পৃথিবীতে জীবনের চারশো কোটি বছরের ইতিহাসে প্রতিটি জীবের জন্ম হয়েছিল এক অবিচ্ছিন্ন জীববৈজ্ঞানিক শৃঙ্খলের মাধ্যমে: একটি পূর্ববর্তী কোষ বিভাজিত হয়ে নতুন কোষের জন্ম দেয় এবং কোটি কোটি বছরের প্রাকৃতিক বিবর্তনে অর্জিত জিনোম বংশপরম্পরায় অপত্য কোষে স্থানান্তরিত হয়। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিজ্ঞানীদের এই প্রাচীন কাপড়ের ভেতর কয়েকটি সুতো বদলানোর ক্ষমতা দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু কাপড়টি ছিল প্রকৃতির আদি সৃষ্টি। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে বিজ্ঞানীরা এক অবিশ্বাস্য ও চরম লক্ষ্য নির্ধারণ করলেন: মানুষ কি গবেষণাগারের চারটি সাধারণ রাসায়নিক বোতল থেকে সম্পূর্ণ একটি নতুন জীব সৃষ্টি করতে পারে—যার সমস্ত ডিএনএ লেখা হবে কম্পিউটারের মনিটরে এবং তা কৃত্রিমভাবে তৈরি করে প্রাণহীন কোষে ঢুকিয়ে দিলে শুরু হবে স্বাধীন জীবনের স্পন্দন? সেই ঐতিহাসিক সীমানা অতিক্রম করেছিলেন জে. ক্রেইগ ভেন্টর, নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী হ্যামিল্টন স্মিথ এবং অণুজীববিদ ক্লাইড হাচিসন।

JCVI-syn1.0: প্রথম সিন্থেটিক জীবের জন্ম (২০১০)

ভেন্টর তাঁর পরীক্ষার জন্য বেছে নিয়েছিলেন মাইকোপ্লাজমা মাইকয়ডিস নামক এক ক্ষুদ্র পরজীবী ব্যাকটেরিয়াকে, যার গোলাকার জিনোমে ছিল মাত্র ১০ লক্ষ ৮০ হাজার ক্ষারজোড়। কিন্তু কোনো সিন্থেটিক মেশিন একবারে কয়েক হাজার অক্ষরের বেশি ডিএনএ নির্ভুলভাবে তৈরি করতে পারত না।

এই অসম্ভবকে সম্ভব করতে তাঁরা উদ্ভাবন করলেন এক অভূতপূর্ব ধাপভিত্তিক পদ্ধতি:

  1. রাসায়নিক টুকরো তৈরি: তাঁরা গবেষণাগারে ১,০৮০ ক্ষারের ১,০৭৮টি টুকরো তৈরি করলেন। কৃত্রিম প্রমাণ রাখতে তাঁরা নন-কোডিং অংশে বিখ্যাত বিজ্ঞানী রিচার্ড ফাইনম্যানের উক্তি ও ওয়েবসাইটের ঠিকানা কোডিং আকারে লিখে দিলেন (Watermark)।
  2. ইস্ট কোষের ভেতর জোড়া লাগানো: সাধারণ বেকার্স ইস্ট (Saccharomyces cerevisiae) কোষের ডিএনএ জোড়া লাগানোর অবিশ্বাস্য ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে তাঁরা ধাপে ধাপে টুকরোগুলোকে ১০ হাজার, ১ লক্ষ এবং পরিশেষে একটি সম্পূর্ণ ১০,৭৭,৯৪৭ ক্ষারের অখণ্ড কৃত্রিম ক্রোমোজোমে পরিণত করলেন।
  3. জিনোম প্রতিস্থাপন: এরপর সেই সম্পূর্ণ কৃত্রিম ক্রোমোজোমটিকে আলতো করে বের করে মাইকোপ্লাজমা ক্যাপ্রিকোলাম নামক ভিন্ন একটি ব্যাকটেরিয়ার কোষের ভেতর ঢুকিয়ে দেওয়া হলো, যার নিজস্ব ডিএনএ আগে থেকেই সরিয়ে ফেলা হয়েছিল।

২০১০ সালের মে মাসে সেই কৃত্রিম ক্রোমোজোমটি “বুট আপ” করল! কৃত্রিম ডিএনএ নিজের আরএনএ ও প্রোটিন তৈরি করা শুরু করল এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যে গ্রহীতা কোষের সমস্ত পুরানো উপাদান ধ্বংস করে কৃত্রিম প্রোটিন দিয়ে কোষটি পূর্ণ হয়ে গেল। কোষটি স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠল, বিভাজিত হলো এবং নিজের মতো বংশবৃদ্ধি শুরু করল। ভেন্টর এর নাম দিলেন JCVI-syn1.0:

“এটি পৃথিবীর প্রথম আত্ম-অনুলিপনশীল জীব—যার জন্মদাতা একটি কম্পিউটার। এটি সম্পূর্ণ কৃত্রিম রাসায়নিক ডিএনএ থেকে তৈরি পৃথিবীর প্রথম জীবন্ত কোষ।”
— জে. ক্রেইগ ভেন্টর (২০ মে ২০১০)

JCVI-syn3.0: জীবনের ন্যূনতম জিনোমের সন্ধান (২০১৬)

কৃত্রিম জীব তৈরি সম্ভব প্রমাণের পর ভেন্টরের দল আরও গভীর মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি হলেন: স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার জন্য একটি কোষের ঠিক কতটুকু ন্যূনতম জিন বা অপারেটিং সিস্টেম প্রয়োজন?

প্রথম সিন্থেটিক ব্যাকটেরিয়ার ৯০১টি জিন নিয়ে তাঁরা শুরু করলেন এক নির্মম ছাঁটাই অভিযান:

  • তাঁরা প্রতিটি জিনকে চিহ্নিত করলেন: অপরিহার্য জিন (যা বাদ দিলে কোষ তাৎক্ষণিকভাবে মারা যায়) এবং অপ্রয়োজনীয় জিন (যা বাদ দিলেও কোষ বেঁচে থাকতে পারে)।
  • আটটি কৃত্রিম টুকরোয় ভাগ করে তাঁরা শত শত অপ্রয়োজনীয় বিপাকীয় বিলাসিতা ও বিবর্তনের বাড়তি জিন ছেঁটে বাদ দিতে লাগলেন।

২০১৬ সালের মার্চ মাসে বিজ্ঞান বিশ্ব প্রত্যক্ষ করল JCVI-syn3.0-এর আত্মপ্রকাশ। এর সম্পূর্ণ জিনোম নেমে এলো মাত্র ৫,৩১,৫৬০ ক্ষারজোড়ে এবং এতে অবশিষ্ট রইল মাত্র ৪৭৩টি জিন—মহাবিশ্বের জানা সকল স্বাধীন জীবের মধ্যে এটিই হলো ক্ষুদ্রতম ও ন্যূনতম জীবন্ত জিনোম!

অজানা ৪৭৩ জিনের পরম বিনম্রতা

এই ৪৭৩টি জিনের কাজের তালিকা পরীক্ষা করে জীবনের চরম পদার্থবিজ্ঞান উন্মোচিত হলো:

  • তথ্য প্রক্রিয়াকরণ (৪১%): সেন্ট্রাল ডগমা পরিচালনা—ডিএনএ রেপ্লিকেশন, ট্রান্সক্রিপশন এবং বিশেষ করে ট্রান্সলেশন বা প্রোটিন তৈরির যন্ত্রপাতি (টিআরএনএ ও রাইবোসোম)। কেবল প্রোটিন তৈরির কাজেই ব্যয় হয় জিনোমের এক-তৃতীয়াংশ!
  • কোষঝিল্লি ও পরিবহন (১৮%): বাইরে থেকে পুষ্টি গ্রহণ ও কোষীয় অখণ্ডতা রক্ষা।
  • বিপাকীয় শক্তি (১৭%): পুষ্টি ভেঙে শক্তি ও নিউক্লিওটাইড তৈরি।
  • জিনোম সংরক্ষণ (৭%): ক্রোমোজোম দ্বিগুণ করা ও কোষ বিভাজন।

কিন্তু বিজ্ঞানের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা ছিল অন্য জায়গায়: এই ৪৭৩টি অপরিহার্য জিনের মধ্যে ১৪৯টি জিন (জিনোমের প্রায় ৩২%) আসলে কী কাজ করে—আধুনিক বিজ্ঞান তা আজ পর্যন্ত জানে না! এই জিনগুলো এতটাই জরুরি যে এদের একটিকে বাদ দিলে কোষ এক সেকেন্ডের ভেতর মারা যায়; অথচ এদের জৈব রাসায়নিক কার্যপদ্ধতি বিজ্ঞানীদের কাছে সম্পূর্ণ অজ্ঞেয়। সিন্থেটিক বায়োলজি জীবনের একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ইঞ্জিন তৈরি করতে পেরেছে ঠিকই, কিন্তু একই সাথে প্রমাণ করেছে যে জীবনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মূল কলকব্জা এখনো মানব জ্ঞানের অতীত এক পরম রহস্য হয়ে রয়েছে।