কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুদীর্ঘ ইতিহাসে বহু সম্মেলন ও গবেষণাপত্র রয়েছে, কিন্তু এর আধুনিক ইতিহাসের যদি একটি ‘বিগ ব্যাং’ বা মহাবিস্ফোরণের মুহূর্ত চিহ্নিত করতে হয়, তবে তা হলো ২০১২ সালের শরৎকাল। ইতালির ফ্লোরেন্সে অনুষ্ঠিত কম্পিউটার ভিশন প্রতিযোগিতায় অ্যালেক্সনেট (AlexNet) নামের একটি গভীর নিউরাল নেটওয়ার্ক বিশ্বের তাবৎ ক্লাসিক্যাল সিস্টেমকে ধূলিসাৎ করে দেয়। মুহূর্তের মধ্যে গত বিশ বছরের প্রচলিত কম্পিউটার সায়েন্সের নিয়ম বদলে গেল এবং শুরু হলো আধুনিক ‘ডিপ লার্নিং’ বিপ্লব।
১. ফেই-ফেই লির ঐতিহাসিক বাজি: অ্যালগরিদমের আগে ডেটা
২০০৬ সালের দিকে মেশিন লার্নিং গবেষকদের ধারণা ছিল—কম্পিউটারকে বুদ্ধিমান বানাতে হলে আরও জটিল ও সূক্ষ্ম গাণিতিক অ্যালগরিদম দরকার। হাতে তৈরি কয়েক হাজার ছবির ছোট ডেটাসেট নিয়েই সবাই সন্তুষ্ট ছিল।
কিন্তু প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ সহকারী অধ্যাপক ফেই-ফেই লি (Fei-Fei Li) সমস্যাটিকে উল্টোভাবে দেখলেন। মানুষের একটি শিশু যখন দেখতে শেখে, তখন সে কয়েক বছরে কোটি কোটি বাস্তব দৃশ্য অবলোকন করে। যন্ত্রকে যদি পৃথিবী দেখতে ও চিনতে শেখাতে হয়, তবে তাকে কেবল কয়েকটি ফর্মুলা দিলে হবে না; তাকে দিতে হবে গোটা বাস্তব পৃথিবীর একটি সম্পূর্ণ ভিজ্যুয়াল অভিধান।
২০০৭ সাল থেকে তিনি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত কোটি কোটি ছবি অ্যামাজন মেকানিক্যাল টার্কের সাহায্যে মানুষের মাধ্যমে লেবেলিং শুরু করেন। ২০০৯ সালে উন্মোচিত হয় ইমেজনেট (ImageNet): মানব সভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ছবির ডেটাসেট, যাতে ছিল ২১,৮০০টি বিভাগে ১ কোটি ৪০ লাখেরও বেশি লেবেলযুক্ত ছবি!
২০১০ সাল থেকে চালু হলো ইমেজনেট আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা (ILSVRC)—যেখানে ১,০০০টি বৈচিত্র্যময় ক্যাটাগরির ১২ লাখ ছবি চেনার জন্য বিশ্বের সেরা দলগুলো অংশ নিত। প্রথম দুই বছর প্রচলিত সিস্টেমগুলোর ভুলের হার ২৬%-এর আশেপাশে স্থবির হয়ে ছিল।
২. টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই তিন পথিকৃৎ
কানাডার টরন্টোতে দীর্ঘ শীতকালের মধ্যেও নিউরাল নেটওয়ার্কের আশায় বুক বেঁধে কাজ করছিলেন জেফ্রি হিন্টন (Geoffrey Hinton)। তাঁর দুই প্রতিভাবান পিএইচডি শিক্ষার্থী ছিলেন—কোডিং জিনিয়াস অ্যালেক্স ক্রিজেভস্কি এবং প্রখর তাত্ত্বিক ইলিয়া সুতস্কেভার।
ক্রিজেভস্কি বুঝতে পেরেছিলেন যে লাখ লাখ ছবির ম্যাট্রিক্স গুণ করতে সাধারণ সিপিইউ (CPU) অত্যন্ত ধীরগতির। তিনি দুটি গেমিং গ্রাফিক্স কার্ড—NVIDIA GeForce GTX 580 কিনে সরাসরি সিইউডিএ (CUDA) ভাষায় কাস্টম কোড লিখে সমান্তরাল গণনার এক দানবীয় ইঞ্জিন তৈরি করলেন।
৩. অ্যালেক্সনেটের তিনটি স্থাপত্য বিপ্লব
অ্যালেক্সনেট ছিল ৬০ মিলিয়ন প্যারামিটার ও ৮ স্তরের একটি গভীর কনভোলিউশনাল নেটওয়ার্ক। এর বিস্ময়কর সাফল্যের পেছনে ছিল তিনটি মূল স্তম্ভ:
- রিলু (ReLU) অ্যাক্টিভেশন:
$$f(x) = max(0, x)$$
পুরোনো সিগময়েড ফাংশনের বদলে রিলু ব্যবহারের ফলে গ্রেডিয়েন্ট শূন্যে মিলিয়ে যাওয়া (Vanishing Gradient) চিরতরে বন্ধ হলো এবং নেটওয়ার্কের শেখার গতি ছয় গুণ বৃদ্ধি পেল। - ড্রপআউট (Dropout):
প্রশিক্ষণের সময় এলোমেলোভাবে অর্ধেক নিউরন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হতো। এর ফলে নিউরনগুলো একে অপরের ওপর অন্ধভাবে নির্ভরশীল না হয়ে স্বাধীন ও শক্তিশালী বৈশিষ্ট্য চিনতে পারত, যা ওভারফিটিং দূর করেছিল। - ডেটা অগমেন্টেশন:
ছবিগুলোকে উল্টে-পাল্টে এবং কেটে ডেটাসেটকে কৃত্রিমভাবে বহুগুণ বড় করে নেওয়া হতো।
৪. ২০১২ সালের সেই অবিস্মরণীয় দিন
২০১২ সালের অক্টোবর মাসে যখন ফলাফল ঘোষণা করা হলো, বিচারকরা নিজেদের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না:
- দ্বিতীয় স্থান (বিশ্বের সেরা ক্লাসিক্যাল সিস্টেম): ২৬.২% ভুলের হার।
- প্রথম স্থান (অ্যালেক্সনেট): ১৫.৩% ভুলের হার!
১০.৯ শতাংশের এই আকাশচুম্বী ব্যবধান ছিল প্রতিযোগিতার ইতিহাসে সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য। বিচারকরা প্রথমে ভেবেছিলেন কোডে কোনো ভুল হয়েছে। কিন্তু কোড নিখুঁত ছিল। ডিপ লার্নিং তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে দিল।
৫. সিলিকন ভ্যালির স্বর্ণযাত্রা
এরপর ইতিহাস উল্কার গতিতে এগিয়ে গেল। কয়েক মাসের মধ্যে গুগল জেফ্রি হিন্টনের স্টার্টআপ কিনে নিল ৪ কোটি ৪০ লাখ ডলারে। ফেসবুক ইয়ান লেকানকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করল ফেয়ার (FAIR)। আর যে এনভিডিয়ার গ্রাফিক্স কার্ড কেবল ভিডিও গেম খেলার জন্য তৈরি হতো, সেই এনভিডিয়ার প্রধান জেনসেন হুয়াং দূরদর্শিতার সাথে পুরো কোম্পানিকে ডিপ লার্নিং কম্পিউটিংয়ের কেন্দ্রে পরিণত করলেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন সূর্য উদিত হলো।