১৯৫৬ সালের আগস্টের এক আর্দ্র সকালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ হ্যাম্পশায়ারের ডার্টমাউথ কলেজের হ্যানোভার ইন-এর তিন তলায় সমবেত হয়েছিলেন মাত্র দশজন বিজ্ঞানী। সাতাশ বছর বয়সী তরুণ সহকারী অধ্যাপক জন ম্যাককার্থি, মার্ভিন মিনস্কি, ন্যাথানিয়েল রচেস্টার এবং ক্লড শ্যাননের উদ্যোগে আয়োজিত এই সম্মেলনটি মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence) শব্দটির জন্ম দেয় এবং একে একটি আনুষ্ঠানিক বৈজ্ঞানিক শাখা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
১. ডার্টমাউথ-পূর্ব বিচ্ছিন্নতা
১৯৫৬ সালের আগে কৃত্রিম মন নিয়ে কাজ করা বিজ্ঞানীরা ছিলেন বিভিন্ন পরিভাষায় বিভক্ত: নরবার্ট উইনার একে বলতেন সাইবারনেটিক্স; ক্লড শ্যানন ও রস অ্যাশবি বলতেন অটোমেটা তত্ত্ব; অ্যালান টুরিং বলতেন মেশিন ইন্টেলিজেন্স। ম্যাককার্থি সচেতনভাবেই ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ নামটি বেছে নেন—যাতে সাইবারনেটিক্সের এনালগ ফিডব্যাকের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে বিশুদ্ধ প্রতীকী যুক্তি ও অ্যালগরিদমের জগতে প্রবেশ করা যায়।
২. সেই ঐতিহাসিক ভিত্তিপ্রস্তর
১৯৫৫ সালের ৩১ আগস্ট রকফেলার ফাউন্ডেশনের কাছে অনুদানের জন্য জমা দেওয়া প্রস্তাবে ম্যাককার্থি ও তাঁর সহকর্মীরা ইতিহাসের অন্যতম সাহসী বৈজ্ঞানিক অনুকল্প উপস্থাপন করেছিলেন:
“আমরা এই অনুমানের ওপর ভিত্তি করে এগিয়ে যেতে চাই যে, শিক্ষার প্রতিটি দিক বা বুদ্ধিমত্তার যেকোনো বৈশিষ্ট্যকে নীতিগতভাবে এত নিখুঁতভাবে বর্ণনা করা সম্ভব যে একটি যন্ত্র তৈরি করে তা অনুকরণ করা যেতে পারে।”
৩. লজিক থিওরিজিস্ট: নিউয়েল ও সাইমনের চমক
ডার্টমাউথ সম্মেলনে তাত্ত্বিক আলোচনার ভিড়ে সবচেয়ে বড় চমক দেখিয়েছিলেন কার্নেগি মেলন ও র্যান্ড কর্পোরেশনের অ্যালেন নিউয়েল এবং হার্বার্ট সাইমন। তাঁরা সাথে করে নিয়ে এসেছিলেন বিশ্বের প্রথম কার্যকরী এআই প্রোগ্রাম—লজিক থিওরিজিস্ট (Logic Theorist)।
এই প্রোগ্রামটি সাধারণ সংখ্যার হিসাবের বাইরে গিয়ে মানুষের মতো প্রতীকী যুক্তি বিশ্লেষণ করতে পারত। রাসেল ও হোয়াইটহেডের বিখ্যাত প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা-র ৫২টি জটিল গাণিতিক উপপাদ্যের মধ্যে ৩৮টি উপপাদ্য প্রোগ্রামটি নিজে নিজে নির্ভুলভাবে প্রমাণ করে দেখায়—যার একটি প্রমাণ ছিল মূল লেখকদের প্রমাণের চেয়েও সহজ ও সংক্ষিপ্ত!
৪. দুটি ধারার জন্ম: সিম্বলিক বনাম কানেকশনিস্ট
ডার্টমাউথ সম্মেলন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দুটি প্রধান দার্শনিক পথের বিভাজন রেখাও স্পষ্ট করে দেয়:
- প্রতীকী এআই (Symbolic AI): ম্যাককার্থি ও নিউয়েলের ধারা, যা বিশ্বাস করত মানুষের চিন্তা মানেই কিছু প্রতীক, লজিক গেট এবং আনুষ্ঠানিক নিয়মের সুবিন্যস্ত কাঠামো।
- সংযোগবাদ (Connectionism): মিনস্কি ও রোজেনব্ল্যাটের ধারা, যা বিশ্বাস করত মানুষের মস্তিষ্ক যেমন কোটি কোটি নিউরনের সংযোগের মাধ্যমে শেখে, যন্ত্রকেও ঠিক তেমনই নিউরাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে শেখাতে হবে।
ডার্টমাউথের সেই গ্রীষ্ম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে নিছক কল্পবিজ্ঞান থেকে নামিয়ে এনে পরিণত করল এক অমোঘ বাস্তবতায়। শুরু হলো বুদ্ধিমান যন্ত্র গড়ার প্রথম স্বর্ণযুগ।