১৮৬০-এর দশকের শেষভাগে ইউরোপের গবেষণাগারগুলো তেষট্টিটি পৃথক মৌলিক পদার্থ আবিষ্কার ও তালিকাভুক্ত করেছিল। কিন্তু মৌলগুলোকে দেখে মনে হতো এক বিশৃঙ্খল জনতা: সোডিয়াম ও পটাসিয়ামের মতো অত্যন্ত সক্রিয় ক্ষার ধাতুগুলো একই পাঠ্যবইয়ে ছিল প্ল্যাটিনাম ও সোনার মতো শান্ত নিস্ক্রিয় ধাতুর পাশে; বিষাক্ত সবুজ ক্লোরিন গ্যাস ছিল উজ্জ্বল রূপালী ফসফরাসের সাথে। এই তেষট্টিটি মৌল কি মহাবিশ্বের স্বাধীন কোনো দুর্ঘটনা, নাকি এদের বৈশিষ্ট্যের গভীরে কোনো ছন্দময় গাণিতিক সুসংগতি লুকিয়ে আছে?

এই প্রশ্নের উত্তর এসেছিল দূর সাইবেরিয়া থেকে আগত এক বিজ্ঞানীর কাছ থেকে। সেন্ট পিটার্সবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দিমিত্রি ইভানোভিচ মেন্ডেলিফ (১৮৩৪–১৯০৭) তাঁর শিক্ষার্থীদের জন্য প্রিন্সিপলস অব কেমিস্ট্রি নামের একটি পাঠ্যপুস্তক রচনা করছিলেন। মৌলগুলোকে একটি যৌক্তিক কাঠামোর আওতায় আনার তাগিদে মেন্ডেলিফ কার্ডবোর্ডের তাসের মতো ছোট ছোট কার্ডে প্রতিটি পরিচিত মৌলের নাম, পারমাণবিক ভর এবং যোজনী লিখে নেন। তিনি টেবিলের ওপর কার্ডগুলো সাজিয়ে এক রাসায়নিক তাসখেলা শুরু করেন—পারমাণবিক ভরের ঊর্ধ্বক্রম অনুসারে সাজানোর পাশাপাশি সমধর্মী যোজনীর মৌলগুলোকে একই কলামে মেলানোর চেষ্টা করেন।

ঐতিহাসিক স্বপ্নদর্শন: ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৮৬৯

১৮৬৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি রাতে এক দীর্ঘ গবেষণার পর পরিশ্রান্ত মেন্ডেলিফ তাঁর পড়ার টেবিলেই ঘুমিয়ে পড়েন। পরবর্তীতে তিনি তাঁর সহকর্মী আলেকজান্ডার ইনোস্ত্রানসেভকে বলেছিলেন: “আমি স্বপ্নে এক পরিপূর্ণ সারণি দেখতে পেলাম যেখানে প্রতিটি মৌল তার সঠিক স্থানে বসে গেছে। ঘুম ভেঙেই আমি একটি কাগজে তা অবিলম্বে এঁকে ফেললাম।”

মেন্ডেলিফ ঘোষণা করেন তাঁর অমর পর্যায় সূত্র: মৌলসমূহের ভৌত ও রাসায়নিক ধর্মাবলি তাদের পারমাণবিক ভরের বৃদ্ধির সাথে সাথে পর্যায়ক্রমে আবর্তিত হয়। মৌলগুলোকে পারমাণবিক ভরের ক্রমানুসারে সাজালে দেখা যায় নিয়মিত ব্যবধানে সমধর্মী বৈশিষ্ট্য ফিরে আসে: লিথিয়াম, সোডিয়াম, পটাসিয়াম একই সারিতে বসে যায়; আবার ফ্লোরিন, ক্লোরিন, ব্রোমিন, আয়োডিনের হ্যালোজেন পরিবার আরেকটি নির্দিষ্ট সারিতে চলে আসে।

ফাঁকা ঘরের দুঃসাহসিক প্রজ্ঞা

মেন্ডেলিফকে অন্য গবেষকদের (যেমন ডি চ্যানকুরতোয়া, নিউল্যান্ডস বা লোথার মেয়ার) চেয়ে এক অনন্য শিখরে পৌঁছে দিয়েছিল তাঁর অতুলনীয় বুদ্ধিবৃত্তিক সাহস। যখন কোনো মৌল তার কলামের বৈশিষ্ট্যের সাথে মিলছিল না, তখন মেন্ডেলিফ দুটি অবিশ্বাস্য কাজ করেছিলেন:

  1. তিনি তৎকালীন বিজ্ঞানীদের পারমাণবিক ভরকে ভুল বলেছিলেন: তিনি জোর দিয়ে বলেন আয়োডিন ও টেলুরিয়ামের মাপ ভুল হয়েছে, এবং ইউরেনিয়াম, ইন্ডিয়াম ও বেরিলিয়ামের পারমাণবিক ভর সংশোধন করেন।
  2. অনাবিষ্কৃত মৌলের জন্য ফাঁকা জায়গা রেখেছিলেন: জোর করে মৌল মেলানোর পরিবর্তে তিনি সারণিতে ফাঁকা ঘর রেখে ঘোষণা করেন যে ভবিষ্যতে এই ঘরগুলো পূরণ করার জন্য নতুন নতুন মৌল আবিষ্কৃত হবে।

একা-অ্যালুমিনিয়াম ও গ্যালিয়ামের বিজয়

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, মেন্ডেলিফ ফাঁকা ঘরগুলোর আশেপাশের মৌলের ভর ও ঘনত্বের গড় হিসাব করে তিনটি অনাবিষ্কৃত মৌলের নিখুঁত বৈশিষ্ট্যের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন—সংস্কৃত ‘একা’ (এক ধাপ নিচে) উপসর্গ যোগ করে তিনি এদের নাম দিয়েছিলেন একা-বোরন, একা-অ্যালুমিনিয়াম এবং একা-সিলিকন।

১৮৭১ সালে একা-অ্যালুমিনিয়াম সম্পর্কে মেন্ডেলিফ ভবিষ্যদ্বাণী করেন এর পারমাণবিক ভর হবে প্রায় ৬৮, ঘনত্ব হবে ৫.৯ গ্রাম/ঘনসেমি, গলনাঙ্ক হবে অত্যন্ত কম, এবং এর অক্সাইডের সংকেত হবে $Ea_2O_3$। মাত্র চার বছর পর ১৮৭৫ সালে ফরাসি রসায়নবিদ পল-এমিল লেকক দ্য বোয়াবোদ্রাঁ জিংক ব্লেন্ড আকরিক থেকে নতুন ধাতু আবিষ্কার করে ফ্রান্সের প্রাচীন নামানুসারে নাম দেন গ্যালিয়াম। যখন গ্যালিয়ামের ধর্ম মাপা হলো, তখন গোটা বৈজ্ঞানিক বিশ্ব চমকে উঠল:

  • পারমাণবিক ভর: মেন্ডেলিফের ধারণা $approx ৬৮$ $longrightarrow$ গ্যালিয়াম: ৬৯.৭২
  • ঘনত্ব: মেন্ডেলিফের ধারণা ৫.৯ $longrightarrow$ গ্যালিয়াম: ৫.৯১ গ্রাম/ঘনসেমি
  • গলনাঙ্ক: অত্যন্ত কম $longrightarrow$ গ্যালিয়াম: ২৯.৭৬° সেলসিয়াস (হাতের তালুর উত্তাপেই গলে তরল হয়ে যায়!)
  • অক্সাইড: $Ea_2O_3$ $longrightarrow$ গ্যালিয়াম অক্সাইড: $Ga_2O_3$

১৮৭৯ সালে স্ক্যান্ডিয়াম (একা-বোরন) এবং ১৮৮৬ সালে জার্মানিয়াম (একা-সিলিকন) আবিষ্কৃত হয়ে মেন্ডেলিফের ভবিষ্যদ্বাণীকে অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণ করার পর বিজ্ঞান সমাজে আর কোনো সন্দেহ অবশিষ্ট রইল না। পর্যায় সারণি কেবল মানুষের তৈরি কোনো তালিকা নয়, এটি ছিল পদার্থের পরম রূপ অনুধাবনে প্রকৃতির নিজস্ব মাস্টার লেজার।