যন্ত্রকে চিন্তা শেখানোর আগে গণিতবিদদের আবিষ্কার করতে হয়েছিল—গাণিতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ‘চিন্তা’ কথাটির প্রকৃত অর্থ কী। ১৮৫০ থেকে ১৯৫০—এই এক শতাব্দীতে যুক্তিবিদ্যার জগতে এক বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটে: ভাষাতাত্ত্বিক দর্শনের গণ্ডি পেরিয়ে যুক্তি রূপান্তরিত হয় এক নিখুঁত প্রতীকী গণিতে। এই বিপ্লবের চূড়ান্ত পরিণতি ঘটেছিল ১৯৩৬ সালে অ্যালান টুরিংয়ের যুগান্তকারী গবেষণাপত্রে, যা একদিকে ডিজিটাল কম্পিউটারের তাত্ত্বিক রূপরেখা প্রণয়ন করে এবং অন্যদিকে স্বয়ংক্রিয় যান্ত্রিক চিন্তার চরম গাণিতিক সীমাবদ্ধতাকে উন্মোচিত করে দেয়।
১. জর্জ বুল এবং চিন্তার বীজগণিত
১৮৫৪ সালে ইংরেজ গণিতবিদ জর্জ বুল প্রকাশ করেন তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ: অ্যান ইনভেস্টিগেশন অব দ্য লজ অব থট (An Investigation of the Laws of Thought)। বুল উপলব্ধি করেছিলেন যে অ্যারিস্টটলের দুই হাজার বছরের পুরোনো যুক্তিবিদ্যাকে একটি আনুষ্ঠানিক বীজগণিতীয় সমীকরণে রূপ দেওয়া সম্ভব, যেখানে চলকের মান কোনো বাস্তব সংখ্যা নয়, বরং ‘সত্য’ বা ‘মিথ্যা’ নির্দেশ করে।
বুল একটি বাইনারি জগতের প্রস্তাব করেন যেখানে যে কোনো উক্তি হয় $ (সত্য) অথবা $ (মিথ্যা)। বুলিয়ান অ্যালজেব্রায় যৌক্তিক ক্রিয়াগুলো সাধারণ পাটিগণিতের সাথে সরাসরি মিলে যায়:
- যৌক্তিক গুণ (AND): land y quiv x cdot y$
- যৌক্তিক যোগ (OR): lor y quiv x + y – x cdot y$
- যৌক্তিক বিপরীত (NOT): $ eg x quiv 1 – x$
বুলের এই যুগান্তকারী ধারণা প্রমাণ করল যে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ কোনো অতীন্দ্রিয় মানবিক রহস্য নয়; এটি কিছু সুনির্দিষ্ট বীজগণিতীয় নিয়মের সমষ্টি। ১৯৩৭ সালে এমআইটির তরুণ শিক্ষার্থী ক্লড শ্যানন আবিষ্কার করেন যে এই বুলিয়ান বীজগণিত হুবহু ইলেকট্রিক্যাল সুইচের সাথে মিলে যায়: সুইচ চালু থাকলে $, বন্ধ থাকলে এর মাধ্যমে যুক্তি এবং ইলেকট্রনিক সার্কিটের মধ্যে এক অবিচ্ছেদ্য সেতুবন্ধন রচিত হয়।
২. ফ্রেগে, পিয়ানো এবং ডেভিড হিলবার্টের আনুষ্ঠানিক মহাপ্রকল্প
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে গটলব ফ্রেগে (Gottlob Frege) আধুনিক প্রেডিকেট ক্যালকুলাস এবং কোয়ান্টিফায়ার ($orall, xists$) উদ্ভাবন করেন। পরবর্তীতে বার্ট্রান্ড রাসেল এবং আলফ্রেড নর্থ হোয়াইটহেড তাঁদের বিখ্যাত প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা (১৯১০–১৯১৩) গ্রন্থে সম্পূর্ণ গণিতকে বিশুদ্ধ যুক্তিবিদ্যার ওপর দাঁড় করানোর বিশাল উদ্যোগ নেন।
১৯২৮ সালে ইতালির বোলোনিয়ায় আন্তর্জাতিক গণিত সম্মেলনে বিশ্বখ্যাত গণিতবিদ ডেভিড হিলবার্ট তাঁর বিখ্যাত ফরমালিস্ট প্রোগ্রাম ঘোষণা করেন। তিনি গণিতের ভিত্তি সম্পর্কে তিনটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করেন:
- সম্পূর্ণতা (Completeness): গণিতের প্রতিটি সত্য উক্তিকে কি গৃহীত স্বতঃসিদ্ধ বা সূত্রের সাহায্যে প্রমাণ করা সম্ভব?
- সংগতি (Consistency): এটি কি নিশ্চিত করে প্রমাণ করা যায় যে গণিতের নিয়মে কখনোই কোনো স্ববিরোধিতা ( land eg P$) দেখা দেবে না?
- নির্ণেয়তা (Decidability বা Entscheidungsproblem): এমন কি কোনো সাধারণ যান্ত্রিক অ্যালগরিদম বা প্রক্রিয়া তৈরি করা সম্ভব, যা যেকোনো গাণিতিক প্রস্তাবনা পরীক্ষা করে সসীম সংখ্যক ধাপে বলে দিতে পারবে যে উক্তিটি সত্য নাকি মিথ্যা?
হিলবার্ট গভীর আশাবাদী ছিলেন যে এই তিনটি প্রশ্নের উত্তরই হবে ইতিবাচক। তিনি বিশ্বাস করতেন মানব জ্ঞানের কোনো সীমারেখা থাকতে পারে না। গটিংগেনে তাঁর সমাধিতে খোদাই করা রয়েছে তাঁর বিখ্যাত বাণী: “আমাদের জানতেই হবে। আমরা জানতে পারবই।”
৩. গোডেলের ভূমিকম্প: ইনকমপ্লিটনেস উপপাদ্য (১৯৩১)
হিলবার্টের এই নিখুঁত গাণিতিক দুর্গের স্বপ্ন ভেঙে খানখান হয়ে যায় ১৯৩১ সালে। অস্ট্রিয়ার মাত্র পঁচিশ বছর বয়সী তরুণ যুক্তিবিদ কুর্ট গোডেল (Kurt Gödel) প্রকাশ করেন তাঁর ঐতিহাসিক ইনকমপ্লিটনেস থিওরেম। গোডেল গাণিতিক উক্তি ও প্রতীকগুলোকে একটি অনন্য মৌলিক সংখ্যার বিন্যাসে কোড করার পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন (যা গোডেল নাম্বারিং নামে পরিচিত)।
এর মাধ্যমে গোডেল গণিতের ভেতরেই এমন একটি স্ব-উল্লেখকারী বাক্য $ তৈরি করেন যা দাবি করে—”আমাকে এই স্বতঃসিদ্ধের নিয়মে প্রমাণ করা অসম্ভব”:
$ iff eg ext{Prov}_F(ulcorner G ulcorner)$$
যদি গাণিতিক ব্যবস্থাটি সংগতিপূর্ণ হয়, তবে $ কে কখনোই প্রমাণ করা যাবে না। আর প্রমাণ করা না গেলেই বাক্যটি সত্য হয়ে ওঠে! গোডেলের প্রথম উপপাদ্য এক অবিশ্বাস্য সত্য উন্মোচন করল: যেকোনো গাণিতিক ব্যবস্থা যদি সংগতিপূর্ণ হয়, তবে তা কখনোই সম্পূর্ণ হতে পারে না। এমন কিছু সত্য সর্বদা বিদ্যমান থাকবে যা ঐ সিস্টেমের নিয়মের ভেতর থেকে কখনোই প্রমাণ করা সম্ভব নয়। হিলবার্টের প্রথম দুটি প্রশ্নের ইতিবাচক স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গেল। কিন্তু তৃতীয় প্রশ্নটি—ডিসিশন প্রবলেম—তখনও অমীমাংসিত ছিল।
৪. অ্যালান টুরিং এবং ইউনিভার্সাল মেশিন (১৯৩৬)
কোনো যান্ত্রিক অ্যালগরিদম সব সত্য নির্ধারণ করতে পারে কি না, তা জানতে হলে প্রথমে সংজ্ঞায়িত করতে হতো—‘যান্ত্রিক প্রক্রিয়া’ বলতে আসলে কী বোঝায়। ১৯৩৬ সালে কেমব্রিজের চব্বিশ বছর বয়সী ফেলো অ্যালান টুরিং রচনা করেন তাঁর ঐতিহাসিক গবেষণাপত্র: অন কম্পিউটেবল নাম্বারস, উইথ অ্যান অ্যাপ্লিকেশন টু দ্য এন্টশাইডুংসপ্রবলেম।
টুরিং বিশ্লেষণ করলেন একজন সাধারণ মানুষ খাতা-কলমে হিসাব করার সময় আসলে ঠিক কী কী কাজ করে। তিনি এই মানবিক প্রক্রিয়াটিকে একটি নিখুঁত ও সহজ গাণিতিক বিমূর্ততায় রূপ দিলেন, যা আজ টুরিং মেশিন নামে পরিচিত।
টুরিং মেশিনের মৌলিক উপাদানগুলো ছিল:
- একটি অসীম দৈর্ঘ্যের ফিতা বা টেপ, যা খণ্ড খণ্ড ঘরে বিভক্ত এবং প্রতিটি ঘরে একটি নির্দিষ্ট প্রতীক ($Sigma$) লেখা থাকতে পারে।
- একটি রিড/রাইট হেড, যা টেপের ওপর অবস্থান করে ঘর থেকে প্রতীক পড়তে পারে, নতুন প্রতীক লিখতে পারে এবং এক ঘর ডানে ($) বা বাঁয়ে ($) সরতে পারে।
- একটি স্টেট রেজিস্টার, যা মেশিনের বর্তমান অভ্যন্তরীণ অবস্থা ($) সংরক্ষণ করে।
- একটি রূপান্তর নিয়ম বা ট্রানজিশন ফাংশন ($delta$), যা নির্দেশ করে বর্তমান প্রতীক ও অবস্থার সাপেক্ষে মেশিনটি পরবর্তীতে কী লিখবে এবং কোথায় যাবে।
টুরিংয়ের মূল বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লব ছিল ইউনিভার্সাল টুরিং মেশিন (UTM)-এর ধারণা। টুরিং দেখালেন যে প্রতিটি আলাদা কাজের জন্য আলাদা যন্ত্র বানানোর প্রয়োজন নেই। একটি সাধারণ ইউনিভার্সাল মেশিন নিজেই অন্য যেকোনো টুরিং মেশিনের প্রোগ্রাম ও ডেটা নিজের টেপে গ্রহণ করে হুবহু সেই মেশিনের মতো কাজ সম্পন্ন করতে পারে:
$$mathcal{U}(langle M, w angle) = M(w)$$
এটিই ছিল আজকের আধুনিক কম্পিউটারের মূল নীতি—যেখানে হার্ডওয়্যার থাকে অপরিবর্তিত, আর টেপে লেখা সফটওয়্যার বা প্রোগ্রামের পরিবর্তনের মাধ্যমে একই যন্ত্র ওয়ার্ড প্রসেসর, ক্যালকুলেটর কিংবা গেম কনসোলে রূপান্তরিত হয়।
৫. হল্টিং প্রবলেম এবং কৃত্রিম বুদ্ধির চরম সীমা
টুরিং তাঁর ইউনিভার্সাল মেশিনের ধারণাকে কাজে লাগিয়ে হিলবার্টের তৃতীয় প্রশ্নের উত্তর দেন। তিনি দাঁড় করান বিখ্যাত হল্টিং প্রবলেম (Halting Problem): এমন কি কোনো সাধারণ অ্যালগরিদম $ তৈরি করা সম্ভব, যা যেকোনো প্রোগ্রাম $ এবং ইনপুট $ দেখে বিশ্লেষণ করে আগে থেকেই বলে দিতে পারবে যে প্রোগ্রামটি অনন্তকাল ধরে চলবে নাকি একসময় থামবে?
টুরিং ক্যান্টরের ডায়াগোনাল পদ্ধতির সাহায্যে এক অকাট্য স্ববিরোধিতা তৈরি করলেন। ধরা যাক, এমন একটি নিখুঁত অ্যালগরিদম (M, w)$ সম্ভব। তবে আমরা একটি বিপরীতমুখী মেশিন $ তৈরি করতে পারি, যা নিজের ইনপুট হিসেবে অন্য একটি মেশিনের কোড গ্রহণ করে:
- মেশিন $ তার ভেতরে থাকা $ কে জিজ্ঞাসা করবে: প্রোগ্রাম $ কি নিজের কোড চালালে থামবে?
- যদি $ বলে “থামবে”, তবে $ ইচ্ছাকৃতভাবে অনন্ত লুপে চলে যাবে এবং কখনোই থামবে না।
- যদি $ বলে “থামবে না (অনন্তকাল চলবে)”, তবে $ সাথে সাথে কাজ বন্ধ করে থেমে যাবে।
এখন প্রশ্ন হলো, যদি মেশিন $-এর ভেতরে তার নিজের কোডই ইনপুট হিসেবে দেওয়া হয়—(langle D angle) কী ঘটবে?
$$ ext{যদি } D ext{ থামে} implies H ext{ বলবে “থামবে”} implies D ext{ অনন্তকাল চলবে (স্ববিরোধিতা!)}$$
$$ ext{যদি } D ext{ অনন্তকাল চলে} implies H ext{ বলবে “চলবে”} implies D ext{ সাথে সাথে থেমে যাবে (স্ববিরোধিতা!)}$$
এই স্ববিরোধিতা প্রমাণ করে যে এমন কোনো সাধারণ অ্যালগরিদম $ বাস্তবে থাকা গাণিতিকভাবে অসম্ভব। এর মাধ্যমে হিলবার্টের এন্টশাইডুংসপ্রবলেম-এর নেতিবাচক সমাপ্তি ঘটে: যান্ত্রিক গণনার একটি অনতিক্রম্য আনুষ্ঠানিক সীমা রয়েছে। অ্যালগরিদম দিয়ে সব গাণিতিক সত্য নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
টুরিংয়ের এই আবিষ্কার ছিল এক যুগল উপহার। একদিকে তিনি দেখিয়েছিলেন যে যন্ত্রের যুক্তি অসীম নয়, এর সুনির্দিষ্ট গাণিতিক সীমানা রয়েছে। অন্যদিকে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে মহাবিশ্বে যা কিছু অ্যালগরিদমিকভাবে সমাধানযোগ্য, তা কেবল একটি ইউনিভার্সাল মেশিনের মাধ্যমেই সমাধান করা সম্ভব। আর যদি মানুষের মস্তিষ্ক ও বুদ্ধিমত্তা কোনো ভৌত ও গণনযোগ্য নিয়ম মেনে চলে, তবে সেই নীতিকে ইউনিভার্সাল মেশিনে ধারণ করে কৃত্রিম মনের জন্ম দেওয়া তাত্ত্বিকভাবে পুরোপুরি সম্ভব।