১৯৬৯ সালে প্রাণরসায়নবিদ সাইরাস লেভিনথাল একটি গাণিতিক দুঃস্বপ্নের কথা তুলে ধরেছিলেন: লেভিনথালের কূটাভাস। একটি সাধারণ প্রোটিন প্রায় তিনশত অ্যামিনো অ্যাসিডের দীর্ঘ শিকল নিয়ে গঠিত। প্রতিটি অ্যামিনো অ্যাসিডের পেপটাইড বন্ধনে একাধিক কোণে ঘোরার সুযোগ থাকায় একটি প্রোটিন শিকল তাত্ত্বিকভাবে প্রায় $১০^{৩০০}$ টি সম্ভাব্য ত্রিমাত্রিক অবস্থায় ভাঁজ হতে পারে। কোনো প্রোটিন যদি সবচেয়ে দ্রুততম পিকোসেকেকেন্ড ($১০^{-১২}$ সেকেন্ড) গতিতেও একে একে এই অবস্থাগুলো পরীক্ষা করতে যেত, তবে সঠিক স্থিতিশীল ভাঁজটি খুঁজে পেতে মহাবিশ্বের বয়সের চেয়েও বেশি সময় লেগে যেত। অথচ জীবকোষের ভেতরে একটি প্রোটিন মাত্র কয়েক মিলিসেকেন্ডের মধ্যেই নিখুঁত ন্যানোমিটার ত্রিমাত্রিক কাঠামোতে ভাঁজ হয়ে যায়!

পঞ্চাশ বছর ধরে একটি মাত্র প্রোটিনের কাঠামো নির্ধারণ করতে বিজ্ঞানীদের ল্যাবরেটরিতে বছরের পর বছর ঘাম ঝরাতে হতো: ক্রিস্টাল তৈরি করে তা বিলিয়ন ডলারের সিনক্রোট্রন পার্টিকেল এক্সিলারেটরে নিয়ে এক্স-রে করা, অথবা তরল ইথেনে জমিয়ে ক্রায়ো-ইলেক্ট্রন মাইক্রোস্কোপিতে পরীক্ষা করা। ২০২০ সাল পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রায় ১ লক্ষ ৭০ হাজার প্রোটিনের গঠন জানা সম্ভব হয়েছিল—যা প্রকৃতির কোটি কোটি প্রোটিনের মহাসাগরে এক ফোঁটা জলের মতো। রসায়নের এই চূড়ান্ত সীমান্ত অতিক্রম করতে প্রয়োজন ছিল সম্পূর্ণ নতুন এক বুদ্ধিমত্তার।

যুগান্তকারী বিপ্লব: আলফা ফোল্ড ২ (২০২০)

২০২০ সালের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক প্রোটিন গঠন পূর্বাভাস প্রতিযোগিতায় (CASP14) লন্ডনভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণাগার গুগল ডিপমাইন্ড বিশ্বকে চমকে দেয়। ডিপমাইন্ডের প্রতিষ্ঠাতা ডেমিস হাসাবিস এবং প্রধান গবেষক জন জাম্পার-এর নেতৃত্বে উন্মোচিত হয় আলফা ফোল্ড ২ (AlphaFold 2)।

আলফা ফোল্ড কোনো সনাতন ফিজিক্স সিমুলেশন ব্যবহার করেনি। এটি প্রোটিনের ত্রিমাত্রিক সমস্যাটিকে একটি বিশেষ নিউরাল নেটওয়ার্কে রূপান্তর করে: এর ইভোফর্মার (Evoformer) মডিউল বিবর্তনীয় মিউটেশনের ইতিহাস এবং অবশিষ্টাংশগুলোর স্থানিক দূরত্বের তথ্যের সমন্বয়ে সরাসরি ইউক্লিডীয় স্থানে পরমাণুর ত্রিমাত্রিক স্থানাঙ্ক নিখুঁতভাবে পূর্বাভাস দিতে শুরু করে।

ফলাফল ছিল চমকপ্রদ: আলফা ফোল্ড এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফির সমতুল্য পারমাণবিক নিখুঁততায় প্রোটিনের গঠন পূর্বাভাস দিতে সক্ষম হয়। পরবর্তী দুই বছরের মধ্যে ডিপমাইন্ড এবং ইউরোপীয় মলিকিউলার বায়োলজি ল্যাবরেটরি (EMBL) পৃথিবীর সমস্ত পরিচিত জীবদেহের ২১ কোটি ৪০ লক্ষেরও বেশি প্রোটিনের ত্রিমাত্রিক গঠন নিখরচায় উন্মুক্ত করে দেয়—যা এক লহমায় জীববিজ্ঞানের দিগন্তকে এক হাজার গুণ প্রসারিত করে!

জেনারেটিভ প্রোটিন ডিজাইন ও ২০২৪ সালের নোবেল

আলফা ফোল্ডের পাশাপাশি ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভিড বেকার-এর নেতৃত্বে শুরু হয় কৃত্রিম জেনারেটিভ প্রোটিন ডিজাইন। ডিফিউশন মডেল ব্যবহার করে বেকার এমন সব প্রোটিন তৈরি করতে শুরু করেন যা গত ৪০০ কোটি বছরের প্রাকৃতিক বিবর্তনে কোনোদিন তৈরি হয়নি।

রসায়ন এখন আর কেবল বিশ্লেষণ করে না; এটি সরাসরি আদেশ দেয়: “আমাকে অমুক ভাইরাস ধ্বংস করার জন্য একটি রিসেপ্টর প্রোটিন তৈরি করে দাও”—আর এআই মুহূর্তের মধ্যে সেই ত্রিমাত্রিক নকশা এঁকে দেয়। বিজ্ঞানের এই অমর মাইলফলককে স্বীকৃতি জানিয়ে ২০২৪ সালের রসায়নে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয় ডেভিড বেকার (কম্পিউটেশনাল প্রোটিন ডিজাইনের জন্য) এবং যৌথভাবে ডেমিস হাসাবিস ও জন জাম্পার-কে (প্রোটিন গঠনের এআই পূর্বাভাসের জন্য)।

উপসংহার: আলকেমি থেকে এআই পর্যন্ত মহাকাব্য

রসায়নের ইতিহাসের এই প্রামাণ্য বিশ খণ্ডের মহাযাত্রা শেষ করার সময় একবার ভেবে দেখুন মানব চিন্তার এই দীর্ঘ পথপরিক্রমা। আমরা শুরু করেছিলাম প্রাচীন সিসিলির মাটিতে এম্পিডোক্লিসের চার উপাদান—মাটি, জল, বায়ু আর আগুনের দার্শনিক চিন্তা দিয়ে। তারপর আব্বাসীয় বাগদাদের গলিত গন্ধক আর জাবির ইবনে হাইয়ানের অ্যালেম্বিক পাতনযন্ত্র, লাভোয়াজিয়ের ভরের নিত্যতা সূত্র, ডাল্টনের পরমাণুর ওজন, মেন্ডেলিফের পর্যায় সারণির স্বপ্ন, রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিনের ডিএনএ এক্স-রে, উডওয়ার্ডের জটিল জৈব সংশ্লেষণ, ফ্রেজার স্টডার্টের আণবিক ন্যানো-মোটর এবং সবশেষে ডিপমাইন্ডের আলফা ফোল্ড কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।

রসায়ন কেবল কোনো মৌল বা লবণের তালিকা নয়; এটি হলো বাস্তবতার প্রকাশের সবচেয়ে মহিমান্বিত মাধ্যম। এই রসায়নের পথ ধরেই জড় নক্ষত্রের ধূলিকণা একদিন বিবর্তিত হয়েছে আত্মসচেতন মানুষে—যে মানুষ আজ প্রকৃতির সেই আণবিক রহস্যের কোড পুনরায় পাঠ করতে সক্ষম হয়েছে।