যখন এমআইটি এবং কার্নেগি মেলনের গবেষকরা খাতা-কলমে প্রতীকী লজিক ট্রির নকশা আঁকছিলেন, তখন নিউ ইয়র্কের বাফেলোতে কর্নেল অ্যারোনটিক্যাল ল্যাবরেটরির তরুণ মনোবিজ্ঞানী ফ্র্যাঙ্ক রোজেনব্ল্যাট (Frank Rosenblatt) সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পথে পা বাড়ালেন। ১৯৫৭ সালে তিনি উন্মোচন করলেন পারসেপ্ট্রন (Perceptron)—বিশ্বের প্রথম হার্ডওয়্যার নিউরাল নেটওয়ার্ক, যা মানুষের কোনো প্রোগ্রামিং ছাড়াই সরাসরি সংগৃহীত ডেটা থেকে নিজে নিজে ছবি চিনতে পারত।

১. মার্ক ১ পারসেপ্ট্রনের ভৌত স্থাপত্য

১৯৫৮ সালে তৈরি মার্ক ১ পারসেপ্ট্রন কোনো সফটওয়্যার ছিল না; এটি ছিল একটি বিশাল আকারের ইলেকট্রোমেকানিক্যাল যন্ত্র:

  • রেটিনা (S-ইউনিট): একটি ক্যামেরা বক্সে সাজানো ৪০০টি ক্যাডমিয়াম সালফাইড ফটোকোষ ($২০ imes ২০$ গ্রিড), যা মানুষের চোখের মতো অপটিক্যাল আলো গ্রহণ করত।
  • অ্যাসোসিয়েশন স্তর (A-ইউনিট): ফটোকোষের সংকেতগুলোকে এলোমেলোভাবে একত্রিত করে বৈশিষ্ট্য নির্ণয় করার মধ্যবর্তী স্তর।
  • রেসপন্স ইউনিট (R-ইউনিট) ও পটেনশিওমিটার: মোটরের সাহায্যে চালিত সূক্ষ্ম পটেনশিওমিটার বা রোটারি নব, যা কাজ করত স্নায়ুর ‘সাইন্যাপ্টিক ওজন’ হিসেবে। প্রশিক্ষণের সময় কোনো ভুল হলে ডিসি মোটর স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবগুলোকে ঘুরিয়ে ওজনের মান কম-বেশি করত!

২. পারসেপ্ট্রন লার্নিং অ্যালগরিদম

রোজেনব্ল্যাটের আসল সাফল্য ছিল একটি স্বয়ংক্রিয় এরর-কারেকশন লার্নিং রুল আবিষ্কার করা। ইনপুট ভেক্টর $mathbf{x}$ এবং প্রকৃত লেবেল $y in {-১, +১}$ এর সাপেক্ষে আউটপুট নির্ধারিত হতো:

$$hat{y} = ext{sgn}(mathbf{w}^T mathbf{x} + b) = ext{sgn}left( sum_{i=1}^d w_i x_i + b
ight)$$

যদি মডেলের অনুমান ভুল হতো ($hat{y}
e y$), তবে সাইন্যাপটিক ওজন সরাসরি সংশোধিত হতো:

$$mathbf{w}_{t+1} = mathbf{w}_t + eta y mathbf{x}$$

এখানে $eta$ হলো লার্নিং রেট। জ্যামিতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই সূত্রটি ভুল ক্লাসিফাই হওয়া ডেটার দিকে বিভাজনকারী হাইপারপ্লেন বা সরলরেখাকে একটু একটু করে ঘুরিয়ে সঠিক অবস্থানে নিয়ে যেত।

৩. নোভিকফের কনভার্জেন্স উপপাদ্য (১৯৬২)

১৯৬২ সালে গণিতবিদ আলবার্ট নোভিকফ গাণিতিকভাবে প্রমাণ করেন বিখ্যাত পারসেপ্ট্রন কনভার্জেন্স উপপাদ্য। তিনি দেখান যে যদি কোনো ডেটাসেট লিনিয়ারলি সেপারেবল হয় (অর্থাৎ একটি সরলরেখা বা সমতল দ্বারা দুটি দলকে সম্পূর্ণ আলাদা করা যায়) এবং মার্জিন $gamma > 0$ হয়, তবে পারসেপ্ট্রন অ্যালগরিদম সসীম সংখ্যক ভুলের পর নিশ্চিতভাবে সঠিক বিভাজন রেখা খুঁজে পাবে:

$$k_{ ext{max}} le left( rac{R}{gamma}
ight)^2$$

মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো গাণিতিকভাবে প্রমাণিত হলো যে একটি জড় যান্ত্রিক কাঠামো সরাসরি অভিজ্ঞতা থেকে ভুল শুধরে নিখুঁত জ্ঞান অর্জন করতে পারে।

৪. সংবাদমাধ্যমের উন্মাদনা ও বিরোধের সূত্রপাত

পারসেপ্ট্রনের আবিষ্কার বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করল। ১৯৫৮ সালের ৮ জুলাই দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস মার্কিন নৌবাহিনীর উদ্ধৃতি দিয়ে প্রথম পাতায় লিখেছিল—পারসেপ্ট্রন হলো “এমন এক ইলেকট্রনিক কম্পিউটারের ভ্রূণ, যা ভবিষ্যতে হাঁটতে পারবে, কথা বলতে পারবে, দেখতে পারবে, লিখতে পারবে, নিজের বংশবৃদ্ধি করতে পারবে এবং নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন হবে।”

রোজেনব্ল্যাট স্বপ্ন দেখেছিলেন বহু-স্তরের নিউরাল নেটওয়ার্কের। কিন্তু এমআইটির প্রতীকী ধারার বিজ্ঞানীরা এই প্রচারণাকে দায়িত্বজ্ঞানহীন অতিরঞ্জন হিসেবে দেখলেন। দুই ধারার এই তীব্র সংঘাত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ইতিহাসে এক ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে যাচ্ছিল।