এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে মানুষের বিবর্তন বোঝার একমাত্র উপায় ছিল প্রাচীন গুহা থেকে পাওয়া ফসিল: মাটির নিচে পাথরে পরিণত হওয়া খুলি, চোয়ালের দাঁত কিংবা পাথরের প্রাচীন অস্ত্র। জীবাশ্মবিদরা বিতর্কে লিপ্ত ছিলেন—আধুনিক মানুষ (Homo sapiens) আফ্রিকা থেকে বের হয়ে নিয়ান্ডারথালের মতো অন্যান্য বিলুপ্ত মানুষকে কোনো রকম যৌন মিলন ছাড়াই সম্পূর্ণ প্রতিস্থাপন করেছিল, নাকি তাদের মাঝে রক্তের সংমিশ্রণ ঘটেছিল? কিন্তু পাথরের কঙ্কাল দেখে এই বিতর্কের চূড়ান্ত সমাধান করা অসম্ভব ছিল; কারণ কঙ্কালের আকার পরিবেশের ওপর নির্ভর করে বদলে যেতে পারে। মানবজাতির আসল কুলজি উদ্ধার করতে প্রয়োজন ছিল প্রাচীন মানুষের শরীরের আসল রাসায়নিক সংকেত—তাদের ডিএনএ পাঠ করা। দীর্ঘকাল ধরে একে ভাবা হতো সম্পূর্ণ অসম্ভব: একটি জীব মারা যাওয়ার পর তার কোষের এনজাইম এবং মাটির ব্যাকটেরিয়া কয়েক বছরের মধ্যে ডিএনএ-কে খেয়ে শেষ করে ফেলে। সেই অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন সুইডিশ জিনবিজ্ঞানী সভান্তে প্যাবো (জন্ম ১৯৫৫)।
ক্ষয়ের পদার্থবিজ্ঞান: প্রাচীন ডিএনএ-র পুনরুত্থান
জার্মানির লাইপজিগে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর ইভোলিউশনারি অ্যানথ্রোপোলজিতে বসে প্যাবো প্রতিষ্ঠা করলেন বিজ্ঞানের এক নতুন শাখা: প্যালিয়োজেনোমিক্স (Paleogenomics)। চল্লিশ হাজার বছর পুরানো বরফ যুগের হাড় থেকে উদ্ধার করা ডিএনএ আধুনিক ডিএনএ-র মতো দীর্ঘ ও অক্ষত ছিল না; তা ছিল মাত্র ৩০ থেকে ৭০টি ক্ষারের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এক জীর্ণ টুকরো। সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল, জীবাশ্মের হাড়ের ৯৯% ডিএনএ-ই ছিল মাটির ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের।
আরও মারাত্মক বিপদ ছিল আধুনিক মানুষের দূষণ: খননকারী বিজ্ঞানী বা ল্যাবের টেকনিশিয়ানের একটিমাত্র মাথার খুশকি বা ঘামের ফোঁটা থেকে কোটি কোটি আধুনিক ডিএনএ এসে প্রাচীন জীবাশ্মের সামান্য চিহ্নকে নিমেষেই ঢেকে দিতে পারত। এই বিপদ এড়াতে প্যাবো তৈরি করলেন মহাকাশযানের মতো আল্ট্রা-ক্লিন ল্যাবরেটরি—যেখানে বাতাস সবসময় উচ্চচাপে বাইরে ঠেলে দেওয়া হতো এবং গবেষকরা নভোচারীদের মতো বিশেষ পোশাক পরে অতিবেগুনী রশ্মির নিচে কাজ করতেন।
প্যাবো প্রাচীন ডিএনএ-র একটি অনন্য রাসায়নিক ক্ষতের রূপরেখা আবিষ্কার করলেন:
- হাইড্রোলাইসিস ও খণ্ডন: হাজার হাজার বছর ধরে পানির সংস্পর্শে ডিএনএ-র ক্ষার খসে গিয়ে সুতোটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়।
- সাইটোসিন ডিমিনেশন: বরফ যুগের শীতল গুহায় শতাব্দীর পর শতাব্দী পড়ে থাকতে থাকতে সাইটোসিন ক্ষার থেকে অ্যামিন মূলক খসে গিয়ে তা রূপান্তরিত হয় ইউরাসিল ($U$)-এ। সিকোয়েন্সিং করার সময় পলিমারেজ এনজাইম এই ইউরাসিলকে পড়ে থাইমিন ($T$) হিসেবে। ফলে আসল প্রাচীন ডিএনএ-র দুই মাথায় সবসময় প্রচুর পরিমাণে সাইটোসিন থেকে থাইমিন ($C rightarrow T$) পরিবর্তন দেখতে পাওয়া যায়।
এই নির্দিষ্ট ক্ষতের প্যাটার্ন কম্পিউটার দিয়ে মেপে প্যাবো শতভাগ নিশ্চিত হলেন যে তাঁর উদ্ধার করা অণুগুলো কোনো আধুনিক ল্যাব দূষণ নয়, বরং তা হাজার হাজার বছর আগের বরফ যুগের আসল ফসিল থেকে আসা জীবন্ত অণু!
নিয়ান্ডারথাল জিনোম (২০১০) ও রক্তে মিশে থাকা ইতিহাস
২০১০ সালের মে মাসে ক্রোয়েশিয়ার ভিন্দিজা গুহা থেকে পাওয়া তিনটি নিয়ান্ডারথাল নারী কঙ্কালের সামান্য গুঁড়ো থেকে প্যাবোর দল পৃথিবীর সামনে উন্মোচন করলেন নিয়ান্ডারথালের প্রথম পূর্ণাঙ্গ জিনোম মানচিত্র। যখন তাঁরা সেই প্রাচীন ডিএনএ-কে আধুনিক মানুষের সাথে মিলিয়ে দেখলেন, সারা বিশ্বের নৃতত্ত্ব জগৎ এক তীব্র আলোড়নে কেঁপে উঠল!
বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেলেন নিয়ান্ডারথালরা সম্পূর্ণ আলাদাভাবে হারিয়ে যায়নি। আফ্রিকা মহাদেশের বাইরের প্রতিটি আধুনিক মানুষের (ইউরোপীয়, এশীয়, আদিবাসী আমেরিকান ও অস্ট্রেলীয়) শরীরে আজও ১% থেকে ২% নিয়ান্ডারথালের ডিএনএ বেঁচে রয়েছে! আজ থেকে ষাট হাজার বছর আগে আধুনিক মানুষ যখন আফ্রিকা ছেড়ে মধ্যপ্রাচ্যে প্রবেশ করেছিল, তখন সেখানে বসবাসরত নিয়ান্ডারথালদের সাথে তাদের মিলন ঘটেছিল। এই প্রাচীন জিন আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং শীতপ্রধান দেশের ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় টিকে থাকার জন্য বিশেষ কেরাটিন তৈরিতে সাহায্য করেছিল।
ডেনিসোভান রহস্য: একটিমাত্র আঙুলের হাড়
২০১০ সালে সাইবেরিয়ার আলতাই পর্বতমালার ডেনিসোভা গুহা থেকে পাওয়া একটি মানব শিশুর কনিষ্ঠা আঙুলের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এক টুকরো হাড় প্যাবোর ল্যাবে পৌঁছাল। সেই হাড় থেকে উদ্ধার করা ডিএনএ সিকোয়েন্স করে বিজ্ঞানীরা হতবাক হয়ে গেলেন: এটি নিয়ান্ডারথালও নয়, আবার আধুনিক মানুষও নয়; এটি ছিল মানুষের সম্পূর্ণ অজানা এক তৃতীয় প্রজাতি: ডেনিসোভান (Denisovans)!
আজকের মেলানেশীয় ও অস্ট্রেলীয় আদিবাসীদের রক্তে আজও প্রায় ৪% থেকে ৬% ডেনিসোভান ডিএনএ বইছে। সবচেয়ে রোমাঞ্চকর তথ্য হলো, আধুনিক তিব্বতিরা হিমালয়ের উচ্চতায় অক্সিজেন স্বল্পতার মধ্যেও সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে পারে যে জিনের কারণে (EPAS1 জিন)—সেই জিনের বিশেষ রূপটি তিব্বতিরা সরাসরি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিল এই প্রাচীন ডেনিসোভানদের কাছ থেকে! বিলুপ্ত মানুষের জিনোম উদ্ধার এবং মানবজাতির প্রাচীন মিলনের রহস্য উন্মোচনের জন্য ২০২২ সালে সভান্তে প্যাবো চিকিৎসাবিজ্ঞানে একক নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। বিজ্ঞান প্রমাণ করল—আমাদের হারিয়ে যাওয়া পূর্বপুরুষরা মাটির নিচে হারিয়ে যাননি; তাঁদের রক্ত আজও আমাদের ধমনীতে স্পন্দিত হচ্ছে।