বাইশ শতকেরও বেশি সময় ধরে পরমাণুর ধারণা ছিল কেবল এক তাত্ত্বিক কল্পনা—যার কোনো গাণিতিক বা পরিমাপযোগ্য পরীক্ষামূলক ভিত্তি ছিল না। লাভোয়াজিয়ে ভরের নিত্যতা সূত্র প্রমাণ করেছিলেন এবং প্রাউস্ট প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নির্দিষ্ট অনুপাতের সূত্র (একটি নির্দিষ্ট যৌগে উপাদানগুলো সর্বদা ওজনের নির্দিষ্ট অনুপাতে যুক্ত থাকে)। কিন্তু প্রকৃতি কেন এই কঠোর অনুপাত মেনে চলে, তার পেছনের কারণ কারও জানা ছিল না। এই রহস্যের দ্বার উন্মোচন করেন ম্যানচেস্টারের এক সাধারণ কোয়েকার স্কুলশিক্ষক: জন ডাল্টন (১৭৬৬–১৮৪৪)।
ডাল্টনের রসায়নে প্রবেশ ঘটেছিল আসলে আবহাওয়া বিজ্ঞান থেকে। বায়ুমণ্ডলের আর্দ্রতা ও বাষ্পীভবন পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে ডাল্টন লক্ষ্য করেন বাতাসের বিভিন্ন গ্যাস (নাইট্রোজেন, অক্সিজেন, কার্বন ডাই-অক্সাইড) ঘনত্বের তারতম্য সত্ত্বেও আলাদা স্তরে বিভক্ত না হয়ে সমানভাবে মিশে থাকে। এখান থেকেই ১৮০১ সালে তিনি ডাল্টনের আংশিক চাপের সূত্র আবিষ্কার করেন এবং সিদ্ধান্তে আসেন যে বিভিন্ন গ্যাসের কণার আকার ও ভর ভিন্ন ভিন্ন।
গুণানুপাত সূত্র
১৮০৩ সালে কার্বনের দুটি ভিন্ন গ্যাসীয় অক্সাইড (কার্বন মনোক্সাইড ও কার্বন ডাই-অক্সাইড) এবং নাইট্রোজেনের বিভিন্ন অক্সাইড বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ডাল্টন এক যুগান্তকারী সত্য প্রত্যক্ষ করেন। নির্দিষ্ট পরিমাণ ১০০ গ্রাম কার্বনের সাথে যে পরিমাণ অক্সিজেন যুক্ত হয়, তার অনুপাত ছিল নিখুঁত পূর্ণসংখ্যা—ঠিক ১ : ২। কার্বন মনোক্সাইডে ১০০ গ্রাম কার্বনের সাথে যুক্ত হয় ১৩৩ গ্রাম অক্সিজেন; আর কার্বন ডাই-অক্সাইডে যুক্ত হয় ২৬৬ গ্রাম অক্সিজেন ($২৬৬ / ১৩৩ = ২.০০$)।
এটিই হলো রসায়নের বিখ্যাত গুণানুপাত সূত্র। ডাল্টন বুঝতে পারলেন, পদার্থ যদি অবিচ্ছিন্ন কোনো মাধ্যম হতো, তবে অনুপাত এমন সরল পূর্ণসংখ্যা হতে পারত না। এটি কেবল তখনই সম্ভব যখন মৌলগুলো গঠিত হয় কিছু বিচ্ছিন্ন, অবিভাজ্য একক কণা দিয়ে: যেখানে একটি কার্বন পরমাণুর সাথে একটি অক্সিজেন পরমাণু যুক্ত হয়ে কার্বন মনোক্সাইড ($C + O rightarrow CO$) তৈরি করে, এবং একটি কার্বনের সাথে দুটি অক্সিজেন পরমাণু যুক্ত হয়ে কার্বন ডাই-অক্সাইড ($C + 2O rightarrow CO_2$) গঠন করে। রাসায়নিক বিক্রিয়া হলো পূর্ণ অবিভাজ্য পরমাণুগুলোর স্রেফ পুনর্বিন্যাস মাত্র।
পারমাণবিক ভরের প্রথম তালিকা
১৮০৮ সালে প্রকাশিত তাঁর অমর গ্রন্থ এ নিউ সিস্টেম অব কেমিক্যাল ফিলোসফি-তে ডাল্টন মানব ইতিহাসের প্রথম আপেক্ষিক পারমাণবিক ভরের তালিকা প্রকাশ করেন। পরমাণু অত্যন্ত ক্ষুদ্র হওয়ায় তাদের একক ভর মাপা সম্ভব ছিল না; তাই ডাল্টন সবচেয়ে হালকা মৌল হাইড্রোজেনকে মানদণ্ড হিসেবে ১ ধরে ($H = ১.০$) অন্যান্য মৌলের আপেক্ষিক ভর গণনা করেন।
- হাইড্রোজেন: ১
- কার্বন: ৫ (পরবর্তীতে ১২)
- নাইট্রোজেন: ৫ (পরবর্তীতে ১৪)
- অক্সিজেন: ৭ (পরবর্তীতে ১৬)
- গন্ধক: ১৩ (পরবর্তীতে ৩২)
যদিও ডাল্টনের সরলতার অনুমানের কারণে জলের সংকেত তিনি লিখেছিলেন $HO$ (আজকের $H_2O$-এর বদলে), তবুও তাঁর মূল ধারণা ছিল অনবদ্য। এই প্রথম পরমাণু কোনো অবাস্তব দার্শনিক কল্পনা থেকে মুক্তি পেয়ে পরিমাপযোগ্য ভরের এক বাস্তব ভৌত সত্তায় রূপান্তরিত হলো।