হিউম্যান জিনোম প্রজেক্ট শেষ হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে এক ধরণের ‘জিনগত নিয়তিবাদ’ চরম রূপ ধারণ করেছিল। সংবাদমাধ্যম প্রচার করতে লাগল যে মানুষের স্বাস্থ্য, রোগ, বুদ্ধিমত্তা এবং চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সবই নাকি ডিএনএ-র ATGC অক্ষরের ভেতর চিরতরে নির্ধারিত হয়ে আছে। কিন্তু জীববিজ্ঞানের একটি পরম বাস্তব সত্য এই সরল ধারণাকে নিমেষেই ধূলিসাৎ করে দিল। ধরা যাক দুটি জমজ ভাইবোন—যাদের জন্ম হয়েছে একই নিষিক্ত ডিম্বাণু থেকে এবং যাদের দেহের ডিএনএ ১০০% হুবহু এক। অথচ বয়স বাড়ার সাথে সাথে দেখা যায় একজন জমজ ডায়াবেটিস বা ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে, অথচ অপরজন সম্পূর্ণ সুস্থ জীবন যাপন করছে। আরও বড় বিস্ময় হলো আমাদের নিজের শরীর: আপনার চোখের রেটিনা কোষ, মস্তিষ্কের নিউরন কোষ এবং যকৃতের হেপাটোসাইট কোষ—সবার ভেতর হুবহু একই ৩১০ কোটি ক্ষারের ডিএনএ লাইব্রেরি রয়েছে; অথচ তাদের আকার, প্রোটিন এবং কাজের ধরণ সম্পূর্ণ আলাদা। এই পরম রহস্যের উত্তর জিনের হার্ডওয়্যারে লুকানো ছিল না; তা নিহিত ছিল এক গতিশীল সফটওয়্যারের ভেতর, যার নাম এপিজেনেটিক্স (Epigenetics)।
ওয়াডিংটনের এপিজেনেটিক ল্যান্ডস্কেপ
এপিজেনেটিক্সের আণবিক প্রমাণ পাওয়ার বহু পূর্বেই এক দূরদর্শী বিজ্ঞানী এর তাত্ত্বিক রূপরেখা এঁকেছিলেন। ১৯৪২ সালে ব্রিটিশ ভ্রূণতত্ত্ববিদ কনরাড হ্যাল ওয়াডিংটন (১৯০৫–১৯৭৫) ‘এপিজেনেসিস’ ও ‘জেনেটিক্স’ শব্দের মিলনে তৈরি করেন এপিজেনেটিক্স পরিভাষাটি—যার উদ্দেশ্য ছিল জিনোটাইপ কীভাবে জটিল শারীরিক ফিনোটাইপে রূপান্তরিত হয় তা ব্যাখ্যা করা।
ওয়াডিংটন তাঁর বিখ্যাত চিত্রের মাধ্যমে বিষয়টি ফুটিয়ে তুলেছিলেন: এপিজেনেটিক ল্যান্ডস্কেপ। একটি অনির্দিষ্ট স্টেম সেলকে কল্পনা করা হয়েছিল একটি মার্বেল হিসেবে, যা দাঁড়িয়ে আছে এক বন্ধুর পাহাড়ি ঢালের চূড়ায়। পাহাড়ের গা জুড়ে রয়েছে অসংখ্য শাখা-প্রশাখা বিশিষ্ট খাদ ও উপত্যকা। মাধ্যাকর্ষণের টানে মার্বেলটি যখন গড়িয়ে নিচে নামে, প্রতিটি মোড়ে সে একটি নির্দিষ্ট উপত্যকা বেছে নেয়। একটি খাদে পড়লে সে হয়ে যায় স্নায়ুকোষ; অপর খাদে পড়লে সে রূপ নেয় রক্তকণিকা বা পেশিকোষে। একবার একটি গভীর খাদে পড়ে গেলে মার্বেলটি আর নিজে নিজে ফিরে আসতে পারে না; অর্থাৎ কোষটি একটি স্থায়ী পরিচয়ে আবদ্ধ হয়ে যায়।
দীর্ঘদিন পর্যন্ত ওয়াডিংটনের এই পাহাড় ছিল কেবল একটি দার্শনিক উপমা। আজ আমরা জানি সেই উপত্যকাগুলোর আসল রূপ হলো কোষের ডিএনএ-তে ঘটে চলা সুনির্দিষ্ট রাসায়নিক পরিবর্তন: যাকে বলা হয় এপিজিনোম।
আণবিক সংকেত: ডিএনএ মিথাইলেশন ও হিস্টোন কোড
কোষের নিউক্লিয়াসের ভেতর ডিএনএ কখনো আলগা সুতোর মতো ঘুরে বেড়ায় না। প্রায় দুই মিটার দীর্ঘ ডিএনএ অতি ক্ষুদ্র নিউক্লিয়াসের ভেতর প্রবেশ করার জন্য হিস্টোন নামক প্রোটিনের গোলাকার কাঠামোর চারপাশে শক্ত করে পেঁচিয়ে থাকে, যাকে বলা হয় নিউক্লিওসোম। এপিজিনোম পরিচালিত হয় দুটি প্রধান রাসায়নিক প্রক্রিয়ায়:
১. ডিএনএ সাইটোসিন মিথাইলেশন
কোষের বিশেষ এনজাইম (DNMT) ডিএনএ-র সাইটোসিন ক্ষারের পাঁচ নম্বর কার্বনে একটি ক্ষুদ্র মিথাইল মূলক ($-CH_3$) যুক্ত করে তৈরি করে ৫-মিথাইলসাইটোসিন ($5text{mC}$)। উচ্চতর স্তন্যপায়ী প্রাণীর ক্ষেত্রে এই মিথাইলেশন ঘটে মূলত $CpG$ স্থানে (যেখানে সাইটোসিনের পাশে গুয়ানিন থাকে)। কোনো জিনের প্রমোটরে থাকা CpG দ্বীপে যখন মিথাইল মূলক বসে যায়, তখন সেখানে ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টরগুলো আর বসতে পারে না; ফলে জিনটি তাৎক্ষণিকভাবে ঘুমিয়ে পড়ে (Gene Silencing)। সবচেয়ে বড় কথা, কোষ বিভাজনের সময় এই মিথাইল সংকেতগুলো অবিকলভাবে অপত্য কোষে স্থানান্তরিত হয়—যার ফলে কোষের অর্জিত স্মৃতি পরবর্তী প্রজন্মেও টিকে থাকে।
২. হিস্টোন কোড হাইপোথিসিস
২০০০ সালে ডেভিড অ্যালিস ও টমাস জেনুওয়েন প্রস্তাব করেন হিস্টোন কোড তত্ত্ব। হিস্টোন প্রোটিনের লেজের মতো অংশে বিভিন্ন রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে যা ক্রোম্যাটিনের সংকোচন-প্রসারণ নিয়ন্ত্রণ করে:
- হিস্টোন অ্যাসিটাইলেশন: যখন হিস্টোনের লাইসিন অ্যামিনো অ্যাসিডে অ্যাসিটাইল মূলক ($-COCH_3$) যুক্ত হয়, তখন হিস্টোনের ধনাত্মক চার্জ নষ্ট হয়ে যায়। ফলে ঋণাত্মক চার্জযুক্ত ডিএনএ-র সাথে তার বাঁধন আলগা হয়ে পড়ে। ডিএনএ খুলে গিয়ে শিথিল বা উন্মুক্ত রূপ (ইউক্রোম্যাটিন) ধারণ করে, যার ফলে আরএনএ পলিমারেজ সহজেই জিন থেকে প্রোটিন তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে অ্যাসিটাইল গ্রুপ সরিয়ে নিলে ডিএনএ পুনরায় ঘন ও শক্ত হয়ে বন্ধ হয়ে যায় (হেটারোক্রোম্যাটিন)।
- হিস্টোন মিথাইলেশন: হিস্টোনের নির্দিষ্ট স্থানে মিথাইল যুক্ত হলে তা জিন চালু বা বন্ধ করার সংকেত হিসেবে কাজ করে। যেমন H3K4me3 সংকেত থাকলে জিন সক্রিয় থাকে, আর H3K27me3 সংকেত থাকলে জিনটি স্থায়ীভাবে অবরুদ্ধ হয়ে যায়।
পরিবেশের প্রভাব ও ভাগ্যের পরিবর্তন
ডিএনএ-র স্থায়ী অক্ষরের মতো এপিজেনেটিক সংকেতগুলো অনড় নয়; এরা পরিবেশ, খাদ্যভ্যাস, মানসিক চাপ এবং জীবনযাত্রার ওপর নির্ভর করে গতিশীলভাবে পরিবর্তিত হয়। ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত অ্যাগাউটি ইঁদুর পরীক্ষায় দেখা যায়—যেসব মা ইঁদুর জিনগতভাবে হলুদ রঙের ও অতিস্থূলকায় সন্তান জন্ম দিতে বাধ্য ছিল, গর্ভকালীন সময়ে তাদের ভিটামিন বি১২ এবং ফলিক অ্যাসিড সমৃদ্ধ মিথাইল খাবার খাওয়ানোর ফলে সেই একই ক্ষারানুক্রম থাকা সত্ত্বেও পরবর্তী প্রজন্মের ইঁদুরগুলো রোগমুক্ত, চিকন ও বাদামী রঙের হয়ে জন্ম নিল!
এপিজেনেটিক্সের সবচেয়ে চরম বিজয় অর্জিত হয় ২০০৬ সালে, যখন জাপানি বিজ্ঞানী শিনিয়া ইয়ামানাকা প্রমাণ করেন যে ওয়াডিংটনের পাহাড়ের গভীর খাদে নেমে যাওয়া মার্বেলটিকে আবার টেনে পাহাড়ে চূড়ায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব! একটি পরিণত ত্বকের কোষে মাত্র চারটি বিশেষ ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টর (ইয়ামানাকা ফ্যাক্টর) প্রবেশ করিয়ে তিনি তার সমস্ত এপিজেনেটিক বাধা মুছে ফেলে তাকে পুনরায় ভ্রূণীয় স্টেম সেলে রূপান্তর করলেন—যার নাম দেওয়া হলো ইনডিউসড প্লুরিপোটেন্ট স্টেম সেল (iPSC)। ডিএনএ কোনো অপরিবর্তনীয় ভাগ্যলিপি নয়; তা হলো এক বিশাল পিয়ানো—যার চাবিগুলো বাজিয়ে তোলে এপিজেনেটিক্সের জীবন্ত সুর।