আধুনিক সভ্যতার দিকে একবার তাকান: সিন্থেটিক পোশাক, নাইলন দড়ি, পলিথিন প্যাকেজিং, পলিকার্বোনেট চশমা, টেফলন প্রলেপ এবং কার্বন ফাইবারের উড়োজাহাজ। একবিংশ শতাব্দীর ভৌত জগত নিশ্চিতভাবেই একটি পলিমারের যুগ। অথচ মাত্র এক শতাব্দী আগেও বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় রসায়নবিদরা দাবি করতেন যে দীর্ঘ শিকলযুক্ত দৈত্যাকার অণুর কোনো বাস্তব অস্তিত্ব থাকা অসম্ভব। এই বিশালাকার অণুগুলোর বাস্তবতাকে প্রতিষ্ঠিত করার বৈজ্ঞানিক সংগ্রাম ছিল রসায়নের ইতিহাসের অন্যতম তীব্র বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধ।

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে জৈব রসায়ন ‘ক্ষুদ্র অণু’র ধারণায় অন্ধ ছিল। প্রাকৃতিক রাবার, স্টার্চ বা প্রোটিনের ওজন যখন সাধারণ অণুর চেয়ে হাজার গুণ বেশি পাওয়া যেত, তখন শীর্ষ গবেষকরা দাবি করতেন এগুলো আসলে কলয়েডাল পুঞ্জ—যেখানে ছোট ছোট অণু কোনো দুর্বল আন্তঃআণবিক শক্তিতে একসঙ্গে জড়ো হয়ে থাকে। ১৯২০ সালে যখন জার্মান রসায়নবিদ হারমান স্টডিনজার (১৮৮১–১৯৬৫) এই ধারণার বিরুদ্ধে দাঁড়ান, তখন তাঁর এক সহকর্মী অধ্যাপক তাঁকে সতর্ক করেছিলেন: “প্রিয় সহকর্মী, এই দৈত্যাকার অণুর ধারণা ত্যাগ করুন… প্রকৃতিতে ম্যাক্রোমলিকিউল বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব থাকতে পারে না!”

ম্যাক্রোমলিকিউলার অনুকল্প (১৯২০)

ইটিএইচ জুরিখ ও পরবর্তীতে ফ্রাইবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্টডিনজার পরাজয় মানতে অস্বীকৃতি জানান। ১৯২০ সালে প্রকাশিত তাঁর ঐতিহাসিক গবেষণাপত্রে তিনি উপস্থাপন করেন বিখ্যাত ম্যাক্রোমলিকিউলার অনুকল্প: রাবার, সেলুলোজ বা পলিস্টাইরিন কোনো আলগা পুঞ্জ নয়; এগুলো হলো এক একটি একক দানবীয় অণু—যেখানে শত শত বা হাজার হাজার পুনরাবৃত্তিকারী মনোমার সমযোজী কার্বন-কার্বন বন্ধন দ্বারা একটি অটুট দীর্ঘ শিকলে আবদ্ধ থাকে।

এটি প্রমাণ করার জন্য স্টডিনজার প্রস্তুত করেন হাইড্রো-রাবার। তিনি যুক্তি দেন, রাবার যদি ক্ষণস্থায়ী কোনো পুঞ্জ হতো, তবে হাইড্রোজেন দ্বারা এর দ্বিবন্ধন সম্পৃক্ত করলে তা ভেঙে পাতলা তরলে পরিণত হতো। কিন্তু দেখা গেল সম্পৃক্ত করার পরেও তা পূর্বের মতোই অতিসান্দ্র ও ভারী রইল। অর্থাৎ এর শিকল ছিল সমযোজী বন্ধনে চিরস্থায়ী।

সান্দ্রতার সূত্র ও পলিমার বিপ্লব

স্টডিনজার তরলের সান্দ্রতার সাথে পলিমার শিকলের দৈর্ঘ্যের গাণিতিক সম্পর্ক আবিষ্কার করেন, যা স্টডিনজারের সান্দ্রতা সূত্র নামে পরিচিত:

$$[eta] = mathcal{K}_m cdot mathcal{M}^alpha$$

একটি সাধারণ কাচের নলের মধ্য দিয়ে পলিমার দ্রবণের প্রবাহের গতি মেপেই রসায়নবিদরা প্রথমবারের মতো এই দৈত্যাকার অণুগুলোর বিশাল আণবিক ভর সরাসরি পরিমাপ করতে সক্ষম হন।

স্টডিনজারের এই আবিষ্কার বিশ্বজুড়ে নতুন পদার্থের বিপ্লব ঘটায়। ডুপন্ট ল্যাবরেটরিতে ওয়ালেস ক্যারোদার্স তৈরি করেন নাইলন ও নিওপ্রিন; জিগলার ও নাট্টা উদ্ভাবন করেন পলিথিন ও পলিপ্রপিলিনের অনুঘটক। কিন্তু এর চেয়েও বড় তাৎপর্য ছিল জীববিজ্ঞানে: দীর্ঘ সমযোজী শিকল ছাড়া ডিএনএ-এর বংশগতির তথ্য সংরক্ষণ বা প্রোটিনের ত্রিমাত্রিক ভাঁজ তৈরি হওয়া কোনোদিনই সম্ভব হতো না। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ১৯৫৩ সালে হারমান স্টডিনজার রসায়নে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন—দৈত্যাকার অণুগুলোর বাস্তবতার ওপর পড়ল বিজ্ঞানের পরম সিলমোহর।