বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বংশগতিবিদদের কাছে একটি ধারণা নিউটনের মহাকর্ষ সূত্রের মতোই পরম সত্য বলে গৃহীত ছিল: জীবের জিনোম হলো এক অনড়, অপরিবর্তনীয় ও স্থায়ী শিলালিপি। মনে করা হতো ক্রোমোজোম হলো একটি শক্ত ধাতব তার, আর জিনগুলো সেই তারের গায়ে চিরতরে গেঁথে থাকা পাথরের পুঁতি। মিউটেশন ঘটতে পারে, কিন্তু পুঁতিগুলোর ভৌগোলিক অবস্থান কখনোই বদলে যেতে পারে না। ক্রোমোজোম ছিল গ্রানাইট পাথরের মতো অটল। এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করার অর্থ ছিল তৎকালীন জীববিজ্ঞানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করা। কিন্তু লং আইল্যান্ডের কোল্ড স্প্রিং হারবার ল্যাবরেটরির ভুট্টা ক্ষেতে বসে এক নিভৃতচারী বিজ্ঞানী বারবারা ম্যাকক্লিন্টক (১৯০২–১৯৯২) তাঁর মনোocular অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে চোখ রেখে দেখতে পেলেন এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য: জিন কোনো অচল পাথর নয়; তারা জীবন্ত, চঞ্চল এবং নিজেদের বন্ধন ছিন্ন করে ক্রোমোজোমের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে লাফিয়ে বেড়াতে সক্ষম!
ভুট্টার সাইটোজেনেটিক্স ও রঙিন মোজাইক
১৯৩০-এর দশকেই ম্যাকক্লিন্টক উদ্ভিদকোষবিদ্যায় কিংবদন্তি হয়ে উঠেছিলেন। ভুট্টা গাছের (Zea mays) ওপর গবেষণা করে তিনি এমন কিছু বিশেষ রঞ্জক কৌশল উদ্ভাবন করেন যা দিয়ে মায়োসিস বিভাজনের সময় ক্রোমোজোমের সূক্ষ্ম রূপ খালি চোখে দেখা যেত। ১৯৩১ সালে তিনি প্রথম দেখান যে মেন্ডেলের ক্রসিং ওভার কেবল তাত্ত্বিক বিষয় নয়, এর ফলে ক্রোমোজোমের বাস্তবিক টুকরো শারীরিকভাবে নিজেদের জায়গা বদল করে।
১৯৪০-এর দশকের মাঝামাঝি ম্যাকক্লিন্টকের দৃষ্টি আটকে গেল ভুট্টার দানার এক বিচিত্র রঙের ওপর। সাধারণ ভুট্টার দানা সম্পূর্ণ হলুদ, সাদা কিংবা গাঢ় বেগুনি রঙের হয়। কিন্তু কিছু অদ্ভুত ভুট্টার মোচায় দেখা গেল দানার গায়ে যেন রঙের এক বুনো আলপনা আঁকা—হলুদ জমিনের ওপর বেগুনি রঙের ছিটছিট ফোঁটা, রেখা ও ডোরাকাটা নকশা। এই রঙিন ফোঁটার আকার ছিল বিচিত্র—কোনোটি ক্ষুদ্র বিন্দুর মতো, আবার কোনোটি দানার অর্ধাংশ জুড়ে বিস্তৃত। প্রচলিত মেন্ডেলীয় বংশগতি দিয়ে হাজার হাজার কোষে ঘটে চলা এই অবিশ্বাস্য অস্থিরতাকে ব্যাখ্যা করা অসম্ভব ছিল।
Ac-Ds সিস্টেম: ভাঙন ও লাফিয়ে চলা জিন
মাইক্রোস্কোপের নিচে ক্রোমোজোমের ভাঙন পর্যবেক্ষণ করে এবং সতর্ক বংশগতির হিসাব মিলিয়ে ম্যাকক্লিন্টক ভুট্টা ক্রোমোজোম ৯-এর খাটো বাহুতে একটি নির্দিষ্ট স্থান চিহ্নিত করলেন, যেখানে ক্রোমোজোমটি বারবার ভেঙে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছিল। তিনি এই ভাঙন স্থানের নাম দিলেন ডিসোসিয়েশন ($Ds$)।
কিন্তু ম্যাকক্লিন্টক লক্ষ্য করলেন, $Ds$ একা নিজে নিজে ভাঙতে পারে না। তার জন্য প্রয়োজন হয় আরেকটি স্বাধীন জিনের, যার নাম তিনি দিলেন অ্যাক্টিভেটর ($Ac$)। ক্রোমোজোমে $Ac$ না থাকলে $Ds$ সম্পূর্ণ শান্ত ও নিষ্ক্রিয় থাকে। কিন্তু প্রজননের মাধ্যমে একবার $Ac$ প্রবেশ করলেই শুরু হয় আসল আণবিক নাটক:
- $Ds$ কেবল ক্রোমোজোমকে ভেঙে ফেলে না; আরও অবিশ্বাস্যভাবে সে তার নিজের জায়গা ছেড়ে স্থানান্তরিত হতে শুরু করে—মূল জায়গা থেকে উধাও হয়ে গিয়ে সে সোজা গিয়ে বসে পড়ে রঙের জন্য দায়ী বেগুনি জিন $C$-এর পেটের ভেতর!
- যখন $Ds$ গিয়ে $C$ জিনের ভেতর ঢুকে পড়ে, তখন বেগুনি রঙের প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায়, ফলে দানাটি হয়ে যায় বর্ণহীন বা হলুদ।
- কিন্তু কোষের বৃদ্ধির পরবর্তী ধাপে $Ac$-এর উপস্থিতিতে $Ds$ হঠাৎ করে আবার $C$ জিন থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে অন্য কোথাও লাফিয়ে চলে যায়! সাথে সাথে $C$ জিনটি মুক্তি পেয়ে আবার বেগুনি রঙ তৈরি করা শুরু করে, যার ফলে হলুদ জমিনের ওপর জন্ম নেয় গাঢ় বেগুনি রঙের ফোঁটা!
দানাটির বৃদ্ধির যত প্রাথমিক পর্যায়ে এই জিনটি লাফিয়ে বের হয়ে আসে, বেগুনি ফোঁটাটির আয়তন তত বড় হয়। ম্যাকক্লিন্টক আবিষ্কার করলেন জীবজগতের প্রথম ট্রান্সপোজাবল এলিমেন্ট বা ট্রান্সপোজন—যাকে সাধারণ ভাষায় নাম দেওয়া হলো “জাম্পিং জিন” (Jumping Genes)।
“আমি যখন প্রথম দেখলাম তারা স্থান পরিবর্তন করেছে, আমি স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম। তারা কেবল স্থান পরিবর্তনই করে না, যে স্থানে গিয়ে বসে সেখানকার পার্শ্ববর্তী জিনগুলোর নিয়ন্ত্রণও নিজেদের হাতে তুলে নেয়। তাই আমি এদের নাম দিয়েছিলাম নিয়ন্ত্রক উপাদান।”
— বারবারা ম্যাকক্লিন্টক (১৯৮৩)
তিন দশকের নিঃসঙ্গ বনবাস ও চূড়ান্ত স্বীকৃতি
১৯৫১ সালে কোল্ড স্প্রিং হারবার সিম্পোজিয়ামে ম্যাকক্লিন্টক যখন তাঁর এই যুগান্তকারী আবিষ্কার উপস্থাপন করলেন, তখন উপস্থিত বিজ্ঞানীরা গভীর নীরবতা ও তাচ্ছিল্যের সাথে তা প্রত্যাখ্যান করলেন। বিজ্ঞানীরা ভুট্টাকে ভাবলেন এক অপ্রাসঙ্গিক ব্যতিক্রম এবং ব্যাকটিরিয়ার সরল আণবিক জগতের সাথে এই তত্ত্বকে মেলানো গেল না। ম্যাকক্লিন্টক কারও সাথে বিতর্কে গেলেন না। তিনি বলেছিলেন: “আপনি যদি জানেন আপনি সত্যের পথে আছেন, যদি আপনার অন্তরে সেই প্রত্যয় থাকে, তবে পৃথিবীর কেউ আপনাকে টলাতে পারবে না।” তিনি সাধারণ জার্নালে লেখা বন্ধ করে দিলেন এবং কেবল বার্ষিক গবেষণা প্রতিবেদনে নীরবে কাজ নথিভুক্ত করতে লাগলেন।
অবশেষে ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে যখন ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ট্রান্সপোজন আবিষ্কৃত হলো, তখন আধুনিক বিজ্ঞান ম্যাকক্লিন্টকের মহত্ত্ব উপলব্ধি করতে শুরু করল। ১৯৮০-এর দশকে আণবিক ক্লোনিং প্রমাণ করল ম্যাকক্লিন্টকের $Ac$ উপাদানটি আসলে একটি বিশেষ এনজাইম—ট্রান্সপোজেস—তৈরি করে, যা ডিএনএ কেটে নতুন জায়গায় জোড়া লাগায়।
হিউম্যান জিনোম প্রজেক্ট শেষ হওয়ার পর বিজ্ঞানীরা স্তম্ভিত হয়ে দেখলেন যে মানব জিনোমের প্রায় অর্ধেক ডিএনএ-ই গঠিত হয়েছে এই ট্রান্সপোজন এবং তাদের অবশিষ্টাংশ দিয়ে! ট্রান্সপোজন কোনো ত্রুটি নয়; এটি বিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি। ১৯৮৩ সালে একা একা কাজ করা ৮১ বছর বয়সী এই মহীয়সী বিজ্ঞানী চিকিৎসাবিজ্ঞানে একক নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন—বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক নিঃসঙ্গ সত্যসাধকের চরম বিজয়।