বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে বিবর্তন জীববিজ্ঞানে এক তীব্র গৃহযুদ্ধ চলছিল। একদিকে ছিলেন চার্লস ডারউইনের চিরাচরিত অনুসারীরা—যাঁরা বিশ্বাস করতেন প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে জীবের ধারাবাহিক ও ধীর গতির বাহ্যিক রূপান্তরের ফলেই নতুন প্রজাতির জন্ম হয়। অন্যদিকে ছিলেন মেন্ডেলের অনুসারীরা—যাঁরা মনে করতেন বংশগতি হলো কণিকাগত ও বিচ্ছিন্ন এবং হঠাৎ বড় বড় মিউটেশনের মাধ্যমেই বিবর্তন ঘটে। মঠের বাগানের মেন্ডেলীয় বংশগতির সাথে গ্যালাপাগোস দ্বীপের ডারউইনীয় প্রাকৃতিক নির্বাচনের ঐতিহাসিক মেলবন্ধন ঘটাতে প্রয়োজন ছিল এক নতুন গাণিতিক শাখার: যার নাম তাত্ত্বিক পপুলেশন জেনেটিক্স (Theoretical Population Genetics)।

হার্ডি-ওয়েনবার্গ ভারসাম্য (১৯০৮)

১৯০৮ সালে ব্রিটিশ গণিতবিদ জি. এইচ. হার্ডি এবং জার্মান চিকিৎসক ভিলহেল্ম ওয়েনবার্গ স্বাধীনভাবে এই গাণিতিক ভিত্তির সূচনা করেন। মেন্ডেলের তত্ত্ব প্রকাশের পর অনেক সমালোচক যুক্তি দিয়েছিলেন যে প্রকট জিনগুলো যেহেতু শক্তিশালী, তাই সময়ের সাথে সাথে প্রকট বৈশিষ্ট্যটি পুরো জনসংখ্যায় ছড়িয়ে পড়বে এবং প্রচ্ছন্ন বৈশিষ্ট্য চিরতরে হারিয়ে যাবে। হার্ডি ও ওয়েনবার্গ গণিত দিয়ে দেখালেন যে এই ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত।

একটি বৃহৎ ও অবাধ প্রজননশীল জনসংখ্যায় দুটি অ্যালিলের ($A$ এবং $a$) অনুপাত যদি $p$ এবং $q$ হয় (যেখানে $p + q = ১$), তবে দ্বিপদী বিস্তারের নিয়মে পরবর্তী প্রজন্মের জিনোটাইপের অনুপাত হবে:

$$(p + q)^২ = p^২ + ২pq + q^২ = ১$$

  • $p^২$: বিশুদ্ধ প্রকট জীবের অনুপাত ($AA$)
  • $২pq$: সংকর হেটেরোজাইগাস জীবের অনুপাত ($Aa$)
  • $q^২$: বিশুদ্ধ প্রচ্ছন্ন জীবের অনুপাত ($aa$)

যদি জনসংখ্যায় কোনো মিউটেশন না ঘটে, বাইরে থেকে কেউ প্রবেশ না করে, প্রাকৃতিক নির্বাচন অনুপস্থিত থাকে এবং প্রজনন সম্পূর্ণ দৈবচয়ন ভিত্তিক হয়—তবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম জিনের এই অনুপাত সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত থাকবে। হার্ডি-ওয়েনবার্গ সূত্র জীববিজ্ঞানের পরম মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিল: যদি কোনো জনসংখ্যায় জিনের অনুপাত পরিবর্তিত হয়, তবে বুঝতে হবে সেখানে বিবর্তন সক্রিয় রয়েছে।

আধুনিক বিবর্তনীয় সংশ্লেষণ: ফিশার, হ্যালডেন ও রাইট

১৯২০ ও ৩০-এর দশকে রোনাল্ড ফিশার, জে. বি. এস. হ্যালডেন এবং আমেরিকান গণিতবিদ সিওয়াল রাইট (১৮৮৯–১৯৮৮) মেন্ডেলের সাথে ডারউইনের মিলন ঘটিয়ে জন্ম দিলেন মডার্ন সিন্থেসিস।

সিওয়াল রাইট এক অসাধারণ সত্য আবিষ্কার করলেন: জেনেটিক ড্রিফট (Genetic Drift)। জনসংখ্যা যদি ছোট বা বিচ্ছিন্ন হয়, তবে সেখানে প্রাকৃতিক নির্বাচন জয়ী হতে পারে না; বরং জননকোষের মিলনের সময় ভাগ্যের খেলায় আকস্মিকভাবে কোনো কোনো জিন চিরতরে হারিয়ে যায় অথবা কোনো ক্ষতিকর জিনও ভাগ্যের জোরে ১০০% স্থায়ী হয়ে যেতে পারে।

রাইট বিবর্তনকে কল্পনা করেছিলেন একটি অ্যাডাপটিভ ল্যান্ডস্কেপ বা মানচিত্র হিসেবে—যেখানে পাহাড়ের উচ্চতা প্রকাশ করে জীবের টিকে থাকার উপযোগিতা। প্রাকৃতিক নির্বাচন সবসময় জীবকে নিকটবর্তী পাহাড়ের চূড়ায় তুলে দেয়, কিন্তু মাঝে থাকা নিচু উপত্যকা পেরিয়ে আরও উঁচুতে নিয়ে যেতে পারে কেবল জেনেটিক ড্রিফটের এলোমেলো ঝাঁকুনি।

মটো কিমুরা ও নিউট্রাল থিওরি (১৯৬৮)

১৯৬০-এর দশকের শেষের দিকে যখন বিভিন্ন প্রাণীর প্রোটিন ও ডিএনএ সিকোয়েন্স করা হলো, বিজ্ঞানীরা এক অভাবনীয় দৃশ্য প্রত্যক্ষ করলেন: লক্ষ লক্ষ বছর ধরে বিভিন্ন প্রজাতির ডিএনএ-তে ক্ষারের পরিবর্তন ঘটছে ঘড়ির কাঁটার মতো এক অবিশ্বাস্য সুষম গতিতে—যাকে পল পলিং ও এমিল জুকারক্যান্ডল নাম দিলেন মলিকিউলার ক্লক (Molecular Clock)।

প্রাকৃতিক নির্বাচন যদি প্রতিটি পরিবর্তনের চালিকাশক্তি হতো, তবে এই ঘড়ির কাঁটার গতি এত নিখুঁত হওয়া অসম্ভব ছিল; কারণ পরিবেশের পরিবর্তন কোনো নির্দিষ্ট ছকে ঘটে না। ১৯৬৮ সালে জাপানি তাত্ত্বিক বিজ্ঞানী মটো কিমুরা (১৯২৪–১৯৯৪) উপস্থাপন করলেন আধুনিক জীববিজ্ঞানের অন্যতম বৈপ্লবিক তত্ত্ব: দ্য নিউট্রাল থিওরি অব মলিকিউলার ইভোলিউশন:

“আণবিক পর্যায়ে ডিএনএ ও প্রোটিনের যে হাজার হাজার পরিবর্তন ঘটে—তার সিংহভাগই কোনো প্রাকৃতিক নির্বাচনের ফসল নয়; বরং তা ঘটে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও ক্ষতিকরহীন মিউটেশনের ওপর জেনেটিক ড্রিফটের দৈবচয়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।”
— মটো কিমুরা, নেচার (১৯৬৮)

কিমুরা বললেন, জীবের বাহ্যিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হয়তো প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমেই গঠিত হয়; কিন্তু ডিএনএ-র গভীরে থাকা সমার্থক কোডন ও নন-কোডিং অংশে ঘটা কোটি কোটি পরিবর্তন জীবের জীবন-মৃত্যুতে কোনো ভূমিকা রাখে না। এই নিরপেক্ষ মিউটেশনগুলো সময়ের সাথে সাথে এলোমেলোভাবে সঞ্চিত হতে থাকে। কিমুরা গাণিতিকভাবে প্রমাণ করলেন যে নিরপেক্ষ পরিবর্তনের সঞ্চয়ের হার ($k$) সরাসরি নিরপেক্ষ মিউটেশনের হারের ($mu$) সমান—যা জনসংখ্যার আকারের ওপর মোটেও নির্ভর করে না!

কিমুরার এই সমীকরণ মলিকিউলার ঘড়ির রহস্য উন্মোচন করল। পপুলেশন জেনেটিক্স প্রমাণ করল—প্রকৃতির হিংস্র জীবন সংগ্রামের অন্তরালে বয়ে চলেছে নিরপেক্ষ জিনের এক শান্ত ও অবিরাম নদী, যা লক্ষ কোটি বছর ধরে মহাকালের সময় গণনা করে চলেছে।