১৯৫৯ সালের ডিসেম্বরে ক্যালটেকে এক ঐতিহাসিক বক্তৃতায় নোবেলজয়ী পদার্থবিদ রিচার্ড ফাইনম্যান এক চমকপ্রদ স্বপ্নের কথা তুলে ধরেছিলেন: “দেয়ার্স প্লেনটি অব রুম অ্যাট দ্য বটম” (নিচের জগতে প্রচুর ফাঁকা জায়গা)। ফাইনম্যান রসায়নবিদদের আহ্বান জানিয়েছিলেন অণুকে একটি একটি করে জোড়া লাগিয়ে আণবিক স্কেলে মোটর, গিয়ার ও রোবট তৈরি করার জন্য। কিন্তু দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে এটি সায়েন্স ফিকশন বলেই মনে হতো। কারণ রসায়নে পরিচিত সমযোজী বা আয়নিক বন্ধনগুলো ছিল অনমনীয়; মেশিনের মতো স্বাধীনভাবে ঘোরার মতো কোনো জয়েন্ট অণুর মধ্যে ছিল না।
এই অচলাবস্থা ভেঙে যায় ১৯৮৩ সালে ফ্রান্সের স্ট্রাসবার্গে। ফরাসি রসায়নবিদ জঁ-পিয়েরে সোভাজ (জন্ম ১৯৪৪) কপার আয়নের সমন্বয়কে ছাঁচ হিসেবে ব্যবহার করে একটি আণবিক বলয়ের ভেতর আরেকটি বলয় গলিয়ে আটকে দেন—তৈরি হয় ক্যাটেনেন ([2]catenane)। শেকলের কড়ার মতো যুক্ত এই দুটি বলয়ের মাঝে কোনো সমযোজী ইলেকট্রন শেয়ারিং নেই; তারা আবদ্ধ কেবল স্থানিক জ্যামিতির এক নতুন নিয়মে—যার নাম যান্ত্রিক বন্ধন (মেকানিক্যাল বন্ড)।
ফ্রেজার স্টডার্ট ও আণবিক শাটল
১৯৯১ সালে স্কটিশ রসায়নবিদ স্যার জে. ফ্রেজার স্টডার্ট (জন্ম ১৯৪২) প্রস্তুত করেন রোটাক্সেন ([2]rotaxane): একটি ডাম্বেল আকৃতির আণবিক এক্সেল, যার দুই মাথায় থাকে দুটি বিশাল স্টপার এবং মাঝখানে ফ্রিলি চলাচলের উপযোগী একটি আণবিক রিং।
দ্রবণের অম্লতা বা বিদ্যুৎপ্রবাহ পরিবর্তন করে স্টডার্ট প্রমাণ করেন যে রিংটিকে এক্সেলের দুটি ভিন্ন স্টেশনের মাঝে ইচ্ছামতো সামনে-পিছনে সরানো যায়—জন্ম নেয় পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম আণবিক শাটল সুইচ। এরপর স্টডার্ট তৈরি করেন আণবিক পেশি যা মানুষের পেশির মতোই সংকুচিত ও প্রসারিত হতে পারত, এবং ন্যানো-ভালভ যা ক্যানসার আক্রান্ত কোষে গিয়ে ওষুধ উন্মুক্ত করতে পারে।
বেন ফেরিঙ্গা ও একমুখী আণবিক মোটর
শাটল কেবল সামনে-পিছনে দুললেও একটি সত্যিকারের ইঞ্জিনের জন্য প্রয়োজন একমুখী ঘূর্ণন। ১৯৯৯ সালে নেদারল্যান্ডসের রসায়নবিদ বার্নার্ড এল. ফেরিঙ্গা (জন্ম ১৯৫১) তৈরি করেন বিশ্বের প্রথম সিন্থেটিক আণবিক মোটর। তিনি একটি কার্বন-কার্বন দ্বিবন্ধনযুক্ত অণুর দুই পাশে দুটি ব্লেড বা প্রপেলার সংযুক্ত করেন।
অতিবেগুনী আলো ফেললে দ্বিবন্ধনটি খুলে গিয়ে ১৮০ ডিগ্রি ঘোরে; এরপর তাপীয় শিথিলতার মাধ্যমে অণুর মেথিল গ্রুপের বাধা পেরিয়ে তা বাকি ১৮০ ডিগ্রি পূর্ণ করে—ফলে শুরু হয় এক অবিরাম ৩৬০ ডিগ্রি একমুখী ঘূর্ণন। ২০১৪ সালের মধ্যে ফেরিঙ্গার এই আণবিক মোটর প্রতি সেকেন্ডে ১ কোটি ২০ লক্ষ বার গতিতে ঘুরতে সক্ষম হয় এবং এর চাকার সাহায্যে তৈরি হয় আণবিক ন্যানোকার। ২০১৬ সালে রসায়নে নোবেলজয়ী এই তিন বিজ্ঞানী রসায়নকে এক জড় বিজ্ঞান থেকে রূপান্তরিত করেছেন চলমান ন্যানো-প্রকৌশলের এক উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় জগতে।