১৯৬০ সালের প্রারম্ভে আণবিক জিনতত্ত্ব ডিএনএ-র দ্বিসূত্রক কাঠামো ও জেনেটিক কোডের সার্বজনীন ভাষার সমাধান করেছিল। কিন্তু জীবনের একটি মৌলিক প্রশ্ন তখনো সম্পূর্ণ অনুদ্ঘাটিত ছিল: জিন নিয়ন্ত্রণ (Gene Regulation)। একটি জীবকোষ তার জিনোমে থাকা সমস্ত জিন থেকে একই সাথে প্রোটিন তৈরি করে না; এমনটি ঘটলে তীব্র বিপাকীয় অপচয়ে কোষের মৃত্যু অনিবার্য হতো। আরও গভীর সত্য হলো, একটি বহুকোষী জীবের চোখের রেটিনা কোষ, ত্বকের কেরাটিনোসাইট কোষ এবং অগ্ন্যাশয়ের বিটা কোষ—সবার ভেতর হুবহু একই সম্পূর্ণ ডিএনএ লাইব্রেরি বিদ্যমান; অথচ প্রতিটি কোষ সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন প্রোটিন তৈরি করে স্বকীয় রূপ ধারণ করে। কোষ কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয় কখন কোন জিন চালু হবে আর কখন বন্ধ থাকবে? এই প্রশ্নের জবাব এসেছিল প্যারিসের পাস্তুর ইনস্টিটিউট থেকে, দুই মহান ফরাসি বিজ্ঞানী ফ্রাঁসোয়া জ্যাকব (১৯২০–২০১৩) এবং জ্যাক মনোদ (১৯১০–১৯৭৬)-এর যৌথ গবেষণার মাধ্যমে।
ডায়অক্সি ঘটনা ও ল্যাকটোজের বিপাক
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসিদের দখলে থাকা প্যারিসে বসে জ্যাক মনোদ ইশেরিকিয়া কোলাই ব্যাকটেরিয়ার খাদ্য গ্রহণ ও বৃদ্ধির গতিবিদ্যা নিয়ে কাজ করছিলেন। যখন তিনি গ্লুকোজ ও ল্যাকটোজ নামক দুটি শর্করা একসাথে ব্যাকটেরিয়াকে খেতে দিলেন, তখন তিনি বৃদ্ধির গ্রাফে এক অদ্ভুত বিরতি প্রত্যক্ষ করলেন, যাকে বলা হয় ডায়অক্সি (Diauxie):
- প্রথমে ব্যাকটেরিয়া অত্যন্ত দ্রুত সমস্ত গ্লুকোজ খেয়ে শেষ করে বৃদ্ধি পেল।
- গ্লুকোজ শেষ হওয়ার সাথে সাথে বৃদ্ধির গতি প্রায় এক ঘণ্টার জন্য সম্পূর্ণ থেমে গেল।
- এরপর ব্যাকটেরিয়া পুনরায় নতুন গতিতে ল্যাকটোজ হজম করতে শুরু করল।
মনোদ উপলব্ধি করলেন, গ্লুকোজ ভাঙার এনজাইমগুলো কোষে সবসময় তৈরি থাকে; কিন্তু ল্যাকটোজ ভাঙার প্রধান এনজাইম বিটা-গ্যালাক্টোসিডেস ($beta$-galactosidase) কোষে আগে থেকে থাকে না। ল্যাকটোজ না থাকলে কোষে এই এনজাইমের সংখ্যা থাকে পাঁচটিরও কম। কিন্তু পরিবেশে ল্যাকটোজ যুক্ত করার সাথে সাথে মাত্র কয়েক মিনিটের মাথায় হাজার গুণ বেশি এনজাইম তৈরি হতে থাকে, যা কোষের মোট প্রোটিনের প্রায় ৬-৭% দখল করে নেয়। একটি সাধারণ শর্করা কীভাবে জিনের সুইচে চাপ দিল?
পাজামো পরীক্ষা ও অপারন মডেল
১৯৫৮ সালে মনোদ, ফ্রাঁসোয়া জ্যাকব এবং আর্থার পার্ডি মিলে পরিচালনা করলেন তাঁদের বিখ্যাত পাজামো পরীক্ষা (PaJaMo Experiment)। ব্যাকটেরিয়ার মিলনের (Conjugation) মাধ্যমে তাঁরা একটি সুস্থ ব্যাকটেরিয়ার জিন এমন এক মিউট্যান্ট ব্যাকটেরিয়ায় প্রবেশ করালেন যা নিজে ল্যাকটোজ ভাঙার এনজাইম তৈরি করতে অক্ষম ছিল।
ফলাফল দেখে তাঁরা বুঝতে পারলেন, কোষীয় জিন চালু করার পেছনে কোনো ‘অ্যাক্টিভেটর’ নেই; বরং প্রকৃতি কাজ করে নেতিবাচক দমন বা রিপ্রেশন (Negative Repression)-এর মাধ্যমে:
- স্বাভাবিক অবস্থায় জিনটি সবসময় বন্ধ থাকে।
- একটি নিয়ন্ত্রক জিন (যাকে নাম দেওয়া হলো $lacI$) সবসময় একটি বিশেষ প্রোটিন তৈরি করে, যার নাম ল্যাক রিপ্রেসর (Lac Repressor)।
- এই রিপ্রেসর প্রোটিনটি গিয়ে ডিএনএ-র একটি নির্দিষ্ট দরজায় শক্ত করে চেপে বসে থাকে, যার নাম জ্যাকব ও মনোদ দিলেন অপারেটর ($O$)।
- অপারেটরে রিপ্রেসর বসে থাকলে আরএনএ পলিমারেজ এনজাইম সামনে এগোতে পারে না, ফলে কাঠামোগত তিনটি জিন—$lacZ$ (বিটা-গ্যালাক্টোসিডেস), $lacY$ (পারমিয়েজ ট্রান্সপোর্টার) এবং $lacA$ (ট্রান্সঅ্যাসিটাইলেজ)—ট্রান্সক্রিপশন হতে পারে না।
একসাথে নিয়ন্ত্রিত এই সম্পূর্ণ জিনগুচ্ছকে তাঁরা নাম দিলেন অপারন (Operon)।
“অপারন হলো সমন্বিত জিন প্রকাশের এক কার্যকরী একক—যেখানে একাধিক কাঠামোগত জিন একটি সাধারণ প্রমোটর ও অপারেটরের অধীনে একসাথে একটিমাত্র পলিসিস্ট্রনিক মেসেঞ্জার আরএনএ-তে অনুলিপিত হয়।”
— ফ্রাঁসোয়া জ্যাকব ও জ্যাক মনোদ, জার্নাল অব মলিকিউলার বায়োলজি (১৯৬১)
অ্যালস্টেরি: আণবিক কম্পিউটিং সুইচ
ল্যাকটোজ যোগ করলে কীভাবে সুইচ চালু হয়? ল্যাকটোজ কোষে প্রবেশ করার পর তার একটি ছোট অংশ অ্যালোল্যাকটোজ-এ রূপান্তরিত হয়। এই অ্যালোল্যাকটোজ হলো আসল ইন্ডিউসার। এটি ডিএনএ স্পর্শ করে না; বরং এটি সরাসরি গিয়ে ল্যাক রিপ্রেসর প্রোটিনের গায়ে একটি বিশেষ খাঁজে আটকে যায়।
মনোদ একে বললেন অ্যালস্টেরিক পরিবর্তন (Allosteric Transition)। অ্যালোল্যাকটোজ যুক্ত হওয়ার সাথে সাথে রিপ্রেসর প্রোটিনটির ত্রিমাত্রিক আকার সামান্য বদলে যায়, যার ফলে অপারেটর ডিএনএ-কে ধরে রাখার ক্ষমতা তার দশ হাজার গুণ কমে যায়! চাবি খুলে যাওয়ার মতো রিপ্রেসরটি ডিএনএ থেকে খসে পড়ে। সাথে সাথে আরএনএ পলিমারেজ মুক্তি পেয়ে সামনের দিকে ছুটে যায় এবং দীর্ঘ একটি পলিসিস্ট্রনিক mRNA তৈরি করে তিনটি এনজাইমই একসাথে বিপুল পরিমাণে সংশ্লেষণ করে ফেলে।
ল্যাকটোজ খাওয়া শেষ হয়ে গেলে অ্যালোল্যাকটোজও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়; রিপ্রেসর আবার আগের রূপ ফিরে পেয়ে চোখের পলকে অপারেটরে বসে পড়ে এবং জিন বন্ধ করে দেয়। জিনোম কোনো জড় পাথরের শিলালিপি নয়; এটি এক জীবন্ত, গতিশীল বায়োকেমিক্যাল সাইবারনেটিক সার্কিট যা লজিক গেটের মতো কাজ করে। মনোদ বিখ্যাত মন্তব্য করেছিলেন: “যা ই. কোলাই-এর জন্য সত্য, তা হাতির জন্যও সত্য।” উচ্চতর জীবে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরও জটিল হলেও, অ্যালস্টেরিক ট্রান্সক্রিপশনাল সুইচের মৌলিক যুক্তিটিই আজ সমগ্র জীবজগতের চালিকাশক্তি।