জৈব রসায়নের প্রথম এক শতাব্দী ধরে প্রকৃতি ছিল এক অপরাজিত শিল্পী। জীবদেহ অতি সহজে তৈরি করত জটিল সব প্রাকৃতিক অণু—স্নায়ুকে অবশ করা অ্যালকালয়েড, হরমোন নিয়ন্ত্রণকারী স্টেরয়েড এবং সূর্যালোক শোষণকারী ক্লোরোফিল। অথচ মানুষের পরীক্ষাগারে সাধারণ কয়লা বা পেট্রোলিয়াম থেকে এই জটিল অণুগুলো তৈরি করা ছিল প্রায় অসম্ভব এক স্বপ্ন। এই আপাত অসম্ভবকে বাস্তবে রূপ দিয়েছিলেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অবিসংবাদিত জিনিয়াস: রবার্ট বার্নস উডওয়ার্ড (১৯১৭–১৯৭৯)।

মাত্র ষোল বছর বয়সে এমআইটিতে ভর্তি হয়ে বিশ বছর বয়সে ডক্টরেট সম্পন্ন করা উডওয়ার্ড টোটাল সিন্থেসিস বা মোট জৈব সংশ্লেষণকে—সাধারণ রাসায়নিক থেকে জীবদেহের সহায়তা ছাড়া জটিল অণু তৈরির বিদ্যাকে—এক নিখুঁত ত্রিমাত্রিক শিল্পকলায় রূপান্তর করেন।

মোট সংশ্লেষণের অমর কীর্তি

চার দশকেরও বেশি সময় ধরে উডওয়ার্ড একে একে পরীক্ষাগারে তৈরি করেন প্রকৃতির সবচেয়ে জটিল সব আণবিক গোলকধাঁধা:

  • কুইনাইন (১৯৪৪): ম্যালেরিয়ার ঐতিহাসিক প্রতিষেধক।
  • কোলেস্টেরল ও কর্টিসোন (১৯৫১): জটিল স্টেরয়েড কাঠামো।
  • স্ট্রিকনিন (১৯৫৪): সাতটি জটিল বলয় ও ছয়টি স্টেরিওসেন্টার বিশিষ্ট বিষাক্ত অ্যালকালয়েড।
  • রিসারপিন (১৯৫৬): পাঁচটি সংলগ্ন ত্রিমাত্রিক কেন্দ্রযুক্ত প্রশান্তিদায়ক ওষুধ।
  • ক্লোরোফিল (১৯৬০): সালোকসংশ্লেষণের সবুজ রঞ্জক পদার্থ।
  • ভিটামিন $B_{12}$ (১৯৭২): আলবার্ট এশেনমোসারের সাথে এক যৌথ মহাকাব্য—এক শতাধিক রসায়নবিদের বারো বছরের সাধনায় পঁচানব্বইটি ধারাবাহিক ধাপে কোবাল্ট সমন্বিত এই দানবীয় অণুটি সংশ্লেষিত হয়।

উডওয়ার্ড-হফম্যান নীতি: অরবিটাল প্রতিসাম্য সংরক্ষণ

ভিটামিন বি১২ তৈরির সময় উডওয়ার্ড একটি অভূতপূর্ব ঘটনার মুখোমুখি হন: একটি নির্দিষ্ট যৌগকে উত্তপ্ত করলে যে ত্রিমাত্রিক সমাণু তৈরি হয়, অতিবেগুনী আলো ফেললে তৈরি হয় তার ঠিক বিপরীত সমাণু। এর পেছনের কোয়ান্টাম কারণ খুঁজতে গিয়ে উডওয়ার্ড কর্নওয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের তাত্ত্বিক রসায়নবিদ রোল্ড হফম্যান-এর সাথে হাত মেলান।

১৯৬৫ সালে তাঁরা প্রকাশ করেন রসায়নের অন্যতম প্রভাবশালী নীতি—উডওয়ার্ড-হফম্যান নীতি: পেরি-সাইক্লিক রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অরবিটালের প্রতিসাম্য সর্বদা সংরক্ষিত থাকে। বিক্রিয়া চলার সময় সর্বোচ্চ দখলকৃত অরবিটাল (HOMO) এবং সর্বনিম্ন ফাঁকা অরবিটালের (LUMO) তরঙ্গ চিহ্নের মধ্যে ধনাত্মক ওভারল্যাপ বজায় থাকতে হয়:

$$oint psi_{text{HOMO}} cdot psi_{text{LUMO}} , dtau > 0$$

তাপীয় অবস্থায় চার-ইলেকট্রনের ($4n$) বলয় একমুখী ঘূর্ণনে (কনরোটেটরি) ঘোরে, আর ছয়-ইলেকট্রনের ($4n+2$) বলয় খোলে বিপরীতমুখী ঘূর্ণনে (ডিসরোটেটরি)। কিন্তু আলো পড়লে ইলেকট্রন উচ্চ শক্তির স্তরে উন্নীত হয়ে অরবিটালের চিহ্ন বদলে দেয়, ফলে বিক্রিয়ার অভিমুখও উল্টে যায়। ১৯৬৫ সালে উডওয়ার্ড রসায়নে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন (এবং ১৯৮১ সালে হফম্যান নোবেল পান)। উডওয়ার্ড প্রমাণ করেন রসায়ন কেবল প্রকৃতিকে জানার বিদ্যা নয়, এটি হলো মানব মস্তিষ্কের আণবিক সৃষ্টির এক অনন্ত শিল্পকলা।