১৯৬০ সালের মধ্যে জীববিজ্ঞানের তাত্ত্বিক ভিত প্রস্তুত ছিল: ফ্রান্সিস ক্রিকের সেন্ট্রাল ডগমা জানিয়ে দিয়েছিল নিউক্লিয়াসের ডিএনএ থেকে নির্দেশ নিয়ে মেসেঞ্জার আরএনএ সাইটোপ্লাজমে আসে, আর রাইবোসোমে বসে টিআরএনএ সেই নির্দেশ অনুযায়ী প্রোটিন তৈরি করে। কিন্তু সেই রহস্যময় সংকেতের ভাষাটি আসলে কেমন? ডিএনএ-র মাত্র চারটি রাসায়নিক ক্ষার ($A, U, G, C$) দিয়ে বিশটি ভিন্ন ভিন্ন অ্যামিনো অ্যাসিডের নাম লিখতে হবে। যদি একটি ক্ষার একটি অ্যামিনো অ্যাসিডের সংকেত হতো, তবে মাত্র $৪^১ = ৪$টি অ্যামিনো অ্যাসিড প্রকাশ পেত। যদি দুটি ক্ষার মিলে একটি শব্দ হতো, তবে $৪^২ = ১৬$টি শব্দ পাওয়া যেত—যা বিশের চেয়ে কম। অতএব, গণিতের নিয়মে সর্বনিম্ন শব্দ হতে হবে তিন অক্ষরের: অর্থাৎ একটি ট্রিপ্লেট কোডন, যার মোট বিন্যাস সংখ্যা $৪^৩ = ৬৪$টি। কিন্তু এই চৌষট্টিটি শব্দের কোনটি কোন অ্যামিনো অ্যাসিডকে নির্দেশ করে? জীবনের সেই রোসেটা স্টোন তখনো অনাবিষ্কৃত ছিল।
এনআইএইচ গবেষণাগারে পলি-ইউ পরীক্ষা
এই ঐতিহাসিক সাফল্য কোনো হার্ভার্ড বা কেমব্রিজের বিশ্বখ্যাত ল্যাব থেকে আসেনি; বরং তা এসেছিল মেরিল্যান্ডের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ (NIH)-এর এক নিভৃতচারী ৩৪ বছর বয়সী গবেষক মার্শাল নিরেনবার্গ (১৯২৭–২০১০) এবং তাঁর তরুণ জার্মান সহযোগী হাইনরিখ ম্যাথাই (জন্ম ১৯২৯)-এর হাত ধরে।
নিরেনবার্গ ও ম্যাথাই ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়ার কোষ ভেঙে একটি কোষমুক্ত (Cell-free) ব্যবস্থা তৈরি করলেন, যার ভেতর সক্রিয় রাইবোসোম, টিআরএনএ এবং এনজাইম উপস্থিত ছিল কিন্তু ডিএনএ ধ্বংস করে দেওয়ায় তার নিজস্ব কোনো আরএনএ ছিল না। তাঁরা বিশটি টেস্টটিউব নিলেন। প্রতিটি টিউবে ১৯টি সাধারণ অ্যামিনো অ্যাসিড দেওয়া হলো, আর মাত্র একটি নির্দিষ্ট অ্যামিনো অ্যাসিডকে তেজস্ক্রিয় কার্বন-১৪ ($^{14}text{C}$) দ্বারা চিহ্নিত করা হলো।
১৯৬১ সালের ২৭ মে ভোররাত ৩টায় ম্যাথাই বিশটি টেস্টটিউবেই কৃত্রিমভাবে তৈরি পলিইউরিডিলিক অ্যাসিড (পলি-ইউ) যোগ করলেন—যা কেবল পুনরাবৃত্ত ইউরাসিল ক্ষার ($text{…UUUUUUUUU…}$) দিয়ে গঠিত। বিশটি টেস্টটিউবের মধ্যে উনিশটিতে কোনো বিক্রিয়া হলো না। কিন্তু পনেরো নম্বর টেস্টটিউব—যার মধ্যে ছিল তেজস্ক্রিয় $^{14}text{C}$-ফেনাইলঅ্যালানিন—সেখানে হঠাৎ তেজস্ক্রিয়তার এক অভূতপূর্ব বিস্ফোরণ ঘটল এবং টেস্টটিউবের তলায় জমা হলো অদ্রবণীয় প্রোটিনের স্তূপ!
পলি-ইউ আরএনএ কোষের মেশিনারিকে নির্দেশ দিয়ে তৈরি করেছে সম্পূর্ণ ফেনাইলঅ্যালানিনের শিকল (Polyphenylalanine)। মানব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জীবনের অভিধানের প্রথম শব্দের অর্থ উদ্ধার হলো:
$$text{UUU} Longrightarrow text{ফেনাইলঅ্যালানিন (Phe)}$$
মস্কো সম্মেলন ও সংকেতের পূর্ণাঙ্গ পাঠোদ্ধার
১৯৬১ সালের আগস্টে নিরেনবার্গ মস্কোয় পঞ্চম আন্তর্জাতিক বায়োকেমিস্ট্রি কংগ্রেসে যোগ দিতে যান। অখ্যাত বিজ্ঞানী হওয়ায় তাঁকে একটি ছোট ঘরে বক্তৃতার সময় দেওয়া হয়েছিল যেখানে মাত্র ত্রিশজন শ্রোতা উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু ফ্রান্সিস ক্রিক এই গবেষণার কথা শুনে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব তাৎক্ষণিকভাবে অনুধাবন করলেন। ক্রিক ব্যক্তিগত উদ্যোগে পরের দিন সকালে কংগ্রেসের প্রধান মিলনায়তনে এক হাজার বিশ্বসেরা বিজ্ঞানীর সামনে নিরেনবার্গকে পুনরায় তাঁর বক্তৃতা দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। সেই বক্তৃতা শেষ হতেই সভাকক্ষ করতালিতে ফেটে পড়ল।
শুরু হলো বাকি কোডনগুলোর পাঠোদ্ধারের মহাযজ্ঞ। এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় অবদান রাখলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত জৈব রসায়নবিদ হর গোবিন্দ খোরানা (১৯২২–২০১১)। উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ে খোরানা কৃত্রিমভাবে নিখুঁত রাসায়নিক ও এনজাইমেটিক পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট অনুক্রমের আরএনএ তৈরি করলেন (যেমন $text{…UGUGUG…}$)। এই সুনির্দিষ্ট টেমপ্লেট ব্যবহার করে খোরানা দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করলেন যে $text{UGU}$ সংকেত সিস্টিনকে এবং $text{GUG}$ সংকেত ভ্যালিনকে নির্দেশ করে।
সার্বজনীন জেনেটিক অভিধানের রূপরেখা
১৯৬৬ সালের মধ্যে পৃথিবীর সমস্ত জীবের সার্বজনীন ৬৪টি কোডনের অর্থ সম্পূর্ণ উন্মোচিত হলো:
- ৬১টি অর্থপূর্ণ কোডন (Sense Codons): যা ২০টি অ্যামিনো অ্যাসিডকে নির্দেশ করে।
- সূচনাকারী কোডন ($text{AUG}$): যা মিথিওনিন নির্দেশ করে এবং প্রোটিন তৈরির কাজ শুরু করার বিশ্বজনীন সংকেত হিসেবে কাজ করে।
- ৩টি সমাপ্তি কোডন ($text{UAA}, text{UAG}, text{UGA}$): ওকার, অ্যাম্বার ও ওপাল—যা প্রোটিন তৈরির শিকল সমাপ্ত করার সংকেত প্রদান করে।
- ডিজেনারেসি বা বাহুল্য: যেহেতু কোডন ৬৪টি কিন্তু অ্যামিনো অ্যাসিড মাত্র ২০টি, তাই একটি অ্যামিনো অ্যাসিডকে একাধিক কোডন নির্দেশ করে। ১৯৬৬ সালে ফ্রান্সিস ক্রিক তাঁর উওবল হাইপোথিসিস (Wobble Hypothesis)-এর মাধ্যমে দেখান যে কোডনের তৃতীয় ক্ষারের নমনীয়তার কারণে একটি টিআরএনএ একাধিক সমার্থক কোডনকে চিনতে পারে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর সত্য হলো, এই জেনেটিক কোড পৃথিবীর সকল জীবের জন্য সার্বজনীন। ব্যাকটেরিয়া থেকে শুরু করে বটগাছ কিংবা মানুষের কোষে—প্রতিটি জীবের ডিএনএ ঠিক একই ভাষায় কথা বলে। মানুষের ইনসুলিনের আরএনএ একটি সাধারণ ব্যাকটেরিয়ার ভেতর ঢুকিয়ে দিলে ব্যাকটেরিয়া সেই কোড পড়ে হুবহু মানুষের ইনসুলিন তৈরি করে দেয়। চারশো কোটি বছর পূর্বে লূকা (LUCA) থেকে শুরু করে আজকের প্রতিটি জীবকোষ যে একই শিকড়ের সন্তান—জেনেটিক কোডের এই সার্বজনীনতাই হলো তার সবচেয়ে অলঙ্ঘনীয় বৈজ্ঞানিক প্রমাণ।