১৯৫৩ সালের সূচনালগ্নে আণবিক জীববিজ্ঞানের মূল প্রশ্ন আর এটি ছিল না যে ডিএনএ বংশগতির উপাদান কি না; আসল প্রশ্ন ছিল ডিএনএ-র ত্রিমাত্রিক জ্যামিতিক গঠন কেমন—যা একদিকে কোটি কোটি জৈবিক তথ্য ধারণ করতে পারে, আবার অন্যদিকে প্রতিবার কোষ বিভাজনের সময় সেই বিপুল তথ্যকে বিন্দুমাত্র ভুল ছাড়াই হুবহু নকল (Replication) করতে পারে। এই পরম রহস্যের সমাধানে কেমব্রিজের ক্যাভেন্ডিশ ল্যাবরেটরি ও লন্ডনের কিংস কলেজের চারজন ক্ষণজন্মা গবেষক জড়িয়ে পড়েছিলেন এক শ্বাসরুদ্ধকর প্রতিযোগিতায়: জেমস ওয়াটসন (মাত্র চব্বিশ বছর বয়সী আমেরিকান তরুণ বিজ্ঞানী), ফ্রান্সিস ক্রিক (ছত্রিশ বছর বয়সী ব্রিটিশ পদার্থবিদ), মরিস উইলকিন্স (কিংস কলেজের বায়োফিজিসিস্ট) এবং রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিন (এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফির অসামান্য প্রতিভাধর ভৌত রসায়নবিদ)।

তিনটি মূল সূত্র: চারগাফের সূত্র ও ফটো ৫১

ডিএনএ-র জটিল ধাঁধার জট খুলতে তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রমাণের মেলবন্ধন ঘটেছিল:

  1. চারগাফের সমতা সূত্র (১৯৫০): অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান বংশোদ্ভূত জৈব রসায়নবিদ আরউইন চারগাফ বিভিন্ন প্রাণীর ডিএনএ বিশ্লেষণ করে আবিষ্কার করেন যে—কোনো ডিএনএ নমুনায় এডেনিনের পরিমাণ সবসময় থাইমিনের সমান ($A = T$), এবং গুয়ানিনের পরিমাণ সবসময় সাইটোসিনের সমান ($G = C$)। অর্থাৎ পিউরিন ও পিরিমিডিনের অনুপাত সর্বদা ১:১। চারগাফ নিজে এই সমতার পেছনের জ্যামিতিক তাৎপর্য বুঝতে পারেননি।
  2. ফ্র্যাঙ্কলিনের অমর ‘ফটো ৫১’: কিংস কলেজে রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিন আবিষ্কার করেন যে ডিএনএ আর্দ্রতার ওপর ভিত্তি করে দুটি ভিন্ন রূপ ধারণ করে: শুষ্ক কেলাসাকার ‘A’ রূপ এবং জলীয় ‘B’ রূপ। ১৯৫২ সালের মে মাসে আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করে একটিমাত্র বি-ডিএনএ তন্তুর ওপর টানা ৬২ ঘণ্টা এক্স-রে রশ্মি ফেলে ফ্র্যাঙ্কলিন যে বিচ্ছুরণ প্যাটার্ন ধারণ করেছিলেন, তা ইতিহাসে পরিচিত ফটো ৫১ নামে। সেই ছবিতে সুস্পষ্ট একটি $X$-আকৃতির প্যাটার্ন দেখা যাচ্ছিল—যা হেলিক্স বা সর্পিল কাঠামোর অকাট্য প্রমাণ। প্যাটার্নটি বলে দিচ্ছিল হেলিক্সের প্রতিটি প্যাঁচের দৈর্ঘ্য ৩৪ অ্যাংস্ট্রম ($৩.৪text{ nm}$) এবং পাশাপাশি দুটি ক্ষারের মধ্যকার দূরত্ব ৩.৪ অ্যাংস্ট্রম ($০.৩৪text{ nm}$)।
  3. অ্যান্টিপ্যারালাল বিন্যাস: ফ্র্যাঙ্কলিনের ক্রিস্টালোগ্রাফিক তথ্য বিশ্লেষণ করে ফ্রান্সিস ক্রিক তাঁর গভীর পদার্থবিজ্ঞানের জ্ঞান দিয়ে বুঝতে পেরেছিলেন যে ডিএনএ-র দুটি সুতো একই দিকে সমান্তরালভাবে চলতে পারে না; বরং তারা অ্যান্টিপ্যারালাল বা বিপরীত-সমান্তরালভাবে চলে—একটি সুতো $5′ rightarrow 3’$ মুখী হলে অপর সুতোটি হবে $3′ rightarrow 5’$ মুখী।

কার্ডবোর্ডের মডেল ও আণবিক বিপ্লব

আমেরিকার কিংবদন্তি রসায়নবিদ লাইナス পলিং ভুলবশত ডিএনএ-র একটি ট্রিপল-হেলিক্স বা তিন-সুতার মডেল প্রস্তাব করেছিলেন, যার ফসফেট মেরুদণ্ড ছিল ভেতরের দিকে। ওয়াটসন ও ক্রিক বুঝলেন তা অসম্ভব, কারণ শারীরবৃত্তীয় pH-এ ফসফেটের ঋণাত্মক চার্জগুলো একে অপরকে তীব্রভাবে বিকর্ষণ করবে। তাই ফসফেটের মেরুদণ্ড থাকতে হবে বাইরে জলীয় পরিবেশের দিকে, আর নাইট্রোজেন ক্ষারগুলো লুকানো থাকবে ভেতরে।

১৯৫৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে ক্যাভেন্ডিশ ল্যাবরেটরির অস্টিন উইংয়ে বসে জেমস ওয়াটসন শক্ত কার্ডবোর্ড কেটে চারটি ক্ষারের মডেল তৈরি করছিলেন। আমেরিকান ভৌত রসায়নবিদ জেরি ডনোহুর পরামর্শে তিনি পাঠ্যপুস্তকের ভুল ‘এনল’ রূপের বদলে সঠিক ‘কিটো’ রূপের গুয়ানিন ও থাইমিন ব্যবহার করলেন।

টেবিলের ওপর কার্ডবোর্ডের টুকরোগুলো নাড়াচাড়া করতে গিয়ে ওয়াটসন হঠাৎ এক অপূর্ব প্রাকৃতিক সামঞ্জস্যের মুখোমুখি হলেন:

  • দুটি হাইড্রোজেন বন্ধনযুক্ত একটি এডেনিন-থাইমিন ($A-T$) জোড়ার সামগ্রিক জ্যামিতিক আয়তন হুবহু তিনটি হাইড্রোজেন বন্ধনযুক্ত গুয়ানিন-সাইটোসিন ($G-C$) জোড়ার সমান!
  • একটি বড় দ্বিবলয় পিউরিন ক্ষার ($A$ বা $G$) সবসময় একটি ছোট একবলয় পিরিমিডিন ক্ষারের ($T$ বা $C$) সাথে জোড়া বাঁধে, যার ফলে পুরো হেলিক্স জুড়ে ব্যাস সর্বদা নিখুঁতভাবে ২০ অ্যাংস্ট্রম ($২.০text{ nm}$) বজায় থাকে।

“আমরা যে নির্দিষ্ট ক্ষার জোড়ের কথা উল্লেখ করেছি, তা তাৎক্ষণিকভাবে বংশগতির উপাদানের হুবহু অনুলিপিকরণের একটি সহজ প্রক্রিয়ার ইঙ্গিত দেয়—যা আমাদের দৃষ্টি এড়ায়নি।”
— জেমস ওয়াটসন ও ফ্রান্সিস ক্রিক, নেচার (২৫ এপ্রিল ১৯৫৩)

সেদিন দুপুরে কেমব্রিজের ঈগল পাবে গিয়ে ওয়াটসন ও ক্রিক বন্ধুদের জানিয়েছিলেন যে তাঁরা “জীবনের রহস্য খুঁজে পেয়েছেন।” ১৯৫৩ সালের ২৫ এপ্রিল নেচার পত্রিকায় মাত্র ৯০০ শব্দের ঐতিহাসিক আর্টিকেলে ওয়াটসন ও ক্রিক তাঁদের অ্যান্টিপ্যারালাল বি-ডিএনএ ডাবল হেলিক্স মডেল প্রকাশ করেন। উন্মোচিত হলো যে বংশগতির ভাষা লেখা থাকে এই ক্ষারজোড়ের রৈখিক শৃঙ্খলে; আর একটি সুতো অপরটির পরিপূরক হওয়ায় সুতো দুটি আলাদা হয়ে গেলেই প্রতিটি সুতো নতুন একটি পরিপূরক সুতো তৈরির ছাঁচ হিসেবে কাজ করে। বিজ্ঞান প্রবেশ করল এক নতুন যুগে।