণবিক সংখ্যা (প্রোটন সংখ্যা):
“পরমাণুর ভেতর এমন একটি মৌলিক ভৌত সত্তা রয়েছে, যা এক মৌল থেকে পরবর্তী মৌলে এক একক করে নিখুঁতভাবে বৃদ্ধি পায়। এই রাশিটি পরমাণুর কেন্দ্রীয় ধনাত্মক নিউক্লিয়াসের আধান ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না।”
— হেনরি মোজলি (ফিলোসফিক্যাল ম্যাগাজিন, ১৯১৩)
মোজলির এই আবিষ্কার পর্যায় সারণির সমস্ত অসঙ্গতি মুহূর্তেই মুছে দিল। টেলুরিয়াম ($Z = ৫২$) স্বাভাবিকভাবেই আয়োডিনের ($Z = ৫৩$) আগে বসে গেল; আর্গন ($Z = ১৮$) স্থান নিল পটাসিয়ামের ($Z = ১৯$) পূর্বে। মোজলি প্রমাণ করলেন হাইড্রোজেন ($Z = ১$) থেকে ইউরেনিয়াম ($Z = ৯২$) পর্যন্ত প্রকৃতিতে ঠিক এবং কেবল ৯২টি মৌল থাকা সম্ভব। তিনি ৪৩, ৬১, ৭২ ও ৭৫ নম্বরের অনাবিষ্কৃত ফাঁকা ঘরগুলো সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে যান। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে যোগ দিয়ে ১৯১৫ সালের আগস্টে গ্যালিপোলির রণাঙ্গনে মাত্র সাতাশ বছর বয়সে এক স্নাইপারের গুলিতে মোজলি শহীদ হন। তাঁর অকালমৃত্যুতে নোবেলজয়ী রবার্ট মিলিকান লিখেছিলেন: “বিজ্ঞানের ইতিহাসে সবচেয়ে দূরদর্শী ও নিখুঁত গবেষণার মাধ্যমে মাত্র ছাব্বিশ বছরের এক যুবক এমন এক জানালা খুলে দিয়েছিলেন যা দিয়ে আমরা পরমাণুর অন্তর্জগতকে প্রত্যক্ষ করতে পারি।”