আণবিক জীববিজ্ঞানের প্রথম তিন দশক জুড়ে জিনবিজ্ঞানীরা এক তীব্র ও নির্মম সীমাবদ্ধতায় বন্দি ছিলেন: খড়ের গাদায় সুই খোঁজার সমস্যা। মানুষের সম্পূর্ণ জিনোমে ছিল ৩১০ কোটি ক্ষারজোড়। আর একটি নির্দিষ্ট কার্যকরী জিন ছিল মাত্র কয়েক হাজার ক্ষারের সমষ্টি—যা মোট ডিএনএ-র দশ লক্ষ ভাগের এক ভাগ মাত্র। সেই একটিমাত্র জিনকে বিশ্লেষণ বা ক্লোনিং করতে প্রয়োজন হতো বোতল বোতল মানুষের রক্ত বা কেজি কেজি মাংসপেশি, এবং তারপর মাসের পর মাস ব্যাকটেরিয়ার ভেতর সেই ডিএনএ কালচার করার প্রাণান্তকর পরিশ্রম। যদি কোনো অপরাধের স্থানে পড়ে থাকত একটিমাত্র চুলের গোড়া, রক্তের একটি শুকনো কণা কিংবা এক ফোঁটা বীর্য—তবে জেনেটিক্স ছিল সম্পূর্ণ অসহায়; কারণ স্পেকট্রোফটোমিটারে ধরা পড়ার মতো পর্যাপ্ত ডিএনএ সেখানে উপস্থিত থাকত না। জীববিজ্ঞানের চরম প্রয়োজন ছিল এমন এক জাদুকরী জেরক্স মেশিনের—যা একটিমাত্র অণু খুঁজে নিয়ে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তার কোটি কোটি নিখুঁত কপি বানিয়ে দেবে। সেই অলৌকিক ধারণাটি এক রাতে জন্ম নিয়েছিল ক্যালিফোর্নিয়ার এক নির্জন পাহাড়ি হাইওয়েতে।

হাইওয়ে ১২৮-এর রাতের অলৌকিক দর্শন

১৯৮৩ সালের মে মাসের এক শুক্রবারের রাত। সিটাস কর্পোরেশনের বাতিকগ্রস্ত ৩৮ বছর বয়সী জৈব রসায়নবিদ কেরি মুলিস (১৯৪৪–২০১৯) তাঁর রূপালী রঙের হোন্ডা সিভিক গাড়ি চালিয়ে প্যাসিফিক কোস্টের পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে মেন্ডোসিনোর দিকে যাচ্ছিলেন। গাড়ির হেডলাইটের আলো যখন রেডউড অরণ্যের গাছের ওপর পড়ছিল, তখন মুলিসের মাথায় ঘুরছিল ডিএনএ সিকোয়েন্সিংয়ের একটি জটিল সমস্যা।

হঠাৎ তাঁর চিন্তার জগতে এক গাণিতিক বিস্ফোরণ ঘটল। তিনি ভাবলেন: যদি একটি নির্দিষ্ট জিনের দুই প্রান্তে দুটি বিপরীতমুখী প্রাইমার বসিয়ে দেওয়া যায়—একটি সেন্স সুতোয় আর অপরটি অ্যান্টিসেন্স সুতোয়, যাদের উভয়ের মুখ থাকবে পরস্পরের দিকে—এবং পলিমারেজ দিয়ে তাদের বৃদ্ধি করা হয়, তবে প্রথম চক্রে উৎপন্ন নতুন ডিএনএ টুকরোগুলো দ্বিতীয় চক্রে স্বয়ং নতুন টেমপ্লেট হিসেবে কাজ করতে শুরু করবে!

“ঈশ্বর! প্রতিটি চক্রে ডিএনএ দ্বিগুণ হতে থাকবে: দুই, চার, আট, ষোল, বত্রিশ, চৌষট্টি, একশ আঠাশ… মাত্র ত্রিশটি চক্রের পর সংখ্যাটি একশো কোটি ছাড়িয়ে যাবে! আমি গাড়ি থামিয়ে হাইওয়ের পাশে দাঁড়িয়ে একটি খামের পেছনে পাগলের মতো সমীকরণ লিখতে লাগলাম। হোন্ডা গাড়ির ধোঁয়া আর রেডউড বনের সুবাসের মাঝে দাঁড়িয়ে আমি বুঝতে পারলাম—আমি এমন কিছু আবিষ্কার করেছি যা এই পৃথিবীকে চিরতরে বদলে দেবে।”
— কেরি মুলিস, ড্যান্সিং নেকেড ইন দ্য মাইন্ড ফিল্ড (১৯৯৮)

মাত্র ৩০টি চক্রে উৎপন্ন হবে $২^{৩০} = ১,০৭,৩৭,৪১,৮২৪$টি কপি! অর্থাৎ অদৃশ্য জিপ্টোমোলের ($১০^{-২১}text{ moles}$) একটিমাত্র ডিএনএ অণু কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পরিণত হবে মাইক্রোগ্রাম পরিমাণের ঘন ডিএনএ-র পিণ্ডে, যা অতিবেগুনী রশ্মির নিচে জ্বলজ্বলে নিয়ন-কমলা রঙের ব্যান্ড হিসেবে খালি চোখেই দেখা যাবে।

পিসিআর চক্রের তিনটি তাপীয় ধাপ

পলিমারেজ চেইন রিঅ্যাকশন (PCR)-এর মূল সৌন্দর্য ছিল এর অ্যালগরিদমিক সরলতায়। প্রতিটি চক্র পরিচালিত হয় তিনটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে:

  1. ডিনেচুরেশন বা পৃথকীকরণ ($৯৪^circtext{C} – ৯৬^circtext{C}$): প্রচণ্ড তাপে ডিএনএ-র হাইড্রোজেন বন্ধনগুলো ছিঁড়ে যায় এবং ডাবল হেলিক্সটি খুলে গিয়ে দুটি আলাদা একক সুতোয় পরিণত হয়।
  2. অ্যানিলিং বা প্রাইমার সংযোজন ($৫০^circtext{C} – ৬৫^circtext{C}$): তাপমাত্রা দ্রুত কমিয়ে আনা হয়। লক্ষ লক্ষ সিন্থেটিক প্রাইমার ক্ষণিকের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত জিনের দুই প্রান্তের পরিপূরক ক্ষারের সাথে শক্তভাবে জোড়া লেগে যায়।
  3. এক্সটেনশন বা দীর্ঘকরণ ($৭২^circtext{C}$): ডিএনএ পলিমারেজ প্রাইমারের মাথায় বসে দ্রুত $৫’ rightarrow ৩’$ মুখে ক্ষারগুলো জুড়ে দিয়ে কাঙ্ক্ষিত জিনটির হুবহু অনুলিপি তৈরি করে ফেলে।

ইয়েলোস্টোনের উষ্ণ প্রস্রবণ ও ট্যাক পলিমারেজ

মুলিসের প্রাথমিক পরীক্ষায় পিসিআর চালানো ছিল এক দুঃসহ শারীরিক নির্যাতন। তখন ব্যবহৃত হতো সাধারণ ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়ার পলিমারেজ এনজাইম। কিন্তু সাধারণ এনজাইম ৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার উপরেই স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যায়; ফলে প্রতিটি চক্রের ৯৫ ডিগ্রির উত্তাপে এনজাইমটি ধ্বংস হয়ে যেত। গবেষককে ঘন্টার পর ঘণ্টা গরম পানির পাত্রের সামনে দাঁড়িয়ে প্রতি তিন মিনিট পর পর টেস্টটিউব হাত দিয়ে স্থানান্তর করতে হতো এবং প্রতি চক্রে নতুন করে মূল্যবান এনজাইম ঢালতে হতো।

চূড়ান্ত বৈপ্লবিক পরিবর্তনটি এলো ১৯৮৬ সালে। সিটাস কর্পোরেশনের বিজ্ঞানীরা আমেরিকার ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্কের ফুটন্ত গরম পানির প্রস্রবণ থেকে আবিষ্কৃত এক চরমভাবাপন্ন ব্যাকটেরিয়া—থারমাস অ্যাকুয়াটিকাস—থেকে একটি বিশেষ ডিএনএ পলিমারেজ আলাদা করলেন। ফুটন্ত পানিতে বেঁচে থাকতে অভ্যস্ত এই ট্যাক পলিমারেজ (Taq Polymerase) ৯৫ ডিগ্রির উত্তাপে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সম্পূর্ণ অক্ষত থাকত এবং ৭২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে প্রতি মিনিটে এক হাজার ক্ষার জোড়া লাগাতে পারত।

ট্যাক পলিমারেজ আসার সাথে সাথে পিসিআর স্বয়ংক্রিয় হয়ে গেল ডেস্কটপ থার্মাল সাইক্লার মেশিনের ভেতর। একটি ছোট প্লাস্টিকের নলে সামান্য ডিএনএ, প্রাইমার, ক্ষার ও ট্যাক পলিমারেজ দিয়ে মেশিনের বোতাম চেপে বাড়ি চলে যাওয়া যেত; তিন ঘণ্টা পর ফিরে এসে দেখা যেত টেস্টটিউবে জমা হয়ে গেছে এক কোটি নিখুঁত জিন!

পিসিআরের প্রভাব মানব সভ্যতার প্রতিটি শাখায় বিদ্যুৎচমকের মতো ছড়িয়ে পড়ল। এটি অপরাধ তদন্তে ফরেনসিক ডিএনএ ফিঙ্গারপ্রিন্টিংয়ের জন্ম দিল (একটি মাত্র রক্তের দাগ বা আঙুলের ছাপ থেকে অপরাধী শনাক্তকরণ); গর্ভস্থ শিশুর জিনগত রোগ নির্ণয় সম্ভব করল; বিলুপ্ত ম্যামথ ও নিয়ান্ডারথালের কঙ্কাল থেকে ডিএনএ উদ্ধার করে প্রাচীন ইতিহাসকে জীবন্ত করল; এবং করোনা মহামারীর মতো বৈশ্বিক দুর্যোগে হয়ে উঠল রোগ নির্ণয়ের প্রধান হাতিয়ার (RT-qPCR)। ১৯৯৩ সালে কেরি মুলিস তাঁর এই অনন্য সাধারণ আবিষ্কারের জন্য রসায়নে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন।