মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু নিরন্তর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে চলেছে। কাঠ পুড়ে ছাই হয়; ভেজা বাতাসে লোহায় মরিচা ধরে; আঙুরের মিষ্টি রস গেঁজে ওঠে ঝাঁঝালো মদে। হাজার হাজার বছর আগে যখন মানব মস্তিষ্ক এই রূপান্তরগুলো প্রত্যক্ষ করেছিল, তখন এক গভীর দার্শনিক প্রশ্নের জন্ম হয়: যখন কোনো বস্তুর বাহ্যিক রূপ বদলে যায়, তখন কি তার ভেতরে কোনো অবিনশ্বর মৌলিক উপাদান অবশিষ্ট থাকে, নাকি প্রতি মুহূর্তে প্রকৃতিতে নতুন কিছুর সৃষ্টি ও ধ্বংস ঘটছে?

খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে গ্রিক উপনিবেশগুলোতে প্রাক-সক্রেটিস দার্শনিকরা এই অমীমাংসিত প্রশ্নের একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও যৌক্তিক উত্তর খুঁজছিলেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন অ্যাক্রাগাসের এম্পিডোক্লিস (খ্রিস্টপূর্ব আনুমানিক ৪৯০–৪৩০ অব্দ)। তিনি পূর্ববর্তী থেলিসের জল-একত্ববাদ কিংবা অ্যানাক্সিমেনিসের বায়ু-তত্ত্বের সমন্বয় ঘটিয়ে প্রস্তাব করেন প্রকৃতির চারটি মৌলিক উৎস (রাইজোমাটা): মাটি, জল, বায়ু এবং আগুন। এম্পিডোক্লিসের মতে, এই চারটি উপাদান চিরন্তন, অনাদি ও অবিনশ্বর; এদের একটিকে অন্যটিতে রূপান্তর করা অসম্ভব। জগতে দৃশ্যমান সকল পরিবর্তন আসলে এই চারটি অপরিবর্তনযোগ্য উপাদানের যান্ত্রিক মিশ্রণ ও পৃথকীকরণের ফল মাত্র, যা পরিচালিত হয় দুটি বিপরীতমুখী শক্তি দ্বারা—প্রেম (যা উপাদানগুলোকে একত্রিত করে) এবং দ্বন্দ্ব (যা উপাদানগুলোকে বিচ্ছিন্ন করে)।

ডেমোক্রিটাস ও পরমাণুবাদের বৈপ্লবিক সূচনা

এম্পিডোক্লিস যেখানে পদার্থকে অবিচ্ছিন্ন মাধ্যম হিসেবে দেখতেন, সেখানে তাঁর সমসাময়িক লুসিপাস এবং লুসিপাসের প্রতিভাধর শিষ্য আবদেরার ডেমোক্রিটাস (খ্রিস্টপূর্ব আনুমানিক ৪৬০–৩৭০ অব্দ) এমন এক ধারণার অবতারণা করেন যা আধুনিক পারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞানকে দুই সহস্রাব্দ আগেই পূর্বাভাস দিয়েছিল। ডেমোক্রিটাস যুক্তি দেন, পদার্থকে যদি অসীম পর্যন্ত বিভাজন করা যেত, তবে শেষ পর্যন্ত পদার্থ রূপান্তরিত হতো কোনো শূন্যতায় অথবা আয়তনহীন বিন্দুতে—যেখান থেকে কোনো বাস্তব পদার্থ পুনর্গঠন করা সম্ভব নয়। অতএব, বিভাজনের একটি পরম সীমানা থাকতে হবে: এমন এক ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণা যাকে আর ভাঙা সম্ভব নয়। তিনি এই অবিভাজ্য কণার নাম দেন অ্যাটোমস (ἄτομος, যার অর্থ ‘যা কাটা যায় না’ বা ‘অবিভাজ্য’)।

“লোকমুখে যা মিষ্টি তা মিষ্টি, যা তিক্ত তা তিক্ত, যা উষ্ণ তা উষ্ণ, যা শীতল তা শীতল, যা বর্ণময় তা বর্ণময়; কিন্তু পরম সত্যের জগতে কেবল পরমাণু আর শূন্যস্থান ছাড়া কিছুই নেই।”
— আবদেরার ডেমোক্রিটাস (ফ্র্যাগমেন্ট বি১২৫)

ডেমোক্রিটাসের মতে, পরমাণুগুলো নিরেট, অভ্যন্তরীণ গুণহীন, এবং এদের আকার ও জ্যামিতিক গঠনে রয়েছে সীমাহীন বৈচিত্র্য। লোহার পরমাণুগুলো খাঁজকাটা ও আঁকড়াযুক্ত, ফলে তারা শক্তভাবে একে অপরকে আঁকড়ে ধরে কঠিন বস্তুতে পরিণত হয়; জলের পরমাণু মসৃণ ও গোলাকার, যার ফলে তারা বালুকণার মতো পরস্পরের ওপর দিয়ে পিছলে প্রবাহিত হয়। মিষ্টি স্বাদের খাবারে থাকে গোলাকার পরমাণু যা সংবেদনশীল অঙ্গকে তৃপ্তি দেয়, আর অ্যাসিড বা তিক্ত খাবারে থাকে তীক্ষ্ণ কাঁটার মতো পরমাণু। সবচেয়ে বৈপ্লবিক বিষয় হলো, ডেমোক্রিটাস পরমাণুর গতির জন্য কোনো ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করেন: পরমাণুগুলো অসীম শূন্যস্থানে (কেনন) সম্পূর্ণ যান্ত্রিক সংঘাতের মাধ্যমে একে অপরের সাথে মিলিত হয়।

এরিস্টটলের প্রতিক্রিয়া ও দুই সহস্রাব্দের অচলাবস্থা

পরমাণুবাদের এই অসাধারণ অন্তর্দৃষ্টি পরবর্তীকালে এরিস্টটলের (খ্রিস্টপূর্ব ৩৮৪–৩২২ অব্দ) দার্শনিক কর্তৃত্বের কারণে প্রায় চাপা পড়ে যায়। এরিস্টটল পরমাণু এবং শূন্যস্থান উভয় ধারণাকেই কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। এরিস্টটলের বিখ্যাত নীতি ছিল ‘প্রকৃতি শূন্যস্থান ঘৃণা করে’ (horror vacui); শূন্যস্থানে কোনো ঘর্ষণ বা বাধা না থাকায় গতিবেগ অসীম হতে বাধ্য, যা এরিস্টটলের পদার্থবিদ্যায় এক অসম্ভব কূটাভাস। তিনি এম্পিডোক্লিসের চার উপাদানের তত্ত্বকে পরিমার্জন করে বলেন, সমস্ত পদার্থ তৈরি হয়েছে একটি আদি গুণহীন উপাদান (প্রাইমা মেটেরিয়া) দ্বারা, যার ওপর চারটি মৌলিক গুণের জোড়া প্রযুক্ত হয়: উষ্ণ ও শীতল, শুষ্ক ও আর্দ্র।

  • আগুন: উষ্ণ + শুষ্ক
  • বায়ু: উষ্ণ + আর্দ্র
  • জল: শীতল + আর্দ্র
  • মাটি: শীতল + শুষ্ক

যেহেতু উপাদানগুলো কেবল এই গুণগুলোর পরিবর্তনের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়, তাই এরিস্টটল সিদ্ধান্ত নেন যে যেকোনো উপাদানকে অন্য উপাদানে রূপান্তর করা সম্ভব। ফুটন্ত জলকে শীতল করলে তার ‘উষ্ণ’ গুণটি ‘শীতল’ গুণে পরিণত হয়ে সাধারণ জলে রূপ নেয়; আবার তাকে উত্তাপ দিয়ে বাষ্পীভূত করলে তা বায়ুতে পরিণত হয়। এই ধারণা—যে যেকোনো ধাতুকে তার অভ্যন্তরীণ গুণের সামঞ্জস্য ঘটিয়ে সোনায় রূপান্তর করা সম্ভব—পরবর্তী দেড় হাজার বছর ধরে ইউরোপ, বাইজান্টাইন ও প্রাচ্যের আলকেমি চর্চার প্রধান তাত্ত্বিক হাতিয়ারে পরিণত হয়।