১৯৬৯ সালে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (MIT) প্রেস থেকে প্রকাশিত হয় একটি গাণিতিক মনোগ্রাফ: মার্ভিন মিনস্কি এবং সিমোর প্যাপার্টের লেখা পারসেপ্ট্রনস (Perceptrons)। একক স্তরের নিউরাল নেটওয়ার্কের ওপর লেখা এই বইটি ছিল সংযোগবাদী গবেষণার কফিনে শেষ পেরেক—যা নিউরাল নেটওয়ার্কের গবেষণাকে এক দশকেরও বেশি সময় স্তব্ধ করে দেয় এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ইতিহাসে প্রথম ‘এআই শীতকাল’ (First AI Winter)-এর জন্ম দেয়।

১. জ্যামিতিক বাধা: এক্সওআর (XOR) সংকট

মিনস্কি ও প্যাপার্ট নিখুঁত গাণিতিক প্রমাণের মাধ্যমে দেখান যে একক স্তরের পারসেপ্ট্রনের চরম সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এটি অত্যন্ত সাধারণ এক্সক্লুসিভ-অর (XOR) যুক্তিও সমাধান করতে পারে না:

$x_1$ $x_2$ XOR আউটপুট ($y$)
০ ০ ০
০ ১ ১
১ ০ ১
১ ১ ০

গ্রাফ কাগজে বসালে দেখা যায়, ধনাত্মক বিন্দু দুটি $(০, ১)$ ও $(১, ০)$ এবং ঋণাত্মক বিন্দু দুটি $(০, ০)$ ও $(১, ১)$ পরস্পরের কোণাকুণি অবস্থান করে। কোনো একটি সরলরেখা টেনে এদের আলাদা করা গাণিতিকভাবে অসম্ভব!

এই সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজন ছিল একাধিক সরলরেখা, যা কেবল একটি মাল্টি-লেয়ার পারসেপ্ট্রন (MLP) বা লুকায়িত স্তরযুক্ত (Hidden Layer) নেটওয়ার্কের মাধ্যমেই সম্ভব ছিল।

২. সেই মারাত্মক মন্তব্য ও গবেষণার অবলুপ্তি

রোজেনব্ল্যাট বহু-স্তরের নেটওয়ার্কের প্রয়োজনীয়তা জানতেন। কিন্তু ১৯৬৯ সালে কোনো অ্যালগরিদম জানা ছিল না যার মাধ্যমে ভেতরের লুকায়িত নিউরনগুলোর ওজন কীভাবে পরিবর্তন করতে হবে তা নির্ধারণ করা যায়। আউটপুটের ভুল জানা থাকলেও ভেতরের নিউরনগুলোর দায় কতটা, তা হিসাব করার কোনো গাণিতিক পথ তখন জানা ছিল না।

মিনস্কি এবং প্যাপার্ট বইটিতে এক মারাত্মক মন্তব্য করে বসলেন:

“আমাদের অন্তর্দৃষ্টি বলে, বহু-স্তরের পারসেপ্ট্রনে যাওয়ার এই প্রচেষ্টা সম্পূর্ণ বন্ধ্যা ও নিষ্ফল।”

বিশ্বখ্যাত এমআইটির দুই দিকপালের এই রায়কে অনুদান প্রদানকারী সংস্থাগুলো চূড়ান্ত সত্য বলে ধরে নিল। ডারপা (DARPA) ও ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন নিউরাল নেটওয়ার্কের সকল গবেষণা অনুদান বাতিল করল। রাতারাতি সংযোগবাদী গবেষণা বন্ধ হয়ে গেল এবং বিজ্ঞানীদের এই বিষয়ে কাজ করাটাই ক্যারিয়ার ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়াল।

৩. ১৯৭৩ সালের লাইটহিল রিপোর্ট ও প্রথম এআই শীত

একই সময়ে প্রতীকী এআই-ও সংকটে পড়ল। কম্পিউটারের সীমিত মেমোরি ও কম্বিনেটোরিয়াল বিস্ফোরণের কারণে বাস্তব জগতের অনুবাদ বা জটিল কাজগুলো আটকে গেল।

১৯৭৩ সালে ব্রিটিশ সায়েন্স রিসার্চ কাউন্সিল স্যার জেমস লাইটহিলকে দায়িত্ব দেয় এআই গবেষণার অগ্রগতি পর্যালোচনার। প্রকাশিত লাইটহিল রিপোর্ট ছিল চূড়ান্ত আক্রমণাত্মক:

  • তিনি দেখান যে এআই গবেষকরা যেসব মহৎ ও অতিরঞ্জিত প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তার ছিটেফোঁটাও পূরণ করতে পারেননি।
  • তিনি কম্বিনেটোরিয়াল বিস্ফোরণকে অনতিক্রম্য বাধা বলে ঘোষণা করেন।
  • এর ফলে ব্রিটিশ সরকার প্রায় সকল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এআই গবেষণার সরকারি অনুদান সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়।

একই সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ম্যানসফিল্ড সংশোধনীর মাধ্যমে ডারপা সরাসরি সামরিক উপযোগিতা ছাড়া সকল তাত্ত্বিক এআই প্রকল্পে অর্থায়ন বন্ধ করে দেয়। শুরু হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দীর্ঘ ও হিমশীতল প্রথম এআই শীতকাল (১৯৭৪–১৯৮০)।