হাজার হাজার বছর ধরে কঠিন পদার্থ বলতে মানুষ বুঝেছে নিরেট ঘনত্ব। লোহা, মার্বেল পাথর বা গ্রানাইট ছিল ভারী ও নিরেট। এমনকি জিওলাইটের মতো প্রাকৃতিক ছিদ্রযুক্ত পাথরের নালিগুলোও ছিল অত্যন্ত সংকীর্ণ ও ভঙ্গুর। বহু বছর ধরে উপাদান বিজ্ঞানীদের স্বপ্ন ছিল এক জাদুকরী বৈপরীত্য: এমন কি কোনো কঠিন স্ফটিক তৈরি করা সম্ভব যার নব্বই শতাংশ আয়তনই হবে ফাঁকা খাঁচা—অথচ যা শত শত ডিগ্রি উত্তাপেও অটুট থাকবে?

এই অসম্ভব স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন জর্ডানিয়ান-আমেরিকান রসায়নবিদ ও ইউসি বার্কলের অধ্যাপক ওমর এম. ইয়াঘি (জন্ম ১৯৬৫)। ১৯৯০-এর দশকের শেষভাগে ইয়াঘি প্রতিষ্ঠা করেন রেটিকুলার কেমিস্ট্রি (Reticular Chemistry)—যেখানে ধাতব পরমাণুর গুচ্ছ ও জৈব অণুর লিঙ্ক বা সংযোগকারীকে আণবিক লেগোর মতো সুনির্দিষ্ট জ্যামিতিক নকশায় গেঁথে তৈরি করা হয় ত্রিমাত্রিক ফাঁপা স্ফটিক জালিকাব্যবস্থা: মেটাল-অরগানিক ফ্রেমওয়ার্ক (MOF)।

এমওএফ-৫: শূন্যতার রাজত্ব

১৯৯৯ সালে নেচার জার্নালে ইয়াঘি প্রকাশ করেন তাঁর যুগান্তকারী MOF-5 স্ফটিকের আবিষ্কার। জিংক অক্সাইডের ($Zn_4O$) অষ্টতলকীয় নোডকে বেনজিন রিংযুক্ত লিঙ্কারের সাথে যুক্ত করে তিনি তৈরি করেন কিউবিক আকৃতির এক সুবিশাল অভ্যন্তরীণ খাঁচা।

এই স্ফটিকটির অভ্যন্তরীণ পৃষ্ঠের ক্ষেত্রফল ছিল অভূতপূর্ব: প্রতি গ্রামে ২,৯০০ বর্গমিটারের বেশি। পরবর্তীতে ইয়াঘির ল্যাবরেটরিতে তৈরি আধুনিক ফ্রেমওয়ার্কগুলোর অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রফল প্রতি গ্রামে ১০,০০০ বর্গমিটার ছাড়িয়ে যায়। অর্থাৎ, একটি সাধারণ এক সেন্টিমিটার কিউব আকারের স্ফটিকের অভ্যন্তরীণ সুড়ঙ্গগুলোকে খুলে মেঝেতে বিছিয়ে দিলে তা একটি সুবিশাল ফুটবল মাঠকে সম্পূর্ণ ঢেকে ফেলতে পারে!

মরুভূমির শুষ্ক বায়ু থেকে বিশুদ্ধ পানীয় জল

যেহেতু এই ফ্রেমওয়ার্কগুলোর জৈব লিঙ্কারকে পরমাণু পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, তাই বিজ্ঞানীদের প্রয়োজনমাফিক এদের ছিদ্রের আকার ও রাসায়নিক আকর্ষণ ক্ষমতা নিখুঁতভাবে টিউন করা যায়:

  • বাতাস থেকে জল আহরণ: ২০১৭ সালে ইয়াঘি জিরকোনিয়াম-ভিত্তিক MOF-801 স্ফটিক উদ্ভাবন করেন—যা ২০ শতাংশেরও কম আপেক্ষিক আর্দ্রতায় বাতাসের জলীয় বাষ্প শুষে নিতে পারে। সাহারা বা মোহাভে মরুভূমির মতো রুক্ষ ও শুষ্ক স্থানে কোনো বিদ্যুৎ ছাড়াই সৌরশক্তির সাহায্যে এই স্ফটিক রাতের শুষ্ক বাতাস থেকে জল শুষে নেয় এবং দিনের আলোয় ফোঁটায় ফোঁটায় বিশুদ্ধ খাবার জল নিঃসৃত করে।
  • কার্বন ডাই-অক্সাইড বন্দিকরণ: শিল্প কারখানার ধোঁয়াশা থেকে এই ফ্রেমওয়ার্কগুলো শুধুমাত্র $CO_2$ গ্যাসকে স্পঞ্জের মতো আটকে ফেলে, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন রোধে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।
  • পরিচ্ছন্ন হাইড্রোজেন জ্বালানি সঞ্চয়: স্বল্প চাপে ন্যানোপোরের ভেতর হাইড্রোজেন ও মিথেন গ্যাস নিরাপদে সঞ্চয় করে পরিবেশবান্ধব যানবাহন পরিচালনা করা সম্ভব হয়েছে।

ওমর ইয়াঘির রেটিকুলার রসায়ন প্রমাণ করেছে যে শূন্যস্থান মানেই ফাঁকা নয়; সুপরিকল্পিত ন্যানো-শূন্যস্থান হলো বিজ্ঞানের অন্যতম শক্তিশালী প্রযুক্তিগত সম্পদ।