চারশো কোটি বছর ধরে পৃথিবীর জীবজগতে এক অলঙ্ঘনীয় প্রাচীর বিদ্যমান ছিল: প্রতিটি প্রজাতি কেবল তার নিজস্ব প্রজাতির ভেতর জিন আদান-প্রদান করত। ব্যাকটেরিয়ার জিন যেত অন্য ব্যাকটেরিয়ায়, উদ্ভিদের পরাগ পরাগায়ন করত নিজ উদ্ভিদে, স্তন্যপায়ী প্রাণী বংশবৃদ্ধি করত তার স্বগোত্রে। ভিন্ন ট্যাক্সোনমিক রাজ্যের মধ্যবর্তী আণবিক প্রাচীর ছিল দুর্ভেদ্য। কিন্তু ১৯৭০-এর দশকের প্রারম্ভে বিজ্ঞানীরা জীবনের বইয়ের নিছক নিষ্ক্রিয় পাঠক থেকে সক্রিয় লেখকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন। আণবিক কাঁচি, জৈব আঠা এবং ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জেনেটিক যানের ওপর প্রভুত্ব কায়েম করে মানুষ এমন এক অভাবনীয় ক্ষমতা অর্জন করল—যার মাধ্যমে এক প্রজাতির জিন কেটে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রজাতির ডিএনএ-র সাথে জোড়া লাগানো সম্ভব হয়ে উঠল। সূচনা হলো রিকম্বিন্যান্ট ডিএনএ প্রযুক্তি ও আধুনিক জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এর এক নতুন যুগ।

আণবিক হাতিয়ার: রেস্ট্রিকশন এনজাইম, লাইগেজ ও প্লাজমিড

জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল তিনটি অসাধারণ জৈব হাতিয়ারের ওপর:

  1. রেস্ট্রিকশন এন্ডোনিউক্লিয়েজ (আণবিক কাঁচি): ১৯৭০ সালে হ্যামিল্টন স্মিথ ও ওয়ার্নার আরবার আবিষ্কার করেন যে ব্যাকটেরিয়ার শরীরে এমন কিছু প্রতিরক্ষাকারী এনজাইম থাকে যা আক্রমণকারী ভাইরাসের ডিএনএ-কে সুনির্দিষ্ট স্থানে কেটে টুকরো করে দেয়। সান ফ্রান্সিসকোতে বায়োকেমিস্ট হার্বার্ট বয়ার (জন্ম ১৯৩৬) ই. কোলাই থেকে আলাদা করলেন এক জাদুকরী কাঁচি: EcoRI। এই এনজাইমটি ডিএনএ-কে সোজাসুজি ভোঁতাভাবে কাটত না; বরং সে ছয়টি নির্দিষ্ট ক্ষারের অনুক্রম ($5’text{-GAATTC-}3’$) চিনে নিয়ে দুই সুতোকে সামান্য তেরছাভাবে কেটে দিত, যার ফলে দুই প্রান্তে তৈরি হতো চার অক্ষরের একক ঝুলন্ত সুতো ($5’text{-AATT-}3’$)। বয়ার এদের নাম দিলেন স্টিকি এন্ড (Sticky Ends বা আঠালো প্রান্ত)। মহাবিশ্বের যে কোনো জীবের ডিএনএ-কে যদি EcoRI দিয়ে কাটা যায়, তবে তার প্রান্তগুলো একে অপরের সাথে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জোড়া লেগে যাবে!
  2. ডিএনএ লাইগেজ (আণবিক আঠা): ১৯৬৭ সালে আবিষ্কৃত এই এনজাইমটি ডিএনএ-র ফসফোডায়েস্টার বন্ধন পুনরায় তৈরি করে আলাদা থাকা দুটি ডিএনএ টুকরোকে এক অবিচ্ছেদ্য অণুতে জোড়া লাগিয়ে দিতে পারে।
  3. ব্যাকটেরিয়াল প্লাজমিড (আণবিক যান): স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিসিস্ট স্ট্যানলি কোহেন (জন্ম ১৯৩৫) ব্যাকটেরিয়ার প্রধান ক্রোমোজোমের বাইরে থাকা ক্ষুদ্র বৃত্তাকার ডিএনএ নিয়ে গবেষণা করছিলেন, যার নাম প্লাজমিড। কোহেন pSC101 নামক এমন এক প্লাজমিড তৈরি করেছিলেন যা টেট্রাসাইক্লিন অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ করতে পারত এবং কোষে নিজে নিজেই দ্বিগুণ হতে সক্ষম ছিল। শুধু তাই নয়, ক্যালসিয়াম ক্লোরাইড ও তাপ দিয়ে ব্যাকটেরিয়ার কোষপ্রাচীরকে সাময়িকভাবে শিথিল করে বাইরে থেকে প্লাজমিড ঢুকিয়ে দেওয়ার পদ্ধতিও তিনি আবিষ্কার করেছিলেন।

হনোলুলুর স্যান্ডউইচ ও মধ্যরাতের বিপ্লব (১৯৭২)

১৯৭২ সালের নভেম্বরে হাওয়াই দ্বীপের হনোলুলুতে এক বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে বয়ার ও কোহেনের দেখা হয়। এক গভীর রাতে একটি সাধারণ ডেলির দোকানে বসে প্যাস্ট্রামি ও স্যান্ডউইচ খেতে খেতে তাঁরা উপলব্ধি করলেন যে তাঁদের দুজনের হাতে থাকা আবিষ্কারগুলো আসলে একটি আরেকটির পরিপূরক:

  • বয়ারের কাছে আছে আণবিক কাঁচি (EcoRI), যা দিয়ে যেকোনো ডিএনএ কেটে আঠালো প্রান্ত তৈরি করা যায়।
  • কোহেনের কাছে আছে সেই ডিএনএ বহন করার প্লাজমিড যান এবং তা ব্যাকটেরিয়ার ভেতরে প্রবেশ করানোর কৌশল।

ক্যালিফোর্নিয়ায় ফিরে ১৯৭৩ সালের বসন্তে তাঁরা পৃথিবীর প্রথম কৃত্রিম রিকম্বিন্যান্ট জীব সৃষ্টি করলেন। তাঁরা pSC101 প্লাজমিডকে EcoRI দিয়ে কেটে তার ভেতর ভিন্ন ব্যাকটেরিয়ার অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জিন লাইগেজ দিয়ে জুড়ে দিলেন এবং তা সাধারণ ই. কোলাই-এর ভেতর ঢুকিয়ে দিলেন। বিষাক্ত অ্যান্টিবায়োটিকযুক্ত পেট্রিডিশে সেই নতুন সংকর ব্যাকটেরিয়া বীরদর্পে বেঁচে রইল! এর কিছুদিন পরেই তাঁরা আফ্রিকান ব্যাঙের (Xenopus laevis) জিন কেটে ব্যাকটেরিয়ার ভেতর সফলভাবে প্রকাশ করে দেখালেন। চারশো কোটি বছরের বিবর্তনীয় প্রজাতির প্রাচীর এক রাতের মধ্যে ধূলিসাৎ হয়ে গেল।

অ্যাসিলোমার সম্মেলন ও বায়োটেকনোলজির জন্ম

মানবজাতির হাতে এমন এক ক্ষমতা এসেছে যা দিয়ে কৃত্রিম দানব ভাইরাস বা নতুন জীবাণু তৈরি করা সম্ভব—এই অনুভূতি বিজ্ঞানীদের মনে গভীর শঙ্কা জাগিয়ে তুলল। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী পল বার্গ (১৯২৬–২০২৩), যিনি ১৯৭২ সালে প্রথম বানরের টিউমার সৃষ্টিকারী SV40 ভাইরাসকে ব্যাকটেরিওফাযের সাথে জুড়েছিলেন, তিনি স্বেচ্ছায় নিজের কাজ বন্ধ করে দিলেন এই ভয়ে যে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী ভাইরাস হয়তো ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে মানুষের অন্ত্রে মহামারী ডেকে আনবে।

১৯৭৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাসিলোমারে বিশ্বের ১৪০ জন শীর্ষ বিজ্ঞানী ও আইনজীবীদের নিয়ে অনুষ্ঠিত হলো ঐতিহাসিক অ্যাসিলোমার সম্মেলন। সেখানে চার দিনের তীব্র বিতর্কের পর বিজ্ঞানীরা স্বেচ্ছায় গবেষণার ওপর কঠোর আন্তর্জাতিক জৈব-নিরাপত্তা নীতিমালা (BSL-1 থেকে BSL-4) প্রণয়ন করলেন এবং ঘোষণা করলেন এমন সব বিকলাঙ্গ ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করতে হবে যা পেট্রিডিশের বাইরে উন্মুক্ত প্রকৃতিতে এক মুহূর্তও বাঁচতে পারে না।

নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পর জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং পরিণত হলো বৈশ্বিক শিল্পবিপ্লবে। ১৯৭৬ সালে হার্বার্ট বয়ার ও তরুণ বিনিয়োগকারী রবার্ট সোয়ানসন প্রতিষ্ঠা করলেন পৃথিবীর প্রথম বায়োটেক কোম্পানি জেনেটেক (Genentech)। ১৯৭৮ সালে জেনেটেকের বিজ্ঞানীরা ব্যাকটেরিয়ার পেটের ভেতর মানুষের ইনসুলিন জিন ঢুকিয়ে সফলভাবে তৈরি করলেন রিকম্বিন্যান্ট মানব ইনসুলিন (Humulin)। গরু বা শূকরের অগ্ন্যাশয় কেটে তৈরি করা নিম্নমানের ইনসুলিনের ওপর ডায়াবেটিস রোগীদের আর নির্ভর করতে হলো না। ১৯৮০ সালে পল বার্গ রসায়নে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন। জীবন আর প্রকৃতির অন্ধ খেলার অধীন রইল না; তা রূপান্তরিত হলো প্রোগ্রামযোগ্য এক মহাবিশ্বে।