ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে জীববিজ্ঞানের কাছে প্রজাতির বিবর্তনের এক অপূর্ব তত্ত্ব উপস্থিত ছিল, কিন্তু সেই বিবর্তনকে চালনা করার আণবিক ইঞ্জিন সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের কোনো ধারণাই ছিল না। ১৮৫৯ সালে চার্লস ডারউইন তাঁর অমর গ্রন্থ অন দ্য অরিজিন অব স্পিসিস প্রকাশ করেন, যেখানে তিনি দেখান যে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে জীবের ধারাবাহিক বাহ্যিক বৈচিত্র্য থেকে নতুন প্রজাতির জন্ম হয়। কিন্তু ডারউইনের এই মহান তত্ত্বের পেছনে লুকিয়ে ছিল এক মারাত্মক তাত্ত্বিক দুর্বলতা: তৎকালীন সমাজে বিশ্বাস করা হতো মিশ্রিত বংশগতি (Blending Inheritance)। এই মতবাদ অনুযায়ী পিতা-মাতার বংশগত উপাদান তরল রঙের মতো মিশে যায়—কালো ও সাদা রঙের তরল মেশালে যেমন ধূসর রঙ তৈরি হয়। যদি কোনো জীবের মাঝে আকস্মিকভাবে কোনো উপকারী নতুন বৈশিষ্ট্য দেখা দেয়, তবে স্বাভাবিক সঙ্গীর সাথে প্রজননের ফলে পরবর্তী প্রতি প্রজন্মে সেই বৈশিষ্ট্য অর্ধেক পরিমাণে ক্ষয়প্রাপ্ত হবে এবং কয়েক প্রজন্মের মধ্যে চিরতরে হারিয়ে যাবে। ফলে প্রাকৃতিক নির্বাচন তাকে টিকিয়ে রাখার সুযোগই পাবে না।

এই ঐতিহাসিক আপাতবিরোধের গাণিতিক সমাধান কোনো অক্সফোর্ড, প্যারিস কিংবা বার্লিনের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্জিত হয়নি; বরং তা ঘটেছিল বর্তমান চেক প্রজাতন্ত্রের ব্রনো শহরের সেন্ট থমাস মঠের মাত্র ৩৫ মিটার দৈর্ঘ্যের এক শান্ত চারকোনা বাগানে। সেখানে ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান ও সম্ভাব্যতা তত্ত্বে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অগাস্টিনিয়ান সন্ন্যাসী গ্রেগর ইয়োহান মেন্ডেল (১৮২২–১৮৮৪) শুরু করেছিলেন আট বছরব্যাপী এক ঐতিহাসিক গবেষণা, যা জীবদেহের অবিচ্ছিন্ন তরল বংশগতির ধারণাকে চিরতরে ধূলিসাৎ করে দিয়েছিল।

মটরশুঁটি গাছের পরীক্ষামূলক যুক্তি

১৮৫৬ থেকে ১৮৬৩ সালের মধ্যে মেন্ডেল ২৮,০০০ এরও বেশি মটরশুঁটি গাছের (Pisum sativum) কৃত্রিম পরাগায়ন ঘটিয়েছিলেন এবং প্রতিটি গাছের বংশগত পরিবর্তন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে গণনা করেছিলেন। তাঁর এই সাফল্যের মূল রহস্য ছিল কিছু অভূতপূর্ব বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত:

  • সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট বৈসাদৃশ্যমূলক বৈশিষ্ট্য: উদ্ভিদের উচ্চতা বা পাতার আয়তনের মতো অস্পষ্ট ও অবিচ্ছিন্ন বৈশিষ্ট্যের পেছনে না ছুটে মেন্ডেল মটরশুঁটির সাতটি সুনির্দিষ্ট বিপরীতমুখী জোড়া নির্বাচন করেন: গোল বনাম কুঁচকানো বীজ, হলুদ বনাম সবুজ বীজপত্র, বেগুনি বনাম সাদা ফুল, স্ফীত বনাম খাঁজকাটা ফল, কাঁচা ফলের সবুজ বনাম হলুদ রঙ, অক্ষীয় বনাম প্রান্তিক ফুল এবং দীর্ঘ বনাম খর্বাকৃতি কাণ্ড।
  • বিশুদ্ধ বংশধারার অভিভাবক নির্বাচন: মূল সংকরায়ণ শুরুর পূর্বে মেন্ডেল দুই বছর ধরে নিশ্চিত হয়েছিলেন যে তাঁর পরীক্ষাধীন উদ্ভিদগুলো বহু প্রজন্ম ধরে বিশুদ্ধ বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে আসছে।
  • পরিমাণগত পরিসংখ্যান ও সম্ভাবনা তত্ত্ব: কেবল চোখ দিয়ে পর্যবেক্ষণ না করে মেন্ডেল পরবর্তী প্রজন্মগুলোর ($F_1$, $F_2$, $F_3$) হাজার হাজার বংশধরের প্রতিটি বীজ আলাদাভাবে গণনা করেন এবং সেগুলোকে সম্ভাবনা তত্ত্বের নিয়মে বিশ্লেষণ করেন।

বিশুদ্ধ গোল বীজযুক্ত গাছের সাথে খাঁটি কুঁচকানো বীজযুক্ত গাছের পরাগায়ন ঘটালে প্রথম অপত্য প্রজন্মে ($F_1$) কোনো আধা-কুঁচকানো মধ্যবর্তী বীজ পাওয়া গেল না। আশ্চর্যজনকভাবে প্রতিটি গাছে কেবল নিখুঁত গোল বীজ উৎপন্ন হলো; কুঁচকানো বৈশিষ্ট্যটি যেন সম্পূর্ণ উবে গেল। মেন্ডেল এই প্রকাশিত গোল বৈশিষ্ট্যকে বললেন প্রকট (Dominant) এবং সুপ্ত থাকা কুঁচকানো বৈশিষ্ট্যকে বললেন প্রচ্ছন্ন (Recessive)।

পৃথকীকরণ সূত্র (The Law of Segregation)

আসল বৈজ্ঞানিক চমক দেখা গেল যখন মেন্ডেল প্রথম প্রজন্মের ($F_1$) গাছগুলোকে নিজেদের মধ্যে স্ব-পরাগায়ন ঘটিয়ে দ্বিতীয় অপত্য প্রজন্ম ($F_2$) তৈরি করলেন। প্রচলিত তরল সংমিশ্রণ মতবাদ সত্যি হলে কুঁচকানো রূপটি চিরতরে নষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দ্বিতীয় প্রজন্মে কুঁচকানো বীজ আবার সম্পূর্ণ অক্ষত ও অবিকৃত অবস্থায় ফিরে এলো। মেন্ডেলের সংগৃহীত ৭,৩২৪টি বীজের মধ্যে ৫,৪৭৪টি ছিল গোল এবং ১,৮৫০টি ছিল কুঁচকানো—যার গাণিতিক অনুপাত ছিল নিখুঁত ২.৯৬ : ১, অর্থাৎ কার্যকরভাবে $৩:১$।

“সংকর জীবের মধ্যে প্রতিটি বিপরীতধর্মী বৈশিষ্ট্যের আচরণ অন্য বৈশিষ্ট্যের প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকে। একটি জোড়া বৈশিষ্ট্যের জন্য যে নিয়মের প্রকাশ ঘটে, তা অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রেও একইভাবে প্রযোজ্য।”
— গ্রেগর মেন্ডেল, উদ্ভিদ সংকরায়ণ পরীক্ষা (১৮৬৬)

এই নির্দিষ্ট অনুপাত ব্যাখ্যার জন্য মেন্ডেল জিনতত্ত্বের প্রথম সূত্র বা পৃথকীকরণ সূত্র প্রদান করেন। জীবের প্রতিটি বৈশিষ্ট্যের জন্য একজোড়া অবিভাজ্য ও কণিকাগত উপাদান (মেন্ডেলের ভাষায় এলিমেন্টে, যা আজকের অ্যালিল) দায়ী। জননকোষ (পরাগ ও ডিম্বক) সৃষ্টির সময় এই জোড়া উপাদানগুলো পরস্পর থেকে পৃথক হয়ে যায় এবং প্রতিটি জননকোষে কেবল একটি উপাদান প্রবেশ করে। প্রকট উপাদানকে $R$ এবং প্রচ্ছন্ন উপাদানকে $r$ ধরলে:

  • অভিভাবক প্রজন্ম: $RR times rr rightarrow$ প্রথম প্রজন্মের সকল উদ্ভিদ হেটেরোজাইগাস $Rr$ (ফলাফল: গোল বীজ)।
  • প্রথম প্রজন্মের স্ব-পরাগায়ন: $Rr times Rr rightarrow$ জননকোষের মিলনে উৎপন্ন হয় $RR + 2Rr + rr$।
  • জিনোটাইপ অনুপাত: $১,RR : ২,Rr : ১,rr$ (যা ফিনোটাইপে প্রকাশ করে $৩:১$ প্রকট বনাম প্রচ্ছন্ন রূপ)।

স্বাধীন সঞ্চারণ সূত্র ও নীরব মহাকাব্য

একই সাথে দুটি ভিন্ন বৈশিষ্ট্য নিয়ে কাজ করে (যেমন হলুদ-গোল বীজের সাথে সবুজ-কুঁচকানো বীজের সংকরায়ণ) মেন্ডেল আবিষ্কার করেন তাঁর দ্বিতীয় সূত্র: স্বাধীন সঞ্চারণ সূত্র (Law of Independent Assortment)। দ্বিতীয় প্রজন্মে বৈশিষ্ট্যগুলো $(৩:১) times (৩:১) = ৯:৩:৩:১$ অনুপাতে স্বাধীনভাবে বিন্যস্ত হলো। বীজের রঙ নির্ধারণকারী উপাদানটি বীজের আকৃতি নির্ধারণকারী উপাদানের ওপর কোনোভাবেই নির্ভরশীল ছিল না।

১৮৬৫ সালের বসন্তে মেন্ডেল যখন ব্রনো ন্যাচারাল হিস্ট্রি সোসাইটিতে তাঁর প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন, তখন উপস্থিত উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা ভদ্রভাবে করতালি দিলেও এর অন্তর্নিহিত বৈপ্লবিক অর্থ উপলব্ধি করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হন। তাঁরা বর্ণনামূলক উদ্ভিদবিদ্যায় অভ্যস্ত ছিলেন; ফলে মেন্ডেলের এই গাণিতিক ও পরিসংখ্যানিক সমীকরণ তাঁদের কাছে দুর্বোধ্য মনে হয়েছিল। ১৮৬৬ সালে প্রকাশিত হয়ে ইউরোপের প্রধান প্রধান লাইব্রেরিতে চলে গেলেও মেন্ডেলের কাজ টানা ৩৪ বছর লোকচক্ষুর অন্তরালে বিস্মৃত হয়ে রইল। ১৮৮৪ সালে ব্রাইট রোগে আক্রান্ত হয়ে মেন্ডেল যখন মৃত্যুবরণ করেন, তখন মঠের পরবর্তী প্রধান তাঁর গবেষণাপত্রগুলো পুড়িয়ে ফেলেন। কিন্তু মেন্ডেল তাঁর আবিষ্কারের সত্যতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ নিশ্চিত ছিলেন; সহকর্মী সন্ন্যাসীদের তিনি প্রায়ই বলতেন: “একদিন আমার সময় অবশ্যই আসবে।”