১৮২৪ সালে আটাশ বছর বয়সী ফরাসি সামরিক প্রকৌশলী নিকোলাস লিওনার্দ সাদি কার্নো মাত্র পঁয়ষট্টি পৃষ্ঠার একটি ছোট পুস্তিকা প্রকাশ করেন: Réflexions sur la puissance motrice du feu (“আগুনের চালিকাশক্তি বিষয়ক প্রতিফলন”)। শিল্পবিপ্লবের প্রারম্ভে বাষ্পীয় ইঞ্জিনগুলো ছিল কয়লাখেকো, ভারী এবং অবিশ্বাস্য রকমের অদক্ষ। সমসাময়িক বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করতেন কাজ উৎপন্ন হয় “ক্যালরিক” নামক এক ভরহীন তাপীয় তরলের ধ্বংস বা খরচের মাধ্যমে। কার্নো এই বস্তুগত ধারণাকে ধূলিসাৎ করেন। তিনি উপলব্ধি করেন, তাপ ধ্বংস হয়ে কাজ সৃষ্টি হয় না; বরং কাজ তৈরি হয় একটি উঁচু তাপীয় বিভব থেকে নিচু তাপীয় বিভবে তাপের পতনের মাধ্যমে—ঠিক যেভাবে পাহাড়ের ওপর থেকে নিচে নেমে আসা পানির স্রোত জলচক্রের চাকা ঘুরিয়ে দেয়।

আদর্শ ইঞ্জিন ও পরিবর্তনশীলতার ধারণা (Reversibility)

কার্নো এমন এক মৌলিক প্রশ্ন তুলেছিলেন যা তার যুগের সমস্ত ধাতুবিদ্যা ও যান্ত্রিক কলাকৌশলকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল: একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ তাপ থেকে সর্বাধিক কতটুকু যান্ত্রিক কাজ বের করে আনা সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তিনি ঘর্ষণ,乱流 ও অনিচ্ছাকৃত পরিবাহিতা রোধ করে এক আদর্শ, কাল্পনিক ইঞ্জিনের নকশা তৈরি করেন, যা চারটি অত্যন্ত ধীর ও প্রত্যাবর্তী (quasi-static reversible) ধাপের মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণ হয়:

  1. প্রত্যাবর্তী সমোষ্ণ প্রসারণ ($১ to ২$): সিলিন্ডারটিকে $T_H$ পরম তাপমাত্রার একটি উষ্ণ আধারের সংস্পর্শে রাখা হয়। গ্যাসটি $V_1$ থেকে $V_2$ আয়তনে প্রসারিত হতে হতে $Q_H$ তাপ শোষণ করে, কিন্তু তার তাপমাত্রা অপরিবর্তিত থাকে। এখানে কৃতকাজের পরিমাণ $W_{12} = int_{V_1}^{V_2} P , dV = n R T_H ln(V_2 / V_1) = Q_H$।
  2. প্রত্যাবর্তী রুদ্ধতাপীয় প্রসারণ ($২ to ৩$): সিলিন্ডারটিকে তাপীয়ভাবে বিচ্ছিন্ন করা হয় ($dQ = 0$)। গ্যাসটি পিস্টনের ওপর চাপ প্রয়োগ করে আরও প্রসারিত হতে গিয়ে নিজস্ব অভ্যন্তরীণ শক্তি ব্যয় করে শীতল হয় এবং তাপমাত্রা $T_H$ থেকে নেমে $T_C$-তে পৌঁছায়।
  3. প্রত্যাবর্তী সমোষ্ণ সংকোচন ($৩ to ৪$): সিলিন্ডারটিকে $T_C$ তাপমাত্রার শীতল আধারের সংস্পর্শে স্থাপন করে বাইরে থেকে পিস্টনে চাপ দিয়ে গ্যাসকে সংকুচিত করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় গ্যাস $Q_C$ পরিমাণ তাপ শীতল আধারে বর্জন করে: $|Q_C| = n R T_C ln(V_3 / V_4)$।
  4. প্রত্যাবর্তী রুদ্ধতাপীয় সংকোচন ($৪ to ১$): পুনরায় সিলিন্ডারটিকে অন্তরক দিয়ে ঘিরে সংকুচিত করে আদি দশায় $(P_1, V_1, T_H)$ ফিরিয়ে আনা হয়।

কার্নোর উপপাদ্য ও দক্ষতার পরম সীমা

যেহেতু এই আদর্শ চক্রের প্রতিটি ধাপ সম্পূর্ণ প্রত্যাবর্তী, তাই এই ইঞ্জিনটিকে বিপরীতভাবে চালিয়ে একটি আদর্শ রেফ্রিজারেটর তৈরি করা সম্ভব। বাইরে থেকে $W$ কাজ প্রয়োগ করে শীতল আধার থেকে $Q_C$ তাপ তুলে উষ্ণ আধারে $Q_H$ তাপ নিক্ষেপ করা যায়। দ্বিতীয় প্রকার চিরস্থায়ী গতির (Perpetual motion of the second kind) অসম্ভবতা প্রমাণ করে কার্নো তার ঐতিহাসিক উপপাদ্য দেন:

কার্নোর উপপাদ্য: দুটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রার আধারের মধ্যে ক্রিয়াশীল কোনো তাপ ইঞ্জিনই একটি প্রত্যাবর্তী ইঞ্জিনের চেয়ে বেশি দক্ষ হতে পারে না, এবং একই তাপমাত্রার মধ্যে চালিত সকল প্রত্যাবর্তী ইঞ্জিনের কর্মদক্ষতা সমান—ব্যবহৃত গ্যাস বা পদার্থের ধরনের ওপর তা কোনোভাবেই নির্ভরশীল নয়।

আদর্শ গ্যাসের ক্ষেত্রে রুদ্ধতাপীয় সম্পর্কের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, তাপীয় বিনিময়ের অনুপাত সরাসরি আধারদ্বয়ের পরম তাপমাত্রার অনুপাতের সমান:

$$frac{Q_C}{Q_H} = frac{T_C}{T_H}$$

ফলে কার্নো ইঞ্জিনের কর্মদক্ষতা শুধুমাত্র তাপমাত্রার ব্যবধানের একটি পরম জ্যামিতিক ধ্রুবক:

$$eta_{text{Carnot}} = frac{W_{text{net}}}{Q_H} = frac{Q_H – Q_C}{Q_H} = 1 – frac{T_C}{T_H}$$

ক্লসিয়াস, অপচয়ের সমাকলন ও এন্ট্রপির জন্ম

কার্নোর মৃত্যুর কয়েক দশক পর জার্মান পদার্থবিদ রুডলফ ক্লসিয়াস তাপমাত্রার এই অনুপাতকে পুনঃবিশ্লেষণ করেন। শোষিত তাপ ধনাত্মক এবং বর্জিত তাপ ঋণাত্মক ধরে তিনি লিখলেন:

$$frac{Q_H}{T_H} + frac{Q_C}{T_C} = 0$$

ক্লসিয়াস বুঝতে পেরেছিলেন যে, চাপ-আয়তন তলে যেকোনো জটিল ও চক্রাকার প্রত্যাবর্তী পথকে অগণিত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কার্নো চক্রের সমষ্টি হিসেবে ভাগ করা যায়। ফলে যেকোনো আবদ্ধ পথে differential তাপ স্থানান্তরকে তাপমাত্রা দিয়ে ভাগ করে সমাকলন করলে তার মান শূন্য হয়:

$$oint frac{delta Q_{text{rev}}}{T} = 0$$

এই সমাকলন প্রমাণ করে যে $dS = frac{delta Q_{text{rev}}}{T}$ একটি প্রকৃত স্টেট ফাংশন (state function)। গ্রিক শব্দ রূপান্তর ($tau rho o pi acute{eta}$) থেকে ক্লসিয়াস এর নাম রাখলেন এন্ট্রপি ($S$)। যেকোনো বাস্তব ও অপ্রত্যাবর্তী চক্রের জন্য ক্লসিয়াসের অসমতা দেখায়:

$$oint frac{delta Q}{T} le 0 implies Delta S ge int frac{delta Q}{T}$$

মহাবিশ্বের যেকোনো বিচ্ছিন্ন ব্যবস্থায় ($delta Q = 0$) এন্ট্রপি কখনো কমতে পারে না: $dS ge 0$। তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্রের এই ছিল মহান সূচনা—মহাবিশ্বে শক্তি অপরিবর্তনশীল হলেও, কাজের উপযোগী শক্তির মান অবিরতভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত ও বিশৃঙ্খল হচ্ছে।