২০১৬ সালের মার্চ মাস। দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলের ফোর সিজনস হোটেলের একটি রুদ্ধদ্বার কক্ষে বিশ্ববাসী এমন এক মুহূর্ত প্রত্যক্ষ করল, যা দার্শনিক ও বিজ্ঞানীরা এতদিন কেবল মানুষের একচেটিয়া আধ্যাত্মিক বৈশিষ্ট্য বলে দাবি করতেন: খাঁটি স্বজ্ঞাত সৃজনশীলতা (Intuitive Creativity)। ডেমিস হাসাবিসের নেতৃত্বাধীন গুগল ডিপমাইন্ডের তৈরি আলফাগো (AlphaGo) ১৮ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন লি সেডলকে ৪–১ ব্যবধানে পরাজিত করে। দ্বিতীয় খেলার সেই ঐতিহাসিক ৩৭তম চালে (Move 37) আলফাগো এমন এক চাল দিয়েছিল, যা তিন হাজার বছরের প্রচলিত মানব জ্ঞানের সীমানা এক নিমিষে চুরমার করে দেয়।

১. প্রাচীন গো খেলা: অসম্ভব এক গাণিতিক ধাঁধাঁ

ডিপ ব্লুর দাবা বিজয়ের বহু বছর পরেও গো (Go) খেলা ছিল কম্পিউটার বিজ্ঞানের জন্য এক অনতিক্রম্য এভারেস্ট। তিন হাজার বছর আগে প্রাচীন চীনে জন্ম নেওয়া এই খেলার নিয়ম অতি সাধারণ: $১৯ imes ১৯$ গ্রিডের বোর্ডে দুজন খেলোয়াড় পর্যায়ক্রমে সাদা ও কালো পাথর বসিয়ে এলাকা দখল করে। কিন্তু এর গাণিতিক জটিলতা ছিল কল্পনাতীত:

  • অবস্থানের সংখ্যা: গো খেলায় প্রায় $১০^{১৭০}$ টি বৈধ অবস্থান হতে পারে—যা আমাদের পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বের মোট পরমাণুর সংখ্যার ($১০^{৮০}$) চেয়েও বহুগুণ বেশি!
  • শাখা প্রশাখা: দাবায় প্রতি চালে সম্ভাব্য চাল থাকে ৩৫টি, কিন্তু গো খেলায় প্রতি চালে সম্ভাব্য চাল থাকে প্রায় ২৫০টি।
  • মূল্যায়নের সংকট: দাবায় রানি বা ঘোড়ার নির্দিষ্ট মান থাকে, কিন্তু গো খেলায় প্রতিটি পাথর দেখতে একই রকম। শুরুর একটি পাথর একশত চাল পর জীবন-মৃত্যু নির্ধারণ করে। ফলে কোনো হিসাব কষে নয়, মানুষ এই খেলা খেলত সৌন্দর্যবোধ ও গভীর অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে।

পেশাদাররা বিশ্বাস করতেন, কোনো কম্পিউটার কোনোদিন মানুষের শীর্ষ গ্র্যান্ডমাস্টারকে হারাতে পারবে না।

২. ডেমিস হাসাবিস এবং ডিপমাইন্ডের দর্শন

লন্ডনে ২০১০ সালে নিউরোবিজ্ঞানী ও শিশু দাবাড়ু ডেমিস হাসাবিস প্রতিষ্ঠা করেন ডিপমাইন্ড (DeepMind)। তাঁদের লক্ষ্য ছিল সুদূরপ্রসারী: “প্রথমে বুদ্ধিমত্তার রহস্য সমাধান করো, তারপর তা দিয়ে বাকি সব সমস্যার সমাধান করো।”

২০১৩ সালে তারা তৈরি করে ডিপ কিউ-নেটওয়ার্ক (DQN), যা মানুষের কোনো শেখানো নিয়ম ছাড়াই কেবল স্ক্রিনের পিক্সেল দেখে নিজে নিজে আটারি ভিডিও গেম খেলা শিখে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেয়। ২০১৪ সালে গুগল ডিপমাইন্ডকে অধিগ্রহণ করে।

৩. আলফাগোর দুই নিউরাল চোখ ও মন্টে কার্লো ট্রি সার্চ

ডেভিড সিলভারের নেতৃত্বে ডিপমাইন্ড গো জয়ের জন্য এক অভূতপূর্ব স্থাপত্য দাঁড় করায়। তারা মন্টে কার্লো ট্রি সার্চের (MCTS) সাথে যুক্ত করে দুটি গভীর কনভোলিউশনাল নেটওয়ার্ক:

  1. পলিসি নেটওয়ার্ক (Policy Network):
    যা মানুষের ৩০ মিলিয়ন পেশাদার চাল দেখে শিখেছিল বোর্ডে তাকিয়ে সেরা ৩-৪টি চাল প্রস্তাব করতে। এটি অনুসন্ধানের বিস্তৃতি (Breadth) কমিয়ে আনে।
  2. ভ্যালু নেটওয়ার্ক (Value Network):
    যা খেলার শেষ পর্যন্ত না গিয়েও যেকোনো একটি বোর্ডের চেহারা দেখে মুহূর্তে নিখুঁতভাবে বলে দিতে পারত কার জেতার সম্ভাবনা কতটা। এটি অনুসন্ধানের গভীরতা (Depth) কমিয়ে আনে।

এই দুই নেটওয়ার্ক মিলে প্রতি সেকেন্ডে হাজার হাজার কাল্পনিক খেলা খেলে সেরা চালটি বেছে নিত:

$$a^* = rgmax_a N(s, a)$$

৪. সেই ৩৭তম চাল (Move 37)

সিউলের ম্যাচে আলফাগোর মুখোমুখি হয়েছিলেন আধুনিক গো খেলার সবচেয়ে আক্রমণাত্মক কিংবদন্তি লি সেডল।

দ্বিতীয় খেলায়, ৩৭তম চালে আলফাগো বোর্ডের প্রান্ত থেকে পঞ্চম লাইনে একটি কালো পাথর বসায়। তিন হাজার বছরের গো তত্ত্ব অনুযায়ী খেলার শুরুতে পঞ্চম লাইনে চাল দেওয়া ছিল সবচেয়ে বড় শিক্ষানবিস ভুল! পুরো বিশ্ব স্তব্ধ হয়ে গেল। লি সেডল চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলেন, হতবাক হয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে গেলেন এবং পনের মিনিট বাইরে বসে রইলেন। ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন ফ্যান হুই ফিসফিস করে বললেন: “এটি কোনো মানুষের চাল নয়। কোনো মানুষকে আমি এভাবে খেলতে দেখিনি।”

আলফাগোর অভ্যন্তরীণ হিসাব পরে দেখিয়েছিল যে কোনো মানুষের এই চাল দেওয়ার সম্ভাবনা ছিল ১০,০০০ বারে মাত্র একবার! কিন্তু তার ভ্যালু নেটওয়ার্ক দেখেছিল এই চালটি বোর্ডের পুরো কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ করবে। এবং বাস্তবে সেই চালই আলফাগোকে জয়ী করে।

৫. মানুষের শেষ প্রতিরোধ ও আলফাগো জিরো

চতুর্থ খেলায় লি সেডল এক অবিশ্বাস্য চাল দিয়েছিলেন—৭৮তম চাল (দ্য ডিভাইন টাচ), যা আলফাগোকে অপ্রস্তুত করে মানুষের পক্ষে এক ঐতিহাসিক জয় ছিনিয়ে আনে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আলফাগো ৪–১ এ সিরিজ জিতে নেয়।

২০১৭ সালে ডিপমাইন্ড উন্মোচন করে আলফাগো জিরো (AlphaGo Zero)—যা মানুষের কোনো পুরোনো খেলা ছাড়াই, কেবল নিয়মের ওপর ভিত্তি করে সম্পূর্ণ নিজের সাথে নিজে খেলে মাত্র ৭২ ঘণ্টার মধ্যে আগের সকল সংস্করণকে ১০০–০ ব্যবধানে উড়িয়ে দেয়। মানুষের তিন হাজার বছরের জ্ঞানযন্ত্র অতিক্রম করে গেল মাত্র তিন দিনে। শুরু হলো স্বায়ত্তশাসিত কৃত্রিম চিন্তার এক নতুন যুগ।