মেন্ডেলের গবেষণাপত্র প্রকাশের দীর্ঘ চৌত্রিশ বছর পর, ১৯০০ সালের বসন্তে ইউরোপের তিনজন উদ্ভিদবিজ্ঞানী—নেদারল্যান্ডসের হুগো দ্য ভ্রিস, জার্মানির কার্ল কোরেন্স এবং অস্ট্রিয়ার এরিখ ফন শেরমাক—স্বতন্ত্রভাবে মেন্ডেলের সূত্রগুলো পুনর্নিশ্চিত করেন। একই সাথে কোষতত্ত্ববিদরা উন্নত অয়েল-ইমার্শন মাইক্রোস্কোপ ও অ্যানিলিন রঞ্জকের সাহায্যে কোষের নিউক্লিয়াসের ভেতরে এক বিস্ময়কর দৃশ্য প্রত্যক্ষ করছিলেন: কোষ বিভাজনের সময় গাঢ় সুতার মতো কিছু কাঠামো ঘনীভূত হয়, দ্বিগুণ হয় এবং অপত্য কোষগুলোতে সুষমভাবে পৃথক হয়ে যায়। ১৯০২ সালে ওয়াল্টার সাটন ও থিওডোর বোভেরি প্রস্তাব করেন সাটন-বোভেরি ক্রোমোজোম তত্ত্ব: মিয়োসিস বিভাজনের সময় সমসংস্থ ক্রোমোজোমের পৃথকীকরণ হুবহু মেন্ডেলের বংশগত উপাদানের পৃথকীকরণের সমান্তরাল। কিন্তু অনুমান আর প্রত্যক্ষ প্রমাণ এক নয়। জিনের ভৌত অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য প্রয়োজন ছিল সুনির্দিষ্ট পরীক্ষামূলক ভিত্তি।
সেই অকাট্য প্রমাণ রচিত হয়েছিল কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শেরমারহর্ন হলের ৬১১ নম্বর কক্ষে—১৬ বাই ২৩ ফুটের এক ঘিঞ্জি ও তীব্র গন্ধযুক্ত গবেষণাগার, যা বিজ্ঞান ইতিহাসে পরিচিত দ্য ফ্লাই রুম (The Fly Room) নামে। ভ্রূণতত্ত্ববিদ টমাস হান্ট মরগান (১৮৬৬–১৯৪৫) এবং তাঁর তিন প্রতিভাধর আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ছাত্র—আলফ্রেড স্টার্টিভ্যান্ট, কেলভিন ব্রিজেস এবং হারম্যান জোসেফ মুলার—এই ছোট্ট ঘরটিতে বসেই আধুনিক ক্রোমোজোমীয় বংশগতিবিদ্যার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।
সাদা চোখের মাছি ও সেক্স লিংকেজ
মরগান তাঁর গবেষণার জন্য বেছে নিয়েছিলেন সাধারণ ফলমাছি ড্রোসোফিলা মেলানোগ্যাস্টার (Drosophila melanogaster)। জেনেটিক গবেষণার জন্য ড্রোসোফিলা ছিল এক নিখুঁত সৃষ্টি: কলার পুরানো কাঁচের বোতলে এদের খুব সহজে পালন করা যেত, পচা কলাই ছিল এদের প্রিয় খাদ্য, প্রতিটি মিলনে শত শত ডিম ফুটত এবং মাত্র ১০ থেকে ১২ দিনের মধ্যে এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মে পৌঁছানো যেত। সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল, ড্রোসোফিলার কোষে মাত্র চার জোড়া ক্রোমোজোম বিদ্যমান।
টানা এক বছরেরও বেশি সময় ধরে মরগান অনুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে হাজার হাজার লাল চোখের বুনো মাছি পরীক্ষা করেন, কোনো নতুন মিউটেশন বা জিনের পরিবর্তনের আশায়। অবশেষে ১৯১০ সালের মে মাসে লাল চোখের হাজারো মাছির মাঝে তিনি একটিমাত্র পুরুষ মাছি খুঁজে পেলেন যার চোখ ছিল সম্পূর্ণ দুধের মতো সাদা। পরম যত্নে তিনি সেই সাদা চোখের পুরুষ মাছিটিকে আলাদা করে সাধারণ লাল চোখের স্ত্রী মাছির সাথে প্রজনন ঘটালেন।
প্রথম দৃষ্টিতে ফলাফল মেন্ডেলের সূত্রের মতোই দেখাচ্ছিল:
- প্রথম অপত্য প্রজন্ম ($F_1$): সকল পুরুষ ও স্ত্রী মাছির চোখ ছিল লাল, যা প্রমাণ করে লাল চোখের বৈশিষ্ট্যটি সাদা চোখের ওপর প্রকট।
- দ্বিতীয় অপত্য প্রজন্ম ($F_2$): প্রথম প্রজন্মের ভাই-বোনের মিলনে স্বাভাবিক ৩:১ ফিনোটাইপ অনুপাত (৩টি লাল চোখের মাছি বনাম ১টি সাদা চোখের মাছি) পাওয়া গেল।
কিন্তু যখন মরগান লিঙ্গের ভিত্তিতে মাছিগুলোকে আলাদা করলেন, তখন এক চমকপ্রদ সত্য উদঘাটিত হলো: প্রতিটি সাদা চোখের মাছিই ছিল পুরুষ! হাজার হাজার স্ত্রী মাছির মাঝে একটিও সাদা চোখের ছিল না; স্ত্রী মাছিগুলোর শতভাগই ছিল লাল চোখের, আর পুরুষ মাছিদের অর্ধেক ছিল লাল চোখের এবং অর্ধেক ছিল সাদা চোখের।
মরগান উপলব্ধি করলেন, এই ঘটনাটি কেবল তখনই সম্ভব যদি চোখের রঙ নির্ধারণকারী জিনটি কোষের X সেক্স ক্রোমোজোমে অবস্থান করে। স্ত্রী মাছির দুটি X ক্রোমোজোম ($XX$) থাকে, আর পুরুষ মাছির থাকে একটি X এবং একটি জিনগতভাবে নিষ্ক্রিয় Y ক্রোমোজোম ($XY$)। একটি স্ত্রী মাছির সাদা চোখ হতে হলে তার দুটি X ক্রোমোজোমেই প্রচ্ছন্ন মিউট্যান্ট অ্যালিল ($X^w X^w$) থাকতে হবে। কিন্তু পুরুষ মাছির যেহেতু একটিমাত্র X ক্রোমোজোম থাকে, তাই একটিমাত্র মিউট্যান্ট অ্যালিল পেলেই ($X^w Y$) তার চোখ সাদা হতে বাধ্য। মানব ইতিহাসের এই প্রথমবার একটি নির্দিষ্ট মেন্ডেলীয় জিনকে কোষের দৃশ্যমান ক্রোমোজোমের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত করা সম্ভব হলো।
ক্রসিং ওভার ও জেনেটিক ম্যাপিংয়ের সূচনা
ফ্লাই রুমের গবেষকরা যখন আরও ডজন ডজন মিউট্যান্ট জিন (যেমন ছোট ডানা, হলুদ শরীর, রক্তবর্ণ চোখ) আবিষ্কার করলেন, তখন দেখা গেল একই ক্রোমোজোমে অবস্থিত জিনগুলো মেন্ডেলের দ্বিতীয় সূত্রের মতো স্বাধীনভাবে চলাচল করে না। বরং তারা দলবদ্ধভাবে বংশপরম্পরায় সঞ্চারিত হতে চায়—এই ধর্মকে নাম দেওয়া হলো জেনেটিক লিংকেজ (Genetic Linkage)।
তবে এই লিংকেজ সবসময় সম্পূর্ণ ছিল না। একই X ক্রোমোজোমে থাকা দুটি বৈশিষ্ট্য নিয়ে কাজ করার সময় দেখা গেল কিছু সংখ্যক অপত্যে পিতামাতার বৈশিষ্ট্যের নতুন সংমিশ্রণ (Recombination) ঘটেছে। মরগান ব্যাখ্যা করলেন, মায়োসিস বিভাজনের সময় হোমোলোগাস ক্রোমোজোম দুটি যখন কাছাকাছি আসে, তখন তাদের সুতোগুলো পরস্পরকে পেঁচিয়ে ধরে, ভেঙে যায় এবং নিজেদের অংশের বিনিময় ঘটায়—কোষবিদ্যায় যাকে বলা হয় কায়াজমা এবং বংশগতিতে বলা হয় ক্রসিং ওভার (Crossing Over)।
১৯১১ সালের এক সন্ধ্যায় মরগানের আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ছাত্র আলফ্রেড স্টার্টিভ্যান্ট (১৮৯১–১৯৭০) এক অপূর্ব গাণিতিক সিদ্ধান্তে পৌঁছালেন। স্টার্টিভ্যান্ট বুঝলেন, ক্রোমোজোমের সুতোয় জিনগুলো যদি রৈখিকভাবে পুঁতির দানার মতো সাজানো থাকে, তবে দুটি জিনের মধ্যকার ক্রসিং ওভার ঘটার সম্ভাবনা নির্ভর করবে তাদের মধ্যবর্তী ভৌত দূরত্বের ওপর: দুটি জিন যত দূরে অবস্থিত হবে, তাদের মাঝে সুতো ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা তত বেশি।
“আমি বাড়িতে গেলাম এবং রাতের অধিকাংশ সময় ব্যয় করলাম (আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার হোমওয়ার্ক বাদ দিয়ে) বিশ্বের প্রথম ক্রোমোজোম ম্যাপ তৈরির কাজে।”
— আলফ্রেড স্টার্টিভ্যান্ট, এ হিস্ট্রি অব জেনেটিক্স (১৯৬৫)
ড্রোসোফিলার ছয়টি সেক্স-লিংকড জিনের রিকম্বিনেশন হার বিশ্লেষণ করে স্টার্টিভ্যান্ট তৈরি করলেন পৃথিবীর প্রথম জেনেটিক লিংকেজ ম্যাপ। তিনি ১% রিকম্বিনেশন ফ্রিকোয়েন্সিকে নাম দিলেন ১ একক দূরত্ব (যা পরবর্তীতে মরগানের সম্মানে সেন্টিমরগান বা cM নামে ভূষিত হয়)। জিন আর কোনো বায়বীয় ধারণা রইল না: এটি ক্রোমোজোমের বুকে সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক ঠিকানাবিশিষ্ট একটি বাস্তব উপাদানে রূপান্তরিত হলো।