১৯৭০-এর দশকের শেষভাগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তার প্রথম শীতকাল অতিক্রম করে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ফিরে আসে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এডওয়ার্ড ফেইগেনবাউমের নেতৃত্বে গবেষকরা উপলব্ধি করেন যে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব কোনো সাধারণ যৌক্তিক সূত্রের মধ্যে লুকিয়ে নেই; একজন বিশ্বমানের দাবাড়ু, রসায়নবিদ কিংবা অভিজ্ঞ চিকিৎসকের সাফল্যের আসল উৎস হলো বিপুল পরিমাণ বিশেষায়িত ও প্রায়োগিক জ্ঞান।

১. দ্য নলেজ প্রিন্সিপাল

ফেইগেনবাউম এই দার্শনিক নীতিটিকে সংজ্ঞায়িত করেন নলেজ প্রিন্সিপাল (The Knowledge Principle) হিসেবে:

“একটি সিস্টেম বুদ্ধিমান আচরণ প্রদর্শন করে মূলত তার সুনির্দিষ্ট প্রায়োগিক জ্ঞানের প্রাচুর্যের কারণে, তার সাধারণ যুক্তিবিন্যাস পদ্ধতির জটিলতার কারণে নয়।”

এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে শুরু হলো এক্সপার্ট সিস্টেম (Expert Systems)-এর স্বর্ণযুগ। বিজ্ঞানীদের কাজ হয়ে দাঁড়াল ‘নলেজ ইঞ্জিনিয়ারিং’—যেখানে অভিজ্ঞ ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ারদের সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাক্ষাৎকার নিয়ে তাঁদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও ইনটুইশনকে কিছু সুনির্দিষ্ট বিধিনির্ভর নিয়মে (IF-THEN Rules) রূপান্তর করা হতো।

২. প্রোডাকশন রুল আর্কিটেকচার

একটি এক্সপার্ট সিস্টেম সাধারণ সফটওয়্যারের মতো নয়; এটি জ্ঞান এবং যুক্তিকে দুটি ভিন্ন স্তরে বিভক্ত করে:

  • নলেজ বেস (Knowledge Base): শত শত বা হাজার হাজার নিয়মের ভাণ্ডার:
    $$ ext{IF } langle ext{শর্ত}_১ land ext{শর্ত}_২ dots
    angle implies ext{THEN } langle ext{সিদ্ধান্ত বা চিকিৎসা}
    angle$$
  • ওয়ার্কিং মেমোরি: বর্তমান পরিস্থিতি বা রোগীর লক্ষণ সংক্রান্ত তথ্যাবলী।
  • ইনফারেন্স ইঞ্জিন (Inference Engine): যা নিয়ম ও তথ্যের সমন্বয় ঘটিয়ে যুক্তি চালায়:
    1. ফরোয়ার্ড চেইনিং: লক্ষণ থেকে শুরু করে নিয়মের ধাপ পেরিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো।
    2. ব্যাকওয়ার্ড চেইনিং: একটি সম্ভাব্য রোগ অনুমান করে পেছনে ফিরে প্রমাণ খোঁজা এবং রোগীকে প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করা।

৩. মাইসিন, ডেনড্রাল ও এক্সকন

এই কাঠামোর কার্যকারিতা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলে:

  • ডেনড্রাল (DENDRAL): রসায়নবিজ্ঞানের স্পেকট্রোমেট্রি ডেটা দেখে জটিল অণুর রাসায়নিক গঠন বিশ্লেষণ করত মানুষের চেয়েও নির্ভুলভাবে।
  • মাইসিন (MYCIN): রক্তের জটিল ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ শনাক্ত করে সঠিক অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রাইব করত। স্ট্যানফোর্ড মেডিকেল স্কুলের মূল্যায়নে দেখা গিয়েছিল মাইসিনের চিকিৎসার সুপারিশ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের চেয়েও সমান বা উন্নত ছিল! এতে যুক্ত ছিল অনিশ্চয়তা পরিমাপের জন্য সার্টেইনটি ফ্যাক্টর (Certainty Factor) ক্যালকুলাস।
  • এক্সকন (XCON): ডিইসি (DEC) কর্পোরেশনের জন্য তৈরি এই সিস্টেমটি গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী জটিল কম্পিউটার যন্ত্রাংশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যাসেম্বল করত, যা কোম্পানিটির বার্ষিক প্রায় ৪ কোটি ডলার সাশ্রয় করেছিল।

৪. বাণিজ্যিক উন্মাদনা ও সীমাবদ্ধতা

১৯৮০ থেকে ১৯৮৫ সালের মধ্যে এক্সপার্ট সিস্টেমের পেছনে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করা হয়। কিন্তু এই সিস্টেমগুলোর একটি চরম সীমাবদ্ধতা ছিল: ভঙ্গুরতা (Brittleness)। কোনো নিয়ম সামান্য ব্যতিক্রম হলেই পুরো সিস্টেম বিভ্রান্ত হয়ে পড়ত; এদের কোনো সাধারণ মানবিক কাণ্ডজ্ঞান (Common Sense) ছিল না। বিশাল রুলবেস রক্ষণাবেক্ষণের জটিলতা খুব দ্রুতই আরেকটি সংকটের পথ তৈরি করছিল।