আপনার বেঁচে থাকার প্রতিটি সেকেন্ডে আপনার শরীর একটি নির্দিষ্ট অণু বিপুল পরিমাণে খরচ ও পুনরুৎপাদন করছে: অ্যাডিনোসিন ট্রাইফসফেট বা এটিপি (ATP)। একজন সুস্থ মানুষ দৈনিক প্রায় ৪০ কিলোগ্রাম এটিপি খরচ করে এবং পুনরায় তৈরি করে; আর ভারী শারীরিক পরিশ্রমে এই হার মিনিটে আধা কিলোগ্রাম পর্যন্ত পৌঁছায়। জীবনের ‘সার্বজনীন শক্তির মুদ্রা’ হিসেবে পরিচিত এই এটিপি পেশির সংকোচন, প্রোটিন তৈরি, স্নায়ুর সংকেত এবং কোষীয় সকল কাজ পরিচালনা করে। কিন্তু এই বিপুল পরিমাণ এটিপি উৎপাদনের পেছনে জৈব রাসায়নিক মেকানিজম কী—তা কয়েক দশক ধরে বিজ্ঞানের সর্বশ্রেষ্ঠ অমীমাংসিত রহস্য ছিল।

১৯৪০ ও ৫০-এর দশকে শীর্ষ প্রাণরসায়নবিদরা একটি কাল্পনিক উচ্চ-শক্তি মধ্যবর্তী যৌগ “$sim X$”-এর সন্ধান করছিলেন, যা খাদ্যের জারণ থেকে শক্তি গ্রহণ করে সরাসরি ADP-কে ATP-তে রূপান্তরিত করবে বলে মনে করা হতো। কিন্তু বহু বছর ধরে লাখ লাখ ডলার খরচ করেও এই কাল্পনিক যৌগের কোনো হদিস মিলল না।

গ্লিন হাউসের দূরদর্শী বিজ্ঞানী: পিটার মিচেল

বিজ্ঞানের এই বন্ধ দুয়ার উন্মোচন করেন এক ব্যতিক্রমী ব্রিটিশ বিজ্ঞানী: পিটার ডেনিস মিচেল (১৯২০–১৯৯২)। প্রাতিষ্ঠানিক অনড়তায় বিরক্ত হয়ে মিচেল এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করে কর্নওয়ালের এক নির্জন ম্যানর হাউস ‘গ্লিন হাউস’-এ নিজস্ব ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৬১ সালে নেচার জার্নালে তিনি প্রকাশ করেন তাঁর বৈপ্লবিক ক্যামিওসমোটিক অনুকল্প।

মিচেল প্রস্তাব করেন যে কোষের শক্তি স্থানান্তর কোনো সাধারণ জলীয় দ্রবণের রাসায়নিক বিক্রিয়া নয়; এটি হলো কোষীয় মেমব্রেন বা ঝিল্লির ভেতর দিয়ে পরিচালিত এক দিকমুখী ভৌত-তড়িৎ প্রক্রিয়া (মাইটোকনড্রিয়ার অন্তঃঝিল্লি বা ব্যাকটেরিয়ার প্লাজমা মেমব্রেন)।

প্রোটন চালিকা শক্তি ও আণবিক ঘূর্ণায়মান মোটর

শ্বসন প্রক্রিয়ায় খাদ্যের ইলেকট্রন যখন বিভিন্ন পরিবাহকের মধ্য দিয়ে অক্সিজেনের দিকে ধাবিত হয়, তখন মুক্ত শক্তিকে কাজে লাগিয়ে মাইটোকনড্রিয়ার ভেতর থেকে বাইরে হাইড্রোজেন আয়ন (প্রোটন, $H^+$) পাম্প করা হয়। এর ফলে মেমব্রেনের দুই পাশে জন্ম নেয় এক প্রচণ্ড তড়িৎ-রাসায়নিক বিভব—প্রোটন চালিকা শক্তি ($Delta p$):

$$Delta p = Delta psi – frac{২.৩০৩ , mathcal{R} mathcal{T}}{mathcal{F}} Delta text{pH}$$

এখানে $Delta psi$ হলো মেমব্রেন ভোল্টেজ (সাধারণত প্রায় ১৬০–১৮০ মিলিভোল্ট, যা মাত্র ৫ ন্যানোমিটার পুরু ঝিল্লির ওপর প্রতি সেন্টিমিটারে কয়েক লক্ষ ভোল্টের বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র তৈরি করে)।

এই প্রচণ্ড শক্তিতে উদ্বুদ্ধ প্রোটনগুলো আবার ভেতরে ফিরে আসার কেবল একটি পথ পায়: একটি বিস্ময়কর দানবীয় আণবিক টারবাইন—যার নাম এটিপি সিন্থেস (ATP Synthase)। মেমব্রেনে থাকা এই জটিল প্রোটিনের মধ্য দিয়ে প্রোটন যখন হুড়মুড় করে প্রবেশ করে, তখন তা সেন্ট্রাল রোটরটিকে প্রতি মিনিটে প্রায় ৯,০০০ বার গতিতে ঘুরিয়ে দেয়! এই যান্ত্রিক ঘূর্ণনের ফলে এটিপি সিন্থেসের বাইরের অংশটি সংকুচিত হয়ে ADP ও অজৈব ফসফেটকে চেপে ধরে এটিপি অণুতে রূপান্তর করে। জীবনের এই আশ্চর্য জৈব-যান্ত্রিক টারবাইনের রহস্য উন্মোচনের জন্য পিটার মিচেল ১৯৭৮ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন।