১৯৪৪ সালে অসওয়াল্ড অ্যাভেরি ব্যাকটেরিয়ার রূপান্তরের মাধ্যমে ডিএনএ-র ভূমিকা প্রমাণ করা সত্ত্বেও বিশ্বখ্যাত রসায়নবিদদের মাঝে সংশয় থেকেই গিয়েছিল। অনেকে যুক্তি দিচ্ছিলেন যে নিউমোকক্কাসের রূপান্তর হয়তো ব্যাকটেরিয়ার একটি ব্যতিক্রমী আচরণ, অথবা অ্যাভেরির ডিএনএ নমুনায় লেগে থাকা অতি সূক্ষ্ম প্রোটিনই হয়তো আসল বংশগতির সংকেত বহন করছে। এই বিজ্ঞানীদের মন থেকে সংশয়ের শেষ ধূলিকণাটুকু মুছে ফেলার জন্য প্রয়োজন ছিল অতি সাধারণ এক জৈবিক মাধ্যম—যেখানে জটিল কোষীয় প্রক্রিয়ার কোনো বিভ্রান্তি থাকবে না, থাকবে কেবল প্রোটিন ও নিউক্লিক অ্যাসিডের চরম দ্বৈততা। সেই আদর্শ হাতিয়ারটি পাওয়া গেল ব্যাকটেরিয়ার ঘাতক এক অদ্ভুত ভাইরাসের মধ্যে: যার নাম ব্যাকটেরিওফায (Bacteriophage)।

ম্যাক্স ডেলব্রুক ও সালভাদর লুরিয়ার প্রতিষ্ঠিত বিখ্যাত “ফায গ্রুপ”-এর গবেষকরা ইশেরিকিয়া কোলাই (E. coli) ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণকারী T2 ব্যাকটেরিওফায নিয়ে কাজ করছিলেন। সদ্য আবিষ্কৃত ট্রান্সমিশন ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপের নিচে এই T2 ফাযকে দেখতে লাগত ঠিক চাঁদে নামা চন্দ্রযানের মতো: একটি ত্রিমাত্রিক প্রোটিন নির্মিত বহুতলক মাথা, যার ভেতরে ঘন হয়ে পেঁচিয়ে থাকে ডিএনএ, এবং নিচে একটি সংকোচনশীল লেজ ও কিছু সংবেদনশীল তন্তু। রাসায়নিকভাবে T2 ফায ছিল পরম বিশুদ্ধ: এর ঠিক ৫০% ছিল প্রোটিন এবং ৫০% ছিল ডিএনএ। যখন একটি ফায ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ করে, সে তার লেজ দিয়ে ব্যাকটেরিয়ার গায়ে বসে পড়ে এবং মাত্র বিশ মিনিট পর ব্যাকটেরিয়াটি বিদীর্ণ হয়ে সেখান থেকে শত শত নতুন ফায বের হয়ে আসে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ব্যাকটেরিয়াকে হুকুম দেওয়ার জন্য তার ভেতরে কে প্রবেশ করে: বাইরের প্রোটিনের আবরণ, নাকি ভেতরের ডিএনএ?

তেজস্ক্রিয় আইসোটোপের লড়াই: ৩২-ফসফরাস বনাম ৩৫-সালফার

১৯৫২ সালের গ্রীষ্মে নিউ ইয়র্কের কোল্ড স্প্রিং হারবার ল্যাবরেটরিতে জেনেটিসিস্ট অ্যালফ্রেড হার্শি (১৯০৮–১৯৯৭) এবং তাঁর চব্বিশ বছর বয়সী প্রতিভাবান সহকারী মার্থা চেজ (১৯২৭–২০০৩) এক অবিস্মরণীয় সুন্দর পরীক্ষা পরিচালনা করলেন। তাঁদের পরীক্ষার ভিত্তি ছিল প্রোটিন ও ডিএনএ-র রাসায়নিক মৌলের একটি মৌলিক পার্থক্য:

  • ফসফরাস ($^{32}text{P}$): ডিএনএ-র কাঠামো গঠিত হয় বিপুল পরিমাণ ফসফেট দিয়ে, অথচ প্রোটিনে কোনো ফসফরাস থাকে না।
  • সালফার ($^{35}text{S}$): মিথিওনিন ও সিস্টিন অ্যামিনো অ্যাসিডের কারণে প্রোটিনে প্রচুর সালফার থাকে, অথচ ডিএনএ-র অণুতে কোনো সালফার পরমাণু থাকে না।

হার্শি ও চেজ তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ দিয়ে দুই ধরণের T2 ফায প্রস্তুত করলেন:

  1. প্রথম ব্যাচকে বড় করা হলো তেজস্ক্রিয় ফসফরাস-৩২ ($^{32}text{P}$) সমৃদ্ধ কালচারে, যার ফলে ভাইরাসের ডিএনএ তেজস্ক্রিয় হয়ে উঠল কিন্তু প্রোটিন রইল স্বাভাবিক।
  2. দ্বিতীয় ব্যাচকে বড় করা হলো তেজস্ক্রিয় সালফার-৩৫ ($^{35}text{S}$) সমৃদ্ধ কালচারে, যার ফলে ভাইরাসের প্রোটিন কোট তেজস্ক্রিয় হয়ে উঠল কিন্তু ডিএনএ রইল স্বাভাবিক।

ওয়ারিং ব্লেন্ডার ও সেন্ট্রিফিউজ

এরপর তাঁরা সাধারণ ব্যাকটেরিয়ার ওপর এই দুই ধরণের তেজস্ক্রিয় ভাইরাসকে ছেড়ে দিলেন। ভাইরাস ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ করার সাথে সাথে একটি যান্ত্রিক সমস্যার সৃষ্টি হলো: ব্যাকটেরিয়ার শরীরের বাইরে লেগে থাকা ভাইরাসের খালি খোসাগুলোকে ব্যাকটেরিয়াকে না মেরে কীভাবে আলাদা করা যাবে?

এই সমস্যার সমাধানে তাঁরা ব্যবহার করলেন বিজ্ঞানের ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত গৃহস্থালি সামগ্রী: একটি সাধারণ ওয়ারিং রান্নাঘরের ব্লেন্ডার (Waring Kitchen Blender)। সংক্রামিত ব্যাকটেরিয়া মিশ্রণটিকে ব্লেন্ডারে দিয়ে তীব্র গতিতে মাত্র কয়েক মিনিট ঘোরাতেই ব্লেন্ডারের তরল ঘূর্ণি ব্যাকটেরিয়ার গা থেকে ভাইরাসের খালি খোলসগুলোকে ছিঁড়ে আলাদা করে দিল, অথচ ব্যাকটেরিয়া কোষের কোনো ক্ষতি হলো না।

এরপর সেই মিশ্রণটিকে সেন্ট্রিফিউজ মেশিনে দিয়ে দ্রুত ঘোরানো হলো। ভরের পার্থক্যের কারণে উপাদানগুলো সুন্দরভাবে আলাদা হয়ে গেল:

  • ভারী ব্যাকটেরিয়া কোষগুলো টেস্টটিউবের তলায় জমা হয়ে একটি কঠিন পিণ্ড বা পেলেট (Pellet) তৈরি করল।
  • ছিঁড়ে যাওয়া হালকা ভাইরাসের খোলসগুলো উপরের তরল অংশে বা সুপারন্যাট্যান্ট (Supernatant)-এ ভেসে রইল।

গাইগার কাউন্টারের রায়

যখন হার্শি ও চেজ গাইগার কাউন্টার দিয়ে দুই অংশের তেজস্ক্রিয়তা পরিমাপ করলেন, ফলাফল এলো দিনের আলোর মতো স্পষ্ট:

  • সালফার-৩৫ পরীক্ষায় (প্রোটিন লেবেলযুক্ত), প্রায় ৮০% তেজস্ক্রিয়তা পাওয়া গেল উপরের তরল অংশে। অর্থাৎ প্রোটিন খোলস কখনোই ব্যাকটেরিয়ার ভেতরে প্রবেশ করেনি; তা বাইরেই সিরিঞ্জের মতো পড়ে ছিল।
  • ফসফরাস-৩২ পরীক্ষায় (ডিএনএ লেবেলযুক্ত), ৭০% এরও বেশি তেজস্ক্রিয়তা পাওয়া গেল তলায় জমে থাকা ব্যাকটেরিয়ার পেলেটের ভেতরে। অর্থাৎ ভাইরাসের ডিএনএ ব্যাকটেরিয়ার দেয়াল ভেদ করে ভেতরে ঢুকে গেছে।

সবচেয়ে বড় কথা, তলার ব্যাকটেরিয়াগুলোকে যখন ফুটতে দেওয়া হলো, তখন দেখা গেল উৎপন্ন নতুন শিশু ভাইরাসগুলোর শরীরেও তেজস্ক্রিয় ফসফরাস বিদ্যমান—যা প্রমাণ করে পিতামাতার ডিএনএ সরাসরি পরবর্তী প্রজন্মে স্থানান্তরিত হয়েছে।

১৯৫২ সালের সেপ্টেম্বরে জার্নাল অব জেনারেল ফিজিওলজি-তে প্রকাশিত এই “ব্লেন্ডার পরীক্ষা” প্রোটিন তত্ত্বের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিল। বিশ্বের তাবৎ জীববিজ্ঞানী অবশেষে মেনে নিলেন: ডিএনএ-ই হলো জীবনের সার্বজনীন বংশগতির ধারক। সাথে সাথে বিজ্ঞানের সমস্ত দৃষ্টি ঘুরে গেল এক পরম প্রশ্নের দিকে: এই ডিএনএ অণুর ভেতরের গঠন কেমন, যা চারশো কোটি বছর ধরে জীবনের নীলনকশাকে সযত্নে লিখে রেখেছে?