১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে আণবিক জীববিজ্ঞানের কাছে ডিএনএ-র বর্ণমালার চারটি অক্ষর জানা ছিল, ট্রান্সক্রিপশনের নিয়ম স্পষ্ট ছিল এবং ৬৪টি কোডনের অর্থও উদ্ধার হয়েছিল। কিন্তু এই বিপুল জ্ঞান সত্ত্বেও বিজ্ঞানীরা ছিলেন কার্যত অন্ধ: প্রকৃতির একটি স্বাভাবিক দীর্ঘ ডিএনএ সুতোয় ক্ষারগুলো ঠিক কী ক্রমানুসারে সাজানো আছে, তা পড়ার কোনো প্রত্যক্ষ উপায় তাঁদের হাতে ছিল না। একটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জিনের ক্ষারানুক্রম উদ্ধার করতে মাসের পর মাস ব্যয় হতো জটিল ও পরোক্ষ সব পদ্ধতিতে। ডিএনএ ছিল অতি দীর্ঘ, রাসায়নিকভাবে একঘেয়ে এবং সাধারণ বিশ্লেষণে সম্পূর্ণ অচিন্ত্যনীয়। জীবনের এই রাসায়নিক লিপি পাঠ করতে প্রয়োজন ছিল এমন এক কৌশল—যা স্বয়ং ডিএনএ রেপ্লিকেশনের প্রাকৃতিক এনজাইমকেই পাঠোদ্ধারের অস্ত্রে পরিণত করবে। সেই অসাধ্য সাধন করেছিলেন কেমব্রিজের এমআরসি ল্যাবরেটরি অব মলিকিউলার বায়োলজির মহান বিজ্ঞানী ফ্রেডেরিক স্যাঙ্গার (১৯১৮–২০১৩)।
ডাইডেক্সি চেইন-টার্মিনেশন নীতি
স্যাঙ্গার বিজ্ঞানের জগতে তখন এক মহাতারকা: ১৯৫৮ সালে ইনসুলিনের ৫১টি অ্যামিনো অ্যাসিডের সঠিক ক্রম উদ্ধার করে তিনি রসায়নে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছিলেন, যা প্রমাণ করেছিল প্রোটিনের একটি সুনির্দিষ্ট রৈখিক অনুক্রম থাকে। সেই অসামান্য মেধা নিয়ে যখন তিনি ডিএনএ-র দিকে তাকালেন, ১৯৭৭ সালে তাঁর মাথায় এক অপূর্ব বুদ্ধি খেলে গেল।
স্বাভাবিক অবস্থায় ডিএনএ পলিমারেজ যখন নতুন ডিএনএ তৈরি করে, তখন সে ব্যবহার করে ডিঅক্সিনিউক্লিওটাইড ট্রাইফসফেট (dNTPs)। বর্ধমান ডিএনএ সুতোর ৩ নম্বর কার্বনে থাকা হাইড্রক্সিল ($-OH$) মূলকের সাথে নতুন আগত নিউক্লিওটাইডের ফসফেট যুক্ত হয়ে ফসফোডায়েস্টার বন্ধন তৈরি হয় এবং শিকলটি সামনে এগিয়ে চলে।
স্যাঙ্গার গবেষণাগারে কৃত্রিমভাবে তৈরি করলেন এক বিশেষ রাসায়নিক অণু: ২’,৩’-ডাইডেক্সিনিউক্লিওটাইড (ddNTP)। এই অণুটির ৩ নম্বর কার্বনে কোনো হাইড্রক্সিল ($-OH$) মূলক নেই, সেখানে রয়েছে কেবল একটি সাধারণ হাইড্রোজেন পরমাণু:
$$text{সাধারণ dNTP: } ৩’text{-OH উপস্থিত } Longrightarrow text{ডিএনএ শিকল বৃদ্ধি অব্যাহত থাকে}$$
$$text{বিশেষ ddNTP: } ৩’text{-H উপস্থিত } Longrightarrow text{শিকলের বৃদ্ধি তাৎক্ষণিকভাবে চিরতরে বন্ধ!}$$
পলিমারেজ এনজাইম যখনই ভুলে একটি ডাইডেক্সি অণুকে ডিএনএ-র ভেতর ঢুকিয়ে দেয়, অমনি পরবর্তী নিউক্লিওটাইড যুক্ত করার হাতটি অবরুদ্ধ হয়ে যায়। শিকলের বৃদ্ধি সেখানেই চিরতরে সমাপ্ত (Chain Termination) হতে বাধ্য হয়।
চার লেনের পলিঅ্যাক্রিলামাইড জেল
স্যাঙ্গার এক অনন্য সুন্দর পরীক্ষা সাজালেন। তিনি একটি টেস্ট ডিএনএ নিয়ে চারটি আলাদা টেস্টটিউবে ভাগ করলেন—$A, C, G,$ এবং $T$:
- প্রতিটি টিউবেই প্রচুর পরিমাণে সাধারণ চারটি dNTP এবং ডিএনএ পলিমারেজ দেওয়া হলো (যার মধ্যে একটি ছিল তেজস্ক্রিয় ফসফরাস-৩২ যুক্ত)।
- $A$ টিউবে দেওয়া হলো সামান্য পরিমাণ ddATP (প্রতি ১০০টি সাধারণ dATP-র বিপরীতে মাত্র ১টি ডাইডেক্সি)।
- $C$ টিউবে দেওয়া হলো সামান্য ddCTP।
- $G$ টিউবে দেওয়া হলো সামান্য ddGTP।
- $T$ টিউবে দেওয়া হলো সামান্য ddTTP।
পলিমারেজ যখন নতুন সুতো তৈরি করছিল, শতকরা ৯৯ বার সে সাধারণ ক্ষার যুক্ত করে এগিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু দৈবাৎ ১ বার সে একটি ডাইডেক্সি ক্ষার জুড়ে দিচ্ছিল—যার ফলে সেই নির্দিষ্ট স্থানেই সুতোটির বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। ফলাফল হলো: $A$ টিউবের ভেতর কোটি কোটি এমন টুকরো তৈরি হলো যার প্রতিটির শেষ মাথায় রয়েছে একটি এডেনিন ($A$)। ঠিক একইভাবে বাকি তিনটি টিউবে তৈরি হলো $C, G,$ এবং $T$-এ শেষ হওয়া সমস্ত সম্ভাব্য আকারের ডিএনএ টুকরো।
এরপর এই চার টিউবের দ্রবণকে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পলিঅ্যাক্রিলামাইড জেল ইলেকট্রোফোরেসিস (PAGE) প্লেটের পাশাপাশি চারটি লেনে দিয়ে বিদ্যুৎ চালনা করা হলো। ডিএনএ-র ফসফেটের ঋণাত্মক চার্জের কারণে টুকরোগুলো জেলের ভেতর দিয়ে ধনাত্মক মেরুর দিকে দৌড়াতে শুরু করল। ছোট টুকরোগুলো তীব্র গতিতে জেল ভেদ করে নিচে নেমে গেল, আর বড় টুকরোগুলো আটকে রইল উপরে।
সেই জেলের ওপর এক্স-রে ফিল্ম রাখতেই ভেসে উঠল এক অভূতপূর্ব কালো মইয়ের মতো সিঁড়ি। নিচ থেকে উপরের দিকে চোখ বুলিয়ে যে লেনে দাগ রয়েছে সেই অক্ষরটি লিখে নিলেই সরাসরি পড়ে ফেলা গেল কোটি কোটি বছর ধরে লুকিয়ে থাকা প্রকৃতির সেই পরম গোপন সংকেত!
ফাই-এক্স-১৭৪: বিশ্বের প্রথম সম্পূর্ণ জিনোম
১৯৭৭ সালে স্যাঙ্গার এই কৌশলের সাহায্যে $Phitext{X174}$ নামক একটি ব্যাকটেরিওফায ভাইরাসের সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স সম্পন্ন করলেন। মানব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মানুষ কোনো জীবন্ত সত্তার সম্পূর্ণ রাসায়নিক নীলনকশা হাতে পেল: ঠিক ৫,৩৮৬টি ক্ষারের এক নিখুঁত মহাকাব্য, যার মধ্যে লেখা ছিল ১১টি ভাইরাল প্রোটিনের সংকেত।
এই সিকোয়েন্স বিজ্ঞানীদের এক অবিশ্বাস্য চমক উপহার দিল: ওভারল্যাপিং জিন। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ভাইরাসের সীমিত ডিএনএ-তে সর্বোচ্চ তথ্য ধারণের জন্য প্রকৃতি একই ডিএনএ টুকরোকে ভিন্ন ভিন্ন রিডিং ফ্রেমে পড়ে একাধিক সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রোটিন তৈরি করছিল! ১৯৮০ সালে ফ্রেডেরিক স্যাঙ্গার তাঁর জীবনের দ্বিতীয় নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন—বিজ্ঞানের ইতিহাসে যা মাত্র পাঁচজন মনীষীর ভাগ্যে জুটেছে।
পরবর্তী তিন দশক ধরে স্যাঙ্গারের এই সিকোয়েন্সিং পদ্ধতিই ছিল জীববিজ্ঞানের স্বর্ণমানদণ্ড। মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ থেকে শুরু করে প্রথম ব্যাকটেরিয়ার জিনোম এবং পরিশেষে ২০০৩ সালে সমাপ্ত ৩১০ কোটি ক্ষারের হিউম্যান জিনোম প্রজেক্ট—মানবজাতির সমস্ত জিনোমিক অর্জনের পেছনে প্রজ্বলিত ছিল স্যাঙ্গারের সেই অমর চেইন-টার্মিনেশন আলোকবর্তিকা।