১৯৩০-এর দশকে বংশগতির ক্রোমোজোম তত্ত্ব জীববিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত সত্যে পরিণত হয়েছিল। টমাস হান্ট মরগানের দল ক্রোমোজোমের বুকে শত শত জিনের সুনির্দিষ্ট অবস্থান চিহ্নিত করেছিলেন। কিন্তু এই সাফল্যের পেছনে লুকিয়ে ছিল আরও এক গভীর ও যন্ত্রণাদায়ক জৈব-রাসায়নিক রহস্য: জিন আসলে কী দিয়ে তৈরি? রাসায়নিক বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছিল ক্রোমোজোম মূলত দুটি উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত: ক্ষারীয় প্রোটিন হিস্টোন এবং ফসফরাস সমৃদ্ধ এক অম্লীয় জৈব পলিমার, যার নাম ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড (ডিএনএ)। দীর্ঘ অর্ধ শতাব্দী ধরে বিজ্ঞানীদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে প্রোটিনই বংশগতির বাহক। প্রোটিন বিশটি ভিন্ন ভিন্ন অ্যামিনো অ্যাসিড দিয়ে গঠিত, যার রয়েছে জটিল ত্রিমাত্রিক ভাঁজ এবং বিপুল পরিমাণ তথ্য ধারণ করার অসীম ক্ষমতা। অন্যদিকে ফোবাস লেভিনের ভুল টেট্রানিউক্লিওটাইড হাইপোথিসিস-এর কারণে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন ডিএনএ হলো মাত্র চারটি নিউক্লিওটাইডের (এডেনিন, থাইমিন, গুয়ানিন, সাইটোসিন) একঘেয়ে পুনরাবৃত্তিমূলক এক পলিমার—যা কেবল প্রোটিনকে ধরে রাখার নিষ্ক্রিয় কঙ্কাল হিসেবে কাজ করে।
এই সর্বজনীন ভুল ধারণায় প্রথম আঘাত হানেন ব্রিটিশ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক নিঃসঙ্গ মেডিকেল অফিসার ফ্রেডেরিক গ্রিফিথ (১৮৭৯–১৯৪১), যিনি নিউমোনিয়া মহামারীর কারণ অনুসন্ধান করছিলেন।
গ্রিফিথের রূপান্তর পরীক্ষা (১৯২৮)
গ্রিফিথ স্ট্রেপ্টোকক্কাস নিউমোনি (Streptococcus pneumoniae) ব্যাকটেরিয়ার দুটি ভিন্ন স্ট্রেইন নিয়ে কাজ করছিলেন:
- মসৃণ বা এস-স্ট্রেইন (Smooth Strain): পেট্রিডিশে এদের কলোনি ছিল চকচকে ও মসৃণ। এই ব্যাকটেরিয়ার চারপাশে পলিস্যাকারাইড শর্করার এক সুরক্ষাকারী ক্যাপসুল থাকত, যা ইঁদুরের শ্বেত রক্তকণিকার আক্রমণ থেকে ব্যাকটেরিয়াকে রক্ষা করত। ফলে জীবন্ত এস-ব্যাকটেরিয়া ইঁদুরের শরীরে প্রবেশ করালে দ্রুত নিউমোনিয়া হয়ে ইঁদুর মারা যেত।
- অমসৃণ বা আর-স্ট্রেইন (Rough Strain): এদের কলোনি ছিল খসখসে। একটি জিনগত মিউটেশনের কারণে এরা ক্যাপসুল তৈরি করতে পারত না; ফলে ইঁদুরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এদের সহজেই ধ্বংস করে ফেলত এবং ইঁদুর সুস্থ থাকত।
গ্রিফিথ যখন তাপে মৃত এস-স্ট্রেইন ব্যাকটেরিয়া ইঁদুরে প্রবেশ করালেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই ইঁদুর বেঁচে রইল, কারণ তাপের কারণে ব্যাকটেরিয়াগুলো মারা গিয়েছিল। কিন্তু এরপর গ্রিফিথ এক অদ্ভুত পরীক্ষা চালালেন: তিনি তাপে মৃত এস-স্ট্রেইন এবং সম্পূর্ণ নিরীহ জীবন্ত আর-স্ট্রেইন ব্যাকটেরিয়া একসাথে মিশিয়ে ইঁদুরের শরীরে ইনজেকশন দিলেন।
ফলাফল দেখে গ্রিফিথ স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। মিশ্রণটি দেওয়ার পর সুস্থ ইঁদুরগুলো মারাত্মক নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেল। মৃত ইঁদুরের রক্ত পরীক্ষা করে তিনি দেখলেন সেখানে কোনো নিরীহ আর-ব্যাকটেরিয়া নেই, বরং রক্তে কিলবিল করছে কোটি কোটি জীবন্ত ও ক্যাপসুলযুক্ত মসৃণ এস-স্ট্রেইন ব্যাকটেরিয়া! মৃত ব্যাকটেরিয়ার শরীর থেকে কোনো এক অজানা উপাদান নিরীহ জীবিত ব্যাকটেরিয়ার ভেতরে প্রবেশ করে তাকে চিরতরে রূপান্তর করে ফেলেছে। গ্রিফিথ এই রহস্যময় উপাদানের নাম দিলেন ট্রান্সফরমিং প্রিন্সিপল (Transforming Principle বা রূপান্তরক উপাদান)। শুধু তাই নয়, রূপান্তরিত এই ব্যাকটেরিয়ার বংশধরেরাও ক্যাপসুলযুক্ত হয়ে জন্ম নিল—যা প্রমাণ করল এটি একটি স্থায়ী ও বংশগত পরিবর্তন।
অ্যাভেরি, ম্যাকলয়েড ও ম্যাককার্টির মহাবিপ্লব (১৯৪৪)
১৯৪১ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি বিমান হামলায় গ্রিফিথ তাঁর লন্ডনের গবেষণাগারে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি জেনে যেতে পারেননি তাঁর সেই রূপান্তরকারী উপাদানের আসল পরিচয়। নিউ ইয়র্কের রকফেলার ইনস্টিটিউটের কঠোর সাধক বিজ্ঞানী অসওয়াল্ড টি. অ্যাভেরি (১৮৭৭–১৯৫৫) এবং তাঁর দুই তরুণ সহযোগী কলিন ম্যাকলয়েড ও ম্যাকলিন ম্যাককার্টি এই রহস্য উন্মোচনে আত্মনিয়োগ করেন।
টানা দশ বছর ধরে তাঁরা লিটার লিটার কালচার থেকে মৃত এস-ব্যাকটেরিয়ার নির্যাস বিশুদ্ধ করতে লাগলেন। তাঁরা রাসায়নিকভাবে শর্করা ও চর্বি দূর করলেন এবং অ্যালকোহল দিয়ে সক্রিয় উপাদানটিকে আলাদা করলেন। এই উপাদানটি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে দশ লক্ষ ভাগের এক ভাগ উপস্থিত থাকলেও তা রূপান্তর ঘটাতে সক্ষম হতো।
উপাদানটির প্রকৃত স্বরূপ নিশ্চিত করতে তাঁরা একে বিভিন্ন এনজাইম দিয়ে বিশ্লেষণ করলেন:
- ট্রিপসিন ও কাইমোট্রিপসিন (প্রোটিয়েজ): যা সমস্ত প্রোটিনকে ভেঙে চুরমার করে দেয়। প্রোটিন ধ্বংস করার পরও রূপান্তরক ক্ষমতা শতভাগ বজায় রইল।
- রাইবোনিউক্লিয়েজ (RNase): যা সমস্ত আরএনএ ধ্বংস করে। আরএনএ ধ্বংস করার পরও রূপান্তরক ক্ষমতায় কোনো প্রভাব পড়ল না।
- ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিয়েজ (DNase): একটি নতুন আবিষ্কৃত এনজাইম যা কেবল ডিএনএকে ভেঙে টুকরো করে দেয়। ডিএনএ-ধ্বংসকারী এই এনজাইম প্রয়োগ করার সাথে সাথে রূপান্তরক ক্ষমতা সম্পূর্ণ ও চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে গেল!
রাসায়নিক বিশ্লেষণে দেখা গেল এই উপাদানটিতে নাইট্রোজেন ও ফসফরাসের অনুপাত ১.৬৭ : ১—যা হুবহু ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিডের (DNA) গঠনের সাথে মিলে যায় এবং প্রোটিনের ক্ষেত্রে যা অসম্ভব।
“যদি আমাদের সিদ্ধান্ত সঠিক হয়ে থাকে—যদিও তা এখনো চূড়ান্ত প্রমাণিত নয়—তবে এর অর্থ হলো নিউক্লিক অ্যাসিড কেবল কাঠামোগত কোনো উপাদান নয়, বরং কোষের জৈব রাসায়নিক কার্যকলাপ ও বংশগত বৈশিষ্ট্য নির্ধারণের প্রধান সক্রিয় চালিকাশক্তি।”
— অসওয়াল্ড অ্যাভেরি, ভাই রয় অ্যাভেরিকে লেখা চিঠি (১৯৪৩)
১৯৪৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে জার্নাল অব এক্সপেরিমেন্টাল মেডিসিন-এ প্রকাশিত তাঁদের এই গবেষণাপত্র প্রমাণ করল যে বংশগতির মূল উপাদান ডিএনএ। কিন্তু বিজ্ঞান মহল তখনও দ্বিধান্বিত ছিল; বহু বিজ্ঞানী যুক্তি দেখালেন যে অ্যাভেরির নমুনায় হয়তো ০.১% অদৃশ্য প্রোটিন ছিল যা আসল রূপান্তর ঘটিয়েছে। বিজ্ঞানের বিশ্ব তখন আরও এক অপ্রতিরোধ্য, নাটকীয় প্রমাণের প্রতীক্ষায় ছিল।