বিংশ শতাব্দী জুড়ে সলিড-স্টেট পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়ন এক অকাট্য তাত্ত্বিক সূত্রের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। ১৯৩০-এর দশকে নোবেলজয়ী পদার্থবিদ লেভ ল্যান্ডাউ এবং রুডলফ পায়ার্লস গাণিতিকভাবে প্রমাণ করেছিলেন যে আমাদের বাস্তব মহাবিশ্বে কেবল এক পরমাণু পুরু দ্বিমাত্রিক স্ফটিক টিকে থাকা অসম্ভব: স্বাভাবিক তাপমাত্রার পারমাণবিক কম্পন (ফোনন) এক স্তরের পরমাণুর বন্ধনকে ছিন্নভিন্ন করে তাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে ফেলবে। অর্থাৎ, একক পরমাণুর সমতল চাদর ছিল তাপগতিবিদ্যার দৃষ্টিতে এক অসম্ভব কূটাভাস।

২০০৪ সালে ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই তরুণ বিজ্ঞানী বিশ্বের তাবৎ তাত্ত্বিকদের ভুল প্রমাণ করেছিলেন গবেষণাগারের সবচেয়ে সস্তা একটি উপকরণ ব্যবহার করে: এক রোল সাধারণ স্কচটেপ। আন্দ্রে গেইম (জন্ম ১৯৫৮) এবং কনস্ট্যান্টিন নোভোসেলভ (জন্ম ১৯৭৪) পেন্সিলের গ্রাফাইটের ওপর সেলোফেন টেপ সেঁটে বারবার ভাঁজ করে স্তরগুলোকে ছাড়িয়ে নিতে থাকেন—যতক্ষণ না সিলিকন ওয়েফারের ওপর খালি চোখে অদৃশ্য মাত্র একক পরমাণুর একটি স্তর অবশিষ্ট থাকে।

গ্রাফিনের মহাজাগতিক ক্ষমতা

এই নতুন পদার্থের নাম রাখা হয় গ্রাফিন: কার্বন পরমাণুর ষড়ভুজাকার মৌচাকের মতো $sp^2$ সংকরায়নে সজ্জিত একক পরমাণু পুরু একটি দ্বিমাত্রিক জালিকা। গ্রাফিনের গুণাবলি ছিল কল্পবিজ্ঞানকেও হার মানানোর মতো বিস্ময়কর:

  • যান্ত্রিক শক্তি: গ্রাফিন হলো মানব ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী পদার্থ—যা কাঠামোগত ইস্পাতের চেয়ে ২০০ গুণেরও বেশি শক্তিশালী। এক পরমাণু পুরু গ্রাফিনের একটি অদৃশ্য জালের ওপর আস্ত একটি বিড়াল শুইয়ে রাখলেও তা ছিঁড়বে না!
  • তাপ পরিবাহিতা: গ্রাফিনের তাপ পরিবাহিতা প্রতি মিটারে ৫,০০০ ওয়াটেরও বেশি—যা খাঁটি তামা বা হীরার চেয়ে বহুগুণ বেশি।
  • আলোক স্বচ্ছতা: মাত্র এক পরমাণু পুরু হওয়া সত্ত্বেও এটি ২.৩ শতাংশ আলো শোষণ করে—যা কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডাইনামিক্সের ফাইন-স্ট্রাকচার ধ্রুবক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
  • ভরহীন ডিরাক ফার্মিয়ন: মৌচাক জালিকার জ্যামিতির কারণে গ্রাফিনের ভেতর ইলেকট্রন তাদের কার্যকর ভর হারিয়ে ভরহীন কণার মতো আলোর গতির তিনশত ভাগের এক ভাগ গতিতে ($১০^৬$ মিটার/সেকেন্ড) অবলীলায় ছুটে চলে।

দ্বিমাত্রিক ন্যানোম্যাটেরিয়ালের স্বর্ণযুগ

২০১০ সালে এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য গেইম ও নোভোসেলভকে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়। বিজ্ঞান বিশ্ব বুঝতে পারল গ্রাফিন কেবল শুরু—এর পেছনে রয়েছে দ্বিমাত্রিক ন্যানোম্যাটেরিয়ালের এক অচেনা মহাদেশ। বিজ্ঞানীরা দ্রুত উদ্ভাবন করেন:

  • হেক্সাগোনাল বোরন নাইট্রাইড (h-BN): ‘সাদা গ্রাফিন’, পরমাণু পর্যায়ের মসৃণ বৈদ্যুতিক অপরিবাহী স্তর।
  • মলিবডেনাম ডাইসালফাইড ($MoS_2$): সেমিকন্ডাক্টর ব্যান্ডগ্যাপযুক্ত পরমাণু পুরু চিপ ট্রানজিস্টর।
  • টুইস্ট্রনিক্স (Twistronics): ২০১৮ সালে এমআইটি-র গবেষকরা আবিষ্কার করেন দুটি গ্রাফিন স্তরকে ঠিক ১.১ ডিগ্রি ‘ম্যাজিক অ্যাঙ্গেলে’ সামান্য বাঁকিয়ে বসালে তা কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই অতিপরিবাহী বা সুপারকন্ডাক্টরে পরিণত হয়!

পদার্থকে দ্বিমাত্রিক সমতলে নামিয়ে আনার মাধ্যমে রসায়ন এমন এক কোয়ান্টাম খেলার মাঠ তৈরি করেছে যেখানে পরমাণুর প্রতিটি স্তর সাজিয়ে মনের মতো নতুন বৈশিষ্ট্য তৈরি করা সম্ভব।