১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্প ছিল সাফল্যের চূড়ায়। ভেনচার ক্যাপিটালের কোটি কোটি ডলার ঢুকছিল বিশেষায়িত এআই স্টার্টআপে, আর জাপানের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় (MITI) ঘোষণা করেছিল ৪০ কোটি ডলারের এক বিশাল ভূ-রাজনৈতিক উদ্যোগ—ফিফথ জেনারেশন কম্পিউটার প্রজেক্ট (FGCS)। কিন্তু মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে এই পুরো বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য ধসে পড়ে, যার ফলে শুরু হয় ইতিহাসের সবচেয়ে বিধ্বংসী দ্বিতীয় এআই শীতকাল (১৯৮৭–১৯৯৩)।
১. জাপানের পঞ্চম প্রজন্মের মহাযজ্ঞ (FGCS)
১৯৮১ সালের অক্টোবরে জাপান পশ্চিমা প্রযুক্তি বিশ্বকে চমকে দিয়ে ফিফথ জেনারেশন কম্পিউটার সিস্টেমস (FGCS) প্রকল্পের ঘোষণা দেয়। গাড়ি ও ভোক্তা ইলেকট্রনিক্সে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর জাপান চেয়েছিল কম্পিউটিংয়ের চূড়ান্ত শ্রেষ্ঠত্ব দখল করতে।
তারা ৫৭ বিলিয়ন ইয়েন ব্যয়ে ‘আইকট’ (ICOT) নামের বিশেষ গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করে। তাদের লক্ষ্য ছিল অতিমাত্রায় উচ্চাকাঙ্ক্ষী:
- ঐতিহ্যবাহী ভন নিউম্যান সিপিইউ আর্কিটেকচার পুরোপুরি বর্জন করা।
- হাজার হাজার কাস্টম প্রসেসরের সমন্বয়ে এমন সুপারকম্পিউটার তৈরি করা, যা সরাসরি লজিক প্রোগ্রামিং (Prolog) ভাষায় প্যারালালে হিসাব কষবে।
- ১৯৯২ সালের মধ্যে প্রতি সেকেন্ডে ১০০ কোটি লজিক্যাল ইনফারেন্স (1 Billion LIPS) সম্পন্ন করার ক্ষমতা অর্জন করা।
- মানুষের কণ্ঠস্বর সরাসরি বুঝতে পারা এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে জাপানি ও ইংরেজি অনুবাদ করতে সক্ষম মেশিন তৈরি করা।
২. পশ্চিমাদের আতঙ্ক: এমসিসি ও আলভে প্রোগ্রাম
পশ্চিমা বিশ্ব এই ঘোষণাকে এক মারাত্মক অর্থনৈতিক হুমকি হিসেবে গ্রহণ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অস্টিনে গঠন করে ‘এমসিসি’ (Microelectronics and Computer Technology Corporation), যার পেছনে ছিল ডারপার বিপুল অর্থায়ন। যুক্তরাজ্য তাদের পূর্ববর্তী নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে চালু করে ৩৫ কোটি পাউন্ডের ‘আলভে প্রোগ্রাম’। শুরু হয় বিশ্বজুড়ে এক উন্মাতাল এআই প্রতিযোগিতা।
৩. লিস্প মেশিনের সোনালী যুগ ও বুদবুদ
প্রতীকী এআই-এর জটিল কোড সাধারণ কম্পিউটারে খুব ধীরগতিতে চলত। ফলে এমআইটির সাবেক গবেষকরা গড়ে তোলেন বিশেষায়িত লিস্প মেশিন ইন্ডাস্ট্রি।
‘সিম্বলিকস’ (Symbolics) এবং ‘এলএমআই’ (LMI)-এর মতো কোম্পানিগুলো তৈরি করে লাখ ডলার মূল্যের বিশেষায়িত ওয়ার্কস্টেশন, যার হার্ডওয়্যার তৈরিই হয়েছিল সরাসরি লিস্প ভাষা চালানোর জন্য। ১৯৮৬ সালে সিম্বলিকসের বার্ষিক আয় ১০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যায়।
৪. ১৯৮৭ সালের মহামন্দা: মুরের সূত্রের কুঠারাঘাত
কিন্তু ১৯৮৭ সালে পুরো এআই বাজার এক নির্মম প্রযুক্তিগত সত্যের মুখে আছড়ে পড়ে: মুরের সূত্র এবং সাধারণ মাইক্রোপ্রসেসরের জয়যাত্রা।
ইনটেল ৩৮৬/৪৮৬ প্রসেসরযুক্ত সাধারণ পিসি এবং সান মাইক্রোসিস্টেমসের স্পার্ক (SPARC) ওয়ার্কস্টেশনগুলোর গতি এত দ্রুত বাড়তে শুরু করে যে খুব অল্প সময়ের মধ্যে একটি সস্তা সাধারণ কম্পিউটার লাখ ডলারের সিম্বলিকস লিস্প মেশিনের চেয়েও দ্রুত গতিতে লিস্প প্রোগ্রাম চালাতে সক্ষম হয়ে ওঠে!
মুহূর্তের মধ্যে বিশেষায়িত এআই হার্ডওয়্যার কেনার কোনো যৌক্তিকতা রইল না:
- সিম্বলিকসসহ প্রায় সকল বিশেষায়িত হার্ডওয়্যার কোম্পানি দেউলিয়া হয়ে যায়।
- শত শত এক্সপার্ট সিস্টেম কোম্পানি বন্ধ হয়ে যায়, কারণ কর্পোরেট গ্রাহকরা বুঝতে পারেন বিশাল রুলবেস সংরক্ষণ করা একটি অন্তহীন দুঃস্বপ্ন।
- ১৯৯২ সালে জাপানের দশ বছর মেয়াদী পঞ্চম প্রজন্মের প্রকল্প কোনো দৃশ্যমান বাণিজ্যিক সাফল্য ছাড়াই নিঃশব্দে সমাপ্ত হয়।
৫. সেই দ্বিতীয় শীতকাল (১৯৮৭–১৯৯৩)
এই ধসের পরিণতি ছিল মারাত্মক। বাণিজ্যিক বিশ্বে ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ শব্দটি একটি অস্পৃশ্য ট্যাবুতে পরিণত হয়। বিজ্ঞানীরা অনুদানের জন্য আবেদনের সময় এআই শব্দটি বাদ দিয়ে ‘পরিসংখ্যানিক গণনা’ বা ‘প্যাটার্ন রিকগনিশন’ লিখতে শুরু করেন। ডারপা তহবিল প্রায় বন্ধ করে দেয়।
কিন্তু এই অন্ধকার শীতকালের আড়ালেই কিছু একনিষ্ঠ বিজ্ঞানী, পদার্থবিদ ও গণিতবিদ তৈরি করছিলেন সেই গাণিতিক হাতিয়ার, যা পরবর্তীতে এআই-এর পুরো রূপরেখাকে উল্টে দিতে যাচ্ছিল: মাল্টি-লেয়ার ব্যাকপ্রোপাগেশন নিউরাল নেটওয়ার্ক।