ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে রসায়ন বিজ্ঞান এক চরম সংকট ও বিভ্রান্তির মুখে পড়ে। জন ডাল্টনের পরমাণুবাদ ইউরোপীয় বিজ্ঞানীদের মুগ্ধ করেছিল ঠিকই, কিন্তু এক অমীমাংসিত কূটাভাস এর অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়। ১৮০৯ সালে ফরাসি রসায়নবিদ জোসেফ লুই গে-লুসাক (১৭৭৮–১৮৫০) গ্যাসীয় বিক্রিয়ার আয়তন মেপে এক আশ্চর্যজনক নিয়ম আবিষ্কার করেন: বিক্রিয়ক গ্যাসগুলো সরল পূর্ণসংখ্যার আয়তনে যুক্ত হয়। দুই আয়তন হাইড্রোজেন এবং এক আয়তন অক্সিজেন বিক্রিয়া করে ঠিক দুই আয়তন জলীয় বাষ্প তৈরি করে।
ডাল্টন গে-লুসাকের এই ফলাফল তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। ডাল্টনের যুক্তি ছিল: সমআয়তন গ্যাসে যদি সমসংখ্যক পরমাণু থাকে, তবে ১ আয়তন হাইড্রোজেন ও ১ আয়তন অক্সিজেনের মিলনে ১ আয়তন জল তৈরি হওয়া উচিত। সেখানে দুই আয়তন জলীয় বাষ্প তৈরি হতে গেলে অক্সিজেনের প্রতিটি পরমাণুকে মাঝখান থেকে দ্বিখণ্ডিত হতে হবে—যা পরমাণুবাদের মূল সংজ্ঞার (অবিভাজ্যতার) চরম বিরোধী!
অ্যাভোগাড্রোর অমর অনুকল্প (১৮১১)
১৮১১ সালে ইতালির তুরিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গাণিতিক পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক আমেদিও অ্যাভোগাড্রো (১৭৭৬–১৮৫৬) এক অসাধারণ অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে এই সংকটের সমাধান করেন। তিনি ডাল্টনের দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়া একটি অতিসূক্ষ্ম পার্থক্য চিহ্নিত করেন: পরমাণু (মৌলের ক্ষুদ্রতম একক কণা) এবং অণু (গ্যাসের স্বাধীন অস্তিত্বশীল কণা, যা একাধিক পরমাণু যুক্ত হয়ে গঠিত হতে পারে)।
অ্যাভোগাড্রোর বিখ্যাত অনুকল্প ঘোষণা করে: একই তাপমাত্রা ও চাপে সমআয়তনের সকল গ্যাসে সমান সংখ্যক অণু থাকে:
$$V propto n quad (text{স্থির } T text{ ও } P-text{তে})$$
অ্যাভোগাড্রো আরও দুঃসাহসী প্রস্তাব দেন যে অক্সিজেন, হাইড্রোজেন ও নাইট্রোজেনের মতো সাধারণ গ্যাসীয় কণাগুলো প্রকৃতিতে একক পরমাণু হিসেবে নয়, বরং দ্বি-পরমাণুক অণু ($H_2, O_2, N_2$) হিসেবে অবস্থান করে। এই অনুকল্প প্রয়োগ করলেই গে-লুসাকের পরীক্ষার জট মুহূর্তেই খুলে যায়:
$$2H_{2(g)} + O_{2(g)} longrightarrow 2H_2O_{(g)}$$
দুই অণু হাইড্রোজেন এক অণু অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া করে দুই অণু জলীয় বাষ্প তৈরি করে। এখানে কোনো পরমাণু ভাঙেনি; $O_2$ অণুর দুটি অবিভাজ্য অক্সিজেন পরমাণু দুটি পৃথক জলের অণুর মধ্যে ভাগ হয়ে গেছে মাত্র!
১৮৬০ সালের কার্লসরুহে সম্মেলন: রসায়নের নবজন্ম
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, অ্যাভোগাড্রোর এই যুগান্তকারী তত্ত্ব প্রায় ৫০ বছর ধরে অবহেলিত ছিল। বার্জেলিয়াস ও ডাল্টনের মতো শীর্ষ বিজ্ঞানীরা সমধর্মী পরমাণুর বন্ধন মেনে নিতে পারেননি। ফলে ১৮৫০-এর দশকে রসায়নে চরম নৈরাজ্য দেখা দেয়: অ্যাসিটিক অ্যাসিডের ১৯টি ভিন্ন ভিন্ন সংকেত বাজারে প্রচলিত ছিল এবং বিজ্ঞানীরা জানতেন না অক্সিজেনের ভর ৮ নাকি ১৬, কিংবা কার্বনের ভর ৬ নাকি ১২।
এই বিভ্রান্তি দূর করতে ১৮৬০ সালের সেপ্টেম্বরে জার্মানির ব্যাডেন অঞ্চলের কার্লসরুহে শহরে বিশ্বের প্রথম আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সম্মেলন (কার্লসরুহে কংগ্রেস) অনুষ্ঠিত হয়। ১৪০ জন বিশ্বখ্যাত রসায়নবিদ যখন বাকবিতণ্ডায় লিপ্ত হয়ে অচলাবস্থার মুখে পড়েন, তখন সিসিলির প্রতিভাধর রসায়নবিদ স্তানিসলাও কানিজারো (১৮২৬–১৯১০) মঞ্চে ওঠেন। তিনি অ্যাভোগাড্রোর অনুকল্পকে ভিত্তি করে লেখা তাঁর বিখ্যাত পুস্তিকা বিতরণ করেন এবং প্রমাণ করেন যে বাষ্প ঘনত্বের মাধ্যমে আণবিক ভর নির্ণয় করলে রসায়নের সকল অসঙ্গতি দূর হয়ে যায়—অক্সিজেনের ভর নিশ্চিতভাবেই ১৬ এবং জলের সংকেত $H_2O$।
সম্মেলন শেষে বাড়ি ফেরার ট্রেনে কানিজারোর যুক্তি পড়ে বিজ্ঞানীদের চোখের পর্দা সরে যায়। সম্মেলনে উপস্থিত থাকা এক তরুণ রাশিয়ান রসায়নবিদ দিমিত্রি মেন্ডেলিফ পরবর্তীতে লিখেছিলেন: “কানিজারোর বক্তব্য আমার মনে যে গভীর দাগ কেটেছিল তা আজও স্পষ্ট মনে আছে… যেন অন্ধকার ঘরে হঠাৎ আলোর বিচ্ছুরণ ঘটেছিল।” কার্লসরুহেতে প্রতিষ্ঠিত এই নির্ভুল পারমাণবিক ভরই মেন্ডেলিফকে পর্যায় সারণি আবিষ্কারের পথ দেখিয়েছিল।