ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে রসায়নবিজ্ঞান পদার্থের সংযুক্তি ও গঠন নিখুঁতভাবে আয়ত্ত করেছিল: ডাল্টন পরমাণুর ভর মেপেছিলেন, অ্যাভোগাড্রো অণু গণনা করেছিলেন এবং মেন্ডেলিফ সাজিয়েছিলেন পর্যায় সারণি। কিন্তু রাসায়নিক বিক্রিয়ার কেন্দ্রীয় প্রশ্নটি তখনও অমীমাংসিত ছিল: কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়া আদৌ কেন ঘটে, এবং কীসের ভিত্তিতে স্বতঃস্ফূর্ত রূপান্তরের দিক নির্ধারিত হয়?

প্রাথমিক যুগের থার্মোকেমিস্টরা মনে করতেন কেবল তাপোৎপাদী বিক্রিয়াগুলোই ($Delta H < 0$) স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটতে পারে। কিন্তু প্রকৃতি প্রতিনিয়ত এই ধারণার ভুল প্রমাণ করছিল: অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট জলে দ্রবীভূত করলে দ্রবণ বরফের মতো শীতল হয়ে পড়ে (তাপশোষী বিক্রিয়া), অথচ বিক্রিয়াটি সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটে। স্পষ্টতই, কেবল এনথালপি বা তাপ নির্গমন দিয়ে প্রকৃতির রূপান্তরের চালিকাশক্তি ব্যাখ্যা করা অসম্ভব ছিল।

ইয়েলের নিভৃতচারী বিজ্ঞানী: জোসাইয়া উইলার্ড গিবস

এই মহাজাগতিক রহস্যের সমাধান কোনো ইউরোপীয় রাজকীয় ল্যাবরেটরি থেকে আসেনি, এসেছিল যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাটের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অন্তর্মুখী গণিতজ্ঞের কাছ থেকে: জোসাইয়া উইলার্ড গিবস (১৮৩৯–১৯০৩)। ১৮৭৬ থেকে ১৮৭৮ সালের মধ্যে কানেকটিকাট একাডেমির জার্নালে গিবস প্রকাশ করেন তাঁর তিনশত পৃষ্ঠার অমর তাত্ত্বিক গবেষণা: “অন দ্য ইকুইলিব্রিয়াম অব হেটেরোজেনিয়াস সাবস্ট্যান্সেস” (বিষম পদার্থের সাম্যাবস্থা)।

গিবস তাপগতিবিদ্যার প্রথম সূত্র (শক্তির নিত্যতা) এবং রুডলফ ক্লসিয়াসের দ্বিতীয় সূত্রকে (বিচ্ছিন্ন ব্যবস্থার এন্ট্রপি সর্বদা বৃদ্ধি পায়) রসায়নে প্রয়োগ করেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন স্থির তাপমাত্রা ও চাপে পরিচালিত গবেষণাগার, জীবকোষ বা বায়ুমণ্ডলের স্বতঃস্ফূর্ত বিক্রিয়ার দিক নির্ধারিত হয় এমন এক থার্মোডাইনামিক বিভব দ্বারা—যা আজ গিবস মুক্ত শক্তি ($mathcal{G}$) নামে খ্যাত:

$$Delta mathcal{G} = Delta mathcal{H} – mathcal{T} Delta mathcal{S}$$

এখানে $Delta mathcal{H}$ হলো এনথালপির পরিবর্তন (বিনিময়কৃত তাপ), $mathcal{T}$ হলো কেলভিন স্কেলে পরম তাপমাত্রা এবং $Delta mathcal{S}$ হলো এন্ট্রপির পরিবর্তন (অণুর বিশৃঙ্খলা ও শক্তির বিস্তৃতি)। গিবস গাণিতিকভাবে প্রমাণ করেন একটি রাসায়নিক বিক্রিয়া স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটতে পারে কেবল এবং কেবল তখনই যদি:

$$Delta mathcal{G} < 0$$

রাসায়নিক বিভব ও দশা সূত্র

গিবস উদ্ভাবন করেন রাসায়নিক বিভব ($mu_i$)-এর ধারণা। রাসায়নিক বিভব কাজ করে পদার্থের ‘থার্মোডাইনামিক ভোল্টেজ’ হিসেবে। যেভাবে উচ্চ তাপমাত্রা থেকে নিম্ন তাপমাত্রায় তাপ প্রবাহিত হয়, এবং উচ্চ ভোল্টেজ থেকে নিম্ন ভোল্টেজে তড়িৎ প্রবাহিত হয়—ঠিক একইভাবে উচ্চ রাসায়নিক বিভবের অঞ্চল থেকে নিম্ন রাসায়নিক বিভবের দিকে পদার্থ স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিক্রিয়া ও স্থানান্তরিত হয়। যখন উভয় দিকের রাসায়নিক বিভব সমান হয়ে যায় ($mu_{text{বিক্রিয়ক}} = mu_{text{উৎপাদ}}$), তখন বিক্রিয়াটি নিখুঁত সাম্যাবস্থায় ($Delta mathcal{G} = 0$) উপনীত হয়।

পাশাপাশি গিবস আবিষ্কার করেন তাঁর বিখ্যাত দশা সূত্র: $F = C – P + 2$। বিশুদ্ধ গাণিতিক যুক্তির মাধ্যমে গিবস রাসায়নিক তাপগতিবিদ্যা, ধাতুর মিশ্রণ ও আধুনিক ম্যাটেরিয়াল সায়েন্সের এক দুর্ভেদ্য ভিত্তি স্থাপন করে যান।