১৯৭০-এর দশকে রিকম্বিন্যান্ট ডিএনএ আবিষ্কারের পর চার দশক ধরে বিজ্ঞানীরা টেস্টটিউবে ডিএনএ কাটাছেঁড়া করতে পেরেছিলেন এবং অন্য জীবের জিন কোষে ঢোকাতে পেরেছিলেন। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের কাছে একটি পরম স্বপ্ন তখনো অধরা রয়ে গিয়েছিল: জীবন্ত মানবকোষের ভেতর ঢুকে নির্দিষ্ট কোনো ক্ষারকে নির্ভুলভাবে সম্পাদনা বা ঠিক করা। ধরা যাক কোনো রোগী সিকেল-সেল অ্যানিমিয়া বা হান্টিংটন্স ডিজিজে আক্রান্ত; তার সম্পূর্ণ ৩১০ কোটি ক্ষারের মধ্যে মাত্র একটি বা দুটি ক্ষার ভুল বানানে লেখা আছে। প্রচলিত জেনেটিক পদ্ধতিতে সেই একটিমাত্র ক্ষারকে খুঁজে ঠিক করা ছিল পাহাড় সমান কঠিন, অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রয়োজন ছিল এমন এক আণবিক স্ক্যালপেল বা কাঁচি—যা জটিল প্রোটিনের বদলে সাধারণ ক্ষারের সংকেত পড়ে যেকোনো জিনের কাছে নির্ভুলভাবে পৌঁছে যেতে পারে। ২০১২ সালে সেই পরম কাঁচিটি আবিষ্কৃত হলো কোনো বড় ওষুধ কোম্পানির গবেষণাগার থেকে নয়; বরং ব্যাকটেরিয়ার শরীরের প্রাচীন এক রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার পাঠোদ্ধার করে: যার নাম ক্রিসপার-ক্যাস৯ (CRISPR-Cas9)।

ব্যাকটেরিয়ার রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা

১৯৮৭ সালে জাপানি বিজ্ঞানীরা ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়ার ডিএনএ-তে লক্ষ্য করলেন এক অদ্ভুত পুনরাবৃত্তিমূলক ক্ষারের বিন্যাস—যেখানে ২৯টি পুনরাবৃত্ত ক্ষারের পর পর ছিল ৩২টি সম্পূর্ণ ভিন্ন ক্ষারের ফাঁক বা স্পেসার। ২০০০ সালের প্রারম্ভে স্প্যানিশ বিজ্ঞানী ফ্রান্সিসকো মোজিকা আবিষ্কার করলেন যে এই বিন্যাসটি সকল ব্যাকটেরিয়ার শরীরেই উপস্থিত এবং তিনি এর নাম দিলেন ক্রিসপার (CRISPR)। সবচেয়ে বড় চমক ছিল: সেই স্পেসার অংশগুলোর ক্ষারানুক্রম হুবহু মিলে যাচ্ছিল আক্রমণকারী ভাইরাস বা ব্যাকটেরিওফাযের ডিএনএ-র সাথে!

উন্মোচিত হলো ব্যাকটেরিয়ার নিজস্ব এক অপূর্ব অ্যাডাপটিভ ইমিউন সিস্টেম:

  1. মেমোরি সংরক্ষণ: ভাইরাস যখন ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ করে, ব্যাকটেরিয়ার এনজাইম ভাইরাসের ডিএনএ-র একটি ছোট অংশ কেটে নিয়ে নিজের ক্রিসপার ডিএনএ-র ভেতর ‘আসামির ছবি’র মতো স্থায়ীভাবে বাঁধাই করে রেখে দেয়।
  2. আরএনএ প্রকাশ: এই ছবিগুলো থেকে ছোট ছোট ক্রিসপার আরএনএ (crRNA) তৈরি হয়।
  3. আক্রমণ প্রতিহতকরণ: এই আরএনএ যুক্ত হয় ক্যাস (Cas) নামক এক বিধ্বংসী কাঁচি প্রোটিনের সাথে। সেই ভাইরাস যখন দ্বিতীয়বার আক্রমণ করে, আরএনএ ক্ষণিকের মধ্যে ভাইরাসের ডিএনএ চিনে ফেলে এবং ক্যাস প্রোটিন ক্ষেপণাস্ত্রের মতো ছুটে গিয়ে ভাইরাসের ডিএনএ টুকরো টুকরো করে কেটে ধ্বংস করে দেয়।

ডাউডনা ও চার্পেনশিয়ে: একক গাইড আরএনএ বিপ্লব

২০১১ সালে পুয়ের্তো রিকোর এক সম্মেলনে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট জেনিফার ডাউডনা (জন্ম ১৯৬৪) এবং ফরাসি অণুজীববিজ্ঞানী ইমানুয়েল চার্পেনশিয়ে (জন্ম ১৯৬৮)-এর সাক্ষাৎ হয়। চার্পেনশিয়ে আবিষ্কার করেছিলেন যে স্ট্রেপ্টোকক্কাস পাইয়োজিনেস ব্যাকটেরিয়ার টাইপ-২ ক্রিসপারে crRNA ছাড়াও আরও একটি ছোট আরএনএ প্রয়োজন হয়: যার নাম ট্রেসার আরএনএ (tracrRNA), যা মিলে বিশাল Cas9 এনজাইমকে পরিচালিত করে।

দুই বিজ্ঞানী যৌথভাবে গবেষণায় নামলেন। তাঁরা দেখলেন Cas9 এনজাইমের ভেতর দুটি আলাদা কাঁচি রয়েছে: যা ডিএনএ-র দুই সুতোকেই কেটে দেয় ঠিক সেই জায়গায় যেখানে গাইড আরএনএ গিয়ে বসে—যদি তার পাশে একটি তিন অক্ষরের নির্দেশক বা প্যাম (PAM: NGG) থাকে।

এরপর ডাউডনা ও চার্পেনশিয়ে করলেন এক অবিশ্বাস্য ইঞ্জিনিয়ারিং। প্রাকৃতিকভাবে প্রয়োজনীয় দুটি আলাদা আরএনএ-কে তাঁরা গবেষণাগারে জুড়ে দিয়ে তৈরি করলেন একটিমাত্র অবিচ্ছিন্ন কৃত্রিম আরএনএ: সিঙ্গেল-গাইড আরএনএ (sgRNA)।

“আমরা বুঝতে পারলাম এই ব্যবস্থাকে জিনোম সম্পাদনার এক চূড়ান্ত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব… আপনি কেবল গাইড আরএনএ-র প্রথম বিশটি অক্ষর বদলে দিন যে জিনের কাছে আপনি যেতে চান; Cas9 সোজা সেখানে গিয়ে ঠিক সেই জায়গায় নিখুঁতভাবে ডিএনএ কেটে ফেলবে।”
— জেনিফার ডাউডনা ও ইমানুয়েল চার্পেনশিয়ে, সায়েন্স (১৭ আগস্ট ২০১২)

জিনোম পুনর্লিখনের নতুন যুগ

মাত্র দশ ডলার খরচ করে অনলাইনে বিশ অক্ষরের একটি আরএনএ অর্ডার করলেই যে কেউ মানবকোষের যেকোনো একটি নির্দিষ্ট জিনকে লক্ষ্য করে কেটে ফেলার ক্ষমতা পেয়ে গেল। ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে এমআইটির ফেং ঝাং এবং হার্ভার্ডের জর্জ চার্চ প্রমাণ করলেন যে ক্রিসপার মানুষের জীবিত কোষের ভেতর অবিশ্বাস্য দক্ষতায় জিন কেটে ফেলতে পারে।

Cas9 যখন একটি নির্দিষ্ট জিনে দ্বিসূত্রক কাটা (Double-strand break) তৈরি করে, তখন কোষের নিজস্ব মেরামত ব্যবস্থা দুটি উপায়ে তা জোড়া লাগাতে ছুটে আসে:

  • নন-হোমোলোগাস এন্ড জয়েনিং (NHEJ): কোনো ছাঁচ ছাড়া কোষ তাড়াহুড়ো করে ভাঙা দুই মাথা জুড়ে দিতে গিয়ে কিছু ক্ষার ভুলবশত বাদ দেয় বা যোগ করে। ফলে একটি ক্ষতিকর জিন স্থায়ীভাবে অকেজো বা ‘নকআউট’ হয়ে যায়।
  • হোমোলজি-ডিরেক্টেড রিপেয়ার (HDR): বিজ্ঞানীরা যদি কাটার সাথে সাথে একটি সুস্থ সঠিক ডিএনএ টুকরো ভেতরে দিয়ে দেন, তবে কোষ সেই সঠিক টুকরোটি দেখে দেখে নিখুঁতভাবে নিজের ভুল জিনটিকে সারিয়ে তোলে!

২০২০ সালে জেনিফার ডাউডনা ও ইমানুয়েল চার্পেনশিয়ে রসায়নে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন—বিজ্ঞানে যা প্রথম কোনো একক নারী জুটির নোবেল জয়। মাত্র এক দশকের মধ্যে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে বাজারে এলো বিশ্বের প্রথম ক্রিসপার-ভিত্তিক ওষুধ ক্যাসগেভি (Casgevy), যা দিয়ে সিকেল-সেল রোগের জন্মগত অভিশাপ থেকে মানুষকে সম্পূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব হলো। মানবজাতি অবশেষে জীবনের ভাষার ওপর এক সার্বভৌম ও শক্তিশালী ওয়ার্ড প্রসেসর লাভ করল।