বিংশ শতাব্দীর শেষ দশকে মানবজাতি তার ইতিহাসের বৃহত্তম জীববৈজ্ঞানিক সহযোগিতার সূচনা করে: হিউম্যান জিনোম প্রজেক্ট (HGP)। ১৯৯০ সালের অক্টোবরে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়া এই প্রজেক্টের লক্ষ্য ছিল মহাকাশে অ্যাপোলো অভিযানের মতোই উচ্চাভিলাষী: মানুষের তেইশ জোড়া ক্রোমোজোমে লুকানো সম্পূর্ণ রাসায়নিক সংকেতের পাঠোদ্ধার করা—যার মোট দৈর্ঘ্য ৩১০ কোটি ক্ষারজোড় (৩.১ বিলিয়ন বেস পেয়ার)। এই সম্পূর্ণ ক্ষারানুক্রম যদি সাধারণ বই আকারে ছাপা হতো, তবে সেই বইয়ের স্তূপ আমেরিকার ওয়াশিংটন মনুমেন্টকেও ছাড়িয়ে যেত। জীববিজ্ঞানের ইতিহাসে এটি ছিল চাঁদে মানুষের পা রাখার মতোই এক কালজয়ী মুহূর্ত।
দুটি বিপরীতমুখী দর্শন: ব্যাক-টু-ব্যাক ক্লোনিং বনাম শটগান সিকোয়েন্সিং
আমেরিকান সরকারের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ (NIH) এবং ব্রিটিশ ওয়েলকাম ট্রাস্টের অর্থায়নে পরিচালিত আন্তর্জাতিক কনসোর্টিয়ামের নেতৃত্বে ছিলেন জিনবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস কলিন্স (জন্ম ১৯৫০)। সরকারি দলটি গ্রহণ করেছিল এক সতর্ক ও নিখুঁত পদ্ধতি:
- প্রথমে মানুষের দীর্ঘ ডিএনএ-কে ১,৫০,০০০ ক্ষারের বড় বড় টুকরোয় কেটে ব্যাকটেরিয়ার কৃত্রিম ক্রোমোজোমে (BAC) ক্লোন করা হতো।
- ক্রোমোজোমে এই টুকরোগুলোর নির্দিষ্ট অবস্থান আগে ম্যাপ করা হতো।
- এরপর প্রতিটি পরিচিত টুকরোকে আরও ছোট করে কেটে প্রচলিত স্যাঙ্গার পদ্ধতিতে জেল দিয়ে ধীরে ধীরে সিকোয়েন্স করা হতো।
কিন্তু আট বছর গবেষণার পরও ১৯৯৮ সাল নাগাদ জিনোমের মাত্র ১০% কাজ শেষ হয়েছিল। ঠিক সেই সময় দৃশ্যপটে আবির্ভূত হলেন এক ঝোড়ো চরিত্র: আমেরিকার ভিয়েতনাম যুদ্ধের সাবেক নৌবাহিনীর চিকিৎসাকর্মী ও প্রতিভাবান জৈব রসায়নবিদ জে. ক্রেইগ ভেন্টর (জন্ম ১৯৪৬)। তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন একটি বেসরকারি কোম্পানি সেলেরারা জিনোমিক্স (Celera Genomics)। পারকিন-এলমারের তৈরি আধুনিক ক্যাপিলারি সিকোয়েন্সার (যা তরল নলের ভেতর লেজার রশ্মি দিয়ে প্রতি মিনিটে শত শত ক্ষার পড়তে পারত) ব্যবহার করে ভেন্টর সরাসরি সরকারি প্রজেক্টকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন।
ভেন্টর প্রস্তাব করলেন এক সাহসী ও ঝুঁকিপূর্ণ কম্পিউটার-নির্ভর কৌশল: হোল-জিনোম শটগান সিকোয়েন্সিং। ভেন্টর বললেন, বছরের পর বছর ধরে ম্যাপ তৈরি করার কোনো দরকার নেই:
- মানুষের সম্পূর্ণ ৩১০ কোটি ক্ষারকে কোটি কোটি এলোমেলো ছোট ছোট টুকরোয় গুঁড়ো করে ফেলা হবে।
- ৩০০টি অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় রোবোটিক মেশিন দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা সেই টুকরোগুলোর দুই মাথা সিকোয়েন্স করবে।
- এরপর এক শক্তিশালী সুপারকম্পিউটার জটিল গ্রাফ অ্যালগরিদমের সাহায্যে টুকরোগুলোর ওভারল্যাপিং অংশ মিলিয়ে কোটি কোটি টুকরোকে এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশে পূর্ণাঙ্গ জিনোমে জোড়া লাগিয়ে দেবে!
সরকারি বিজ্ঞানীরা দাবি করলেন যে মানব ডিএনএ-তে থাকা পুনরাবৃত্তিমূলক সিকোয়েন্সের কারণে ভেন্টরের কম্পিউটার জট পাকিয়ে ফেলবে। কিন্তু ভেন্টরের রোবটগুলো অবিশ্বাস্য গতিতে কোটি কোটি ক্ষার পড়তে শুরু করল, যার ফলে সরকারি দলও তাদের কাজের গতি দশগুণ বাড়িয়ে দিতে বাধ্য হলো।
হোয়াইট হাউসের ঐতিহাসিক ঘোষণা (২৬ জুন ২০০০)
মানুষের জিনোমের ওপর যাতে কোনো বাণিজ্যিক কোম্পানির একচেটিয়া পেটেন্ট কায়েম না হয়, সেজন্য আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের মধ্যস্থতায় দুই দলের মধ্যে ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হলো। ২০০০ সালের ২৬ জুন হোয়াইট হাউসের ইস্ট রুমে দাঁড়িয়ে ফ্রান্সিস কলিন্স এবং ক্রেইগ ভেন্টর বিশ্ববাসীর সামনে যৌথভাবে মানব জিনোমের খসড়া মানচিত্র সমাপ্তির ঘোষণা দিলেন।
“আজ আমরা সেই ভাষা পাঠ করতে শিখছি—যে ভাষায় ঈশ্বর জীবন সৃষ্টি করেছিলেন। স্রষ্টার এই পরম পবিত্র উপহারের জটিলতা, সৌন্দর্য ও মহত্ত্ব দেখে আমাদের অন্তর গভীর বিস্ময়ে ভরে উঠছে।”
— প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, হোয়াইট হাউস ভাষণ (২৬ জুন ২০০০)
২০০১ সালের ফেব্রুয়ারিতে নেচার ও সায়েন্স পত্রিকায় মানব জিনোমের প্রথম বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয় এবং ২০০৩ সালের এপ্রিলে—ওয়াটসন ও ক্রিকের আবিষ্কারের ঠিক ৫০তম বার্ষিকীতে—মানব জিনোমের ৯৯.৯৯% নির্ভুল চূড়ান্ত রূপ উন্মোচিত হয়।
মানব জিনোমের অবিশ্বাস্য সত্যসমূহ
জিনোমের সম্পূর্ণ পাঠোদ্ধার জীববিজ্ঞানীদের পূর্ববর্তী সমস্ত ধারণাকে ওলটপালট করে দিয়েছিল:
- জিনের অভাবনীয় স্বল্পতা: প্রজেক্ট শুরুর আগে বিজ্ঞানীরা ভেবেছিলেন মানুষের উন্নত মস্তিষ্ক ও জটিল শারীরিক গঠনের জন্য অন্তত ১ লক্ষ থেকে দেড় লক্ষ জিনের প্রয়োজন হবে। কিন্তু সিকোয়েন্স দেখে বিজ্ঞানীরা হতবাক হয়ে গেলেন: মানুষের দেহে রয়েছে মাত্র ২০,০০০ থেকে ২১,০০০ কার্যকরী জিন—যা একটি সাধারণ মাইক্রোস্কোপিক কৃমির (১৯,০০০ জিন) প্রায় সমান এবং সাধারণ ধান গাছের (৩২,০০০ জিন) চেয়েও কম! মানুষের জটিলতা জিনের সংখ্যায় নয়, বরং আরএনএ স্প্লাইসিং ও জিনের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণে নিহিত।
- কোডিং অংশের ক্ষুদ্রতা: আমাদের মোট ৩১০ কোটি ক্ষারের মধ্যে মাত্র ১.৫% অংশ সরাসরি প্রোটিন তৈরির নির্দেশ বহন করে। বাকি ৯৮.৫% অংশই নন-কোডিং ডিএনএ—যার মধ্যে রয়েছে প্রাচীন ভাইরাসের অবশিষ্টাংশ, নিয়ন্ত্রক সুইচ ও ট্রান্সপোজন।
- সকল মানুষের মৌলিক সমতা: পৃথিবীর যে কোনো দুই প্রান্তের মানুষের জিনোম তুলনা করলে দেখা যায় তাদের ৯৯.৯% ডিএনএ হুবহু এক। মানুষের বর্ণ, মুখের গড়ন বা দৈহিক বৈচিত্র্যের সমস্ত পার্থক্য নিহিত রয়েছে মাত্র ০.১% এরও কম একক ক্ষারের পার্থক্যের (SNP) মধ্যে। বিজ্ঞান রাসায়নিকভাবে প্রমাণ করল: মানবজাতির মধ্যে কোনো জৈবিক জাতিভেদ নেই; আমরা সবাই একই অখণ্ড পরিবারের সন্তান।