দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অস্থির দিনগুলোতে এক অবিশ্বাস্য আন্তঃবিভাগীয় বিপ্লব দানা বাঁধছিল। নিউরোফিজিওলজিস্ট, গণিতবিদ ও ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়াররা উপলব্ধি করলেন যে কোনো উদ্দেশ্যমুখী বা লক্ষ্যভিত্তিক আচরণ কেবল জীবিত প্রাণীর একান্ত নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নয়। মানব মস্তিষ্কের জৈব নিউরনের স্পন্দনকে গাণিতিক যুক্তির সাথে মিলিয়ে এবং আচরণকে নিয়ন্ত্রিত ফিডব্যাক লুপের কাঠামোয় বেঁধে ১৯৪০-এর দশকের সাইবারনেটিক্স আন্দোলন আধুনিক কৃত্রিম নিউরাল নেটওয়ার্কের জন্ম দিয়েছিল।
১. ১৯৪৩ সালের যুগান্তকারী বিপ্লব: ওয়ারেন ম্যাককুলাক ও ওয়াল্টার পিটস
১৯৪৩ সালে ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত নিউরোসাইকিয়াট্রিস্ট ওয়ারেন ম্যাককুলাক (Warren McCulloch) এবং মাত্র আঠারো বছর বয়সী স্বশিক্ষিত গণিত প্রতিভাবান ওয়াল্টার পিটস (Walter Pitts) যৌথভাবে একটি ঐতিহাসিক গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন: এ লজিক্যাল ক্যালকুলাস অব দি আইডিয়াস ইম্যানেন্ট ইন নার্ভাস অ্যাক্টিভিটি (A Logical Calculus of the Ideas Immanent in Nervous Activity)।
ম্যাককুলাক ও পিটস আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞানের ‘অল-অর-নান’ (All-or-None) সূত্রের ওপর ভিত্তি করেন। জীববিজ্ঞানী সান্তিয়াগো রামোন ই কাহাল ও চার্লস শেরিংটন দেখিয়েছিলেন যে একটি স্নায়ুকোষের মেমব্রেন পটেনশিয়াল যখন নির্দিষ্ট থ্রেশহোল্ড অতিক্রম করে, তখনই অ্যাক্সন বেয়ে ইলেকট্রিক্যাল স্পাইক নির্গত হয়; আর থ্রেশহোল্ড অতিক্রম না করলে নিউরনটি সম্পূর্ণ নিস্তেজ থাকে।
ম্যাককুলাক এবং পিটস এর মধ্যে এক অসাধারণ গাণিতিক মিল আবিষ্কার করলেন: জৈবিক নিউরনের এই অল-অর-নান আচরণ জর্জ বুলের বাইনারি লজিকের সাথে হুবহু এক। নিউরন ফায়ার করা মানে ‘সত্য’ ($) এবং নিস্তেজ থাকা মানে ‘মিথ্যা’ ($)।
২. থ্রেশহোল্ড নিউরনের গাণিতিক রূপরেখা
ম্যাককুলাক ও পিটস (MCP) জটিল জৈব-রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলোকে বাদ দিয়ে একটি আনুষ্ঠানিক গাণিতিক মডেল দাঁড় করালেন। কোনো নিউরন $ পরবর্তী সময় ধাপে (+1$) সক্রিয় হবে কি না, তা নির্ভর করে পূর্ববর্তী সময় ধাপে তার সাথে যুক্ত অন্যান্য নিউরন থেকে আসা সংকেতের যোগফলের ওপর:
$(t+1) = Theta left( sum_{j} w_{ij} x_j(t) – heta_i ight)$$
এখানে $Theta(z)$ হলো হেভিসাইড স্টেপ ফাংশন:
$$Theta(z) = begin{cases} 1 & ext{যদি } z ge 0 0 & ext{যদি } z < 0 nd{cases}$$
ইনপুট in {0, 1}$ এর সাথে সাইন্যাপটিক ওজন {ij}$ গুণ হয়। ম্যাককুলাক-পিটস মডেলে দুই ধরণের সাইন্যাপ্স ছিল:
- উত্তেজক সাইন্যাপ্স (Excitatory Synapse): যা মেমব্রেন ভোল্টেজকে থ্রেশহোল্ড $ heta_i$-এর দিকে এগিয়ে দেয় ({ij} > 0$)।
- দমনমূলক সাইন্যাপ্স (Inhibitory Synapse): যা সক্রিয় হলে নিউরনটি অন্য সকল ইনপুট সত্ত্বেও সম্পূর্ণ নিস্তেজ থাকতে বাধ্য হয় ({ik} = -infty$)।
এই সরল গাণিতিক নিউরন দিয়ে ম্যাককুলাক এবং পিটস এক যুগান্তকারী উপপাদ্য প্রমাণ করলেন: এই ধরনের কৃত্রিম নিউরনের নেটওয়ার্ক দিয়ে জর্জ বুলের যেকোনো লজিক গেট (AND, OR, NOT) নিখুঁতভাবে তৈরি করা সম্ভব।
- একটি AND গেট তৈরি হয় দুটি ইনপুট ( = 1, w_2 = 1$) এবং থ্রেশহোল্ড $ heta = 2$ দিয়ে।
- একটি OR গেট তৈরি হয় একই ইনপুট এবং থ্রেশহোল্ড $ heta = 1$ দিয়ে।
- একটি NOT গেট তৈরি হয় ইনহিবিটরি সাইন্যাপ্স দিয়ে।
আরও চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, ম্যাককুলাক ও পিটস দেখালেন যে নিউরাল নেটওয়ার্কের মধ্যে যদি বৃত্তাকার বা সাইক্লিক সংযোগ (Recurrent Loop) থাকে, তবে সংকেতটি সেখানে ক্রমাগত ঘুরতে পারে—যা তৈরি করে কৃত্রিম স্মৃতি (Internal Memory)। যেহেতু যেকোনো টুরিং মেশিন কেবল লজিক গেট এবং মেমোরি দিয়ে তৈরি করা সম্ভব, তাই ম্যাককুলাক ও পিটস প্রমাণ করলেন যে যথেষ্ট বড় একটি কৃত্রিম নিউরাল নেটওয়ার্ক তাত্ত্বিকভাবে একটি সম্পূর্ণ সার্বজনীন কম্পিউটার (Turing Complete)। মানুষের মস্তিষ্ক যে মূলত একটি প্রাকৃতিক বায়োলজিক্যাল কম্পিউটার, তা প্রথম গাণিতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো।
৩. নরবার্ট উইনার এবং সাইবারনেটিক্স বিজ্ঞান (১৯৪৮)
যখন ম্যাককুলাক ও পিটস নিউরনের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র লজিক নিয়ে কাজ করছিলেন, তখন এমআইটির গণিতবিদ নরবার্ট উইনার (Norbert Wiener) কাজ করছিলেন সম্পূর্ণ সিস্টেমের সামগ্রিক আচরণ নিয়ে। বিশ্বযুদ্ধের সময় উইনার অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট কামানের নিশানা স্বয়ংক্রিয় করার দায়িত্বে ছিলেন, যেখানে পাইলটের সম্ভাব্য বাঁক ও পলায়ন গতি অনুধাবন করতে হতো।
উইনার বুঝতে পারলেন যে বিমানের গতিপথ অনুসরণ করা, মানুষের এক গ্লাস পানি তুলে নেওয়া, শরীরের রক্তচাপ বা তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা—প্রতিটি প্রক্রিয়ার মূলে রয়েছে একটি অভিন্ন গাণিতিক কাঠামো: ক্লোজড-লুপ নেগেটিভ ফিডব্যাক (Closed-Loop Negative Feedback)। ১৯৪৮ সালে তিনি প্রকাশ করেন তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ সাইবারনেটিক্স (Cybernetics: Or Control and Communication in the Animal and the Machine)।
একটি সাইবারনেটিক সিস্টেমে এজেন্ট তার বর্তমান অবস্থা (t)$ পরিমাপ করে, কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের (t)$ সাথে তুলনা করে এবং এদের বিয়োগফল থেকে এরর বা ত্রুটি সংকেত তৈরি করে:
$(t) = r(t) – y(t)$$
সিস্টেমটি এই ত্রুটি সংকেতের সাহায্যে তার কন্ট্রোলারকে সচল করে ((t) = K cdot e(t)$), যাতে ত্রুটি ক্রমান্বয়ে শূন্যে নেমে আসে। উইনার প্রমাণ করলেন যে কোনো লক্ষ্য অর্জন বা উদ্দেশ্যমুখী আচরণের জন্য কোনো রহস্যময় আত্মার প্রয়োজন হয় না; এটি কার্যকারণ ফিডব্যাক চক্রের এক নিখুঁত পদার্থবৈজ্ঞানিক পরিণতি।
৪. ক্লড শ্যাননের তথ্য তত্ত্ব (Information Theory)
একই বছর—১৯৪৮ সালে—বেল ল্যাবরেটরিজের গণিতবিদ ক্লড শ্যানন প্রকাশ করেন এ ম্যাথমেটিক্যাল থিওরি অব কমিউনিকেশন। শ্যানন তথ্যের ধারণাকে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক উপলব্ধি থেকে পুরোপুরি আলাদা করে ফেলেন এবং একে সংজ্ঞায়িত করেন পরিসংখ্যানিক অনিশ্চয়তা হ্রাসের পরিমাপ হিসেবে।
শ্যানন তথ্যের এন্ট্রপি পরিমাপের সমীকরণ দেন:
$(X) = – sum_{x in mathcal{X}} p(x) log_2 p(x)$$
তিনি প্রমাণ করেন যে যেকোনো বার্তা—তা সে ছবি হোক, শব্দ হোক কিংবা মানুষের ভাষা হোক—বাইনারি ডিজিট বা ‘বিট’ (Bit)-এ রূপান্তরযোগ্য। শ্যাননের এই আবিষ্কার সাইবারনেটিক্স ও প্রাথমিক এআই গবেষণায় এক অমোঘ মাপকাঠি এনে দিল: জ্ঞান অর্জন মানেই হলো সিস্টেমের তথ্যগত বিশৃঙ্খলা বা এন্ট্রপি হ্রাস করা।
৫. মেসি কনফারেন্স (The Macy Conferences): বুদ্ধিবৃত্তিক মহাপীঠ
১৯৪৬ থেকে ১৯৫৩ সালের মধ্যে নিউ ইয়র্কে অনুষ্ঠিত দশটি আন্তঃবিভাগীয় সম্মেলন ইতিহাসে ‘মেসি কনফারেন্স’ নামে অমর হয়ে আছে। এই সম্মেলনে নিয়মিত উপস্থিত থাকতেন নরবার্ট উইনার, ওয়ারেন ম্যাককুলাক, ওয়াল্টার পিটস, জন ভন নিউম্যান, ক্লড শ্যানন এবং সমাজবিজ্ঞানী মার্গারেট মিড।
এটি ছিল আধুনিক বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময়কর মিলনমেলা। ভন নিউম্যান সেখানে উপস্থাপন করতেন ডিজিটাল কম্পিউটারের স্থাপত্য ও আত্ম-প্রতিলিপিকারী সেলুলার অটোমাটা; রস অ্যাশবি দেখাতেন স্বয়ংক্রিয় ভারসাম্যের মেকানিক্যাল হোমিয়োস্ট্যাট; পিটস আলোচনা করতেন নিউরাল যুক্তিবিদ্যা। প্রথমবারের মতো জড় পদার্থবিজ্ঞান এবং জীবন্ত মনের মধ্যকার প্রাচীর ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। মানুষের মন আর কোনো অস্পষ্ট অদৃশ্য সত্তা রইল না—মন পরিণত হলো তথ্য প্রক্রিয়াকরণ ও স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণের এক অপূর্ব সাইবারনেটিক মহাযন্ত্রে।