১৮২৭ সালে স্কটিশ উদ্ভিদবিজ্ঞানী রবার্ট ব্রাউন পানিতে ভাসমান Clarkia pulchella উদ্ভিদের পরাগরেণু অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তিনি স্তম্ভিত হয়ে লক্ষ্য করলেন যে পানির ভেতর পরাগরেণু থেকে নির্গত অতিক্ষুদ্র কণাগুলো অবিরাম ও সম্পূর্ণ এলোমেলোভাবে জিগজ্যাগ গতিতে ছুটে বেড়াচ্ছে। ব্রাউন নিশ্চিত করেছিলেন যে এই কণাগুলো কোনো জীবিত সত্ত্বা নয়; কিন্তু প্রায় আট দশক ধরে এই নিরন্তর গতির কোনো ভৌত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। ১৯০৫ সালে তার বিখ্যাত ‘অলৌকিক বর্ষে’ আলবার্ট আইনস্টাইন উপলব্ধি করেন যে ব্রাউনীয় গতিই হলো পরমাণুর অস্তিত্বের সবচেয়ে অকাট্য প্রত্যক্ষ প্রমাণ। পরবর্তীতে পল ল্যাঞ্জেভিনের সাথে যৌথ তত্ত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের এক অমর স্তম্ভ: ফ্লাকচুয়েশন-ডিসিপেশন উপপাদ্য (Fluctuation-Dissipation Theorem)।
আইনস্টাইনের এলোমেলো গতিপথ ও বিচ্ছুরণ সমীকরণ
আইনস্টাইন ব্রাউনীয় গতিকে বিচ্ছুরণ বা ডিফিউশনের দৃষ্টি থেকে বিশ্লেষণ করেন। $tau$ সময় ব্যবধানে প্রতিটি কণা এলোমেলোভাবে $Delta$ দূরত্ব অতিক্রম করে। সম্ভাবনা ঘনত্ব $rho(x, t)$-কে টেইলর ধারায় বিস্তৃত করে আইনস্টাইন ক্লাসিক্যাল ডিফিউশন সমীকরণ প্রতিপাদন করেন:
$$frac{partial rho}{partial t} = D frac{partial^2 rho}{partial x^2}, quad D = frac{langle Delta^2 rangle}{2tau}$$
চিরায়ত বলবিদ্যায় সরণ সময়ের সমানুপাতিক ($x propto t$) হলেও এলোমেলো সংঘর্ষের কারণে ব্রাউনীয় কণার গড় বর্গ সরণ (Mean Square Displacement) সময়ের সাথে রৈখিকভাবে বৃদ্ধি পায়:
$$langle x^2(t) rangle = 2 D t$$
আইনস্টাইন সম্পর্ক: সান্দ্র বাধা ও তাপীয় কোলাহলের মিলন
ডিফিউশন সহগ $D$-কে আণবিক গতির সাথে যুক্ত করতে আইনস্টাইন অভিকর্ষীয় ক্ষেত্রে কণার সাম্যাবস্থা বিবেচনা করেন। সান্দ্রতার কারণে কণার নিচের দিকের গতিবেগ $v = F / gamma$ (যেখানে $gamma = ৬pi eta r$ হলো স্টোকসের সান্দ্রতা সহগ)। সাম্যাবস্থায় নিচের দিকে কণার পতন এবং ওপরের দিকে তাপীয় ডিফিউশন পরস্পরকে ভারসাম্য প্রদান করে। বোল্টজম্যানের ব্যরোমেট্রিক সমীকরণের সাথে এর তুলনা করে আইনস্টাইন তার ঐতিহাসিক সম্পর্কটি প্রতিষ্ঠা করেন:
$$D = frac{k_B T}{gamma} = frac{R T}{N_A (6pi eta r)}$$
এখানে $N_A$ হলো অ্যাভোগাড্রো সংখ্যা। ১৯০৮ সালে ফরাসি বিজ্ঞানী জঁ পেরা এই সমীকরণ ব্যবহার করে অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে কণার গতি মেপে নির্ভুলভাবে অ্যাভোগাড্রো সংখ্যা ($N_A approx ৬.৮ times ১০^{২৩}$) নির্ণয় করেন এবং ১৯২৬ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। পরমাণুর বাস্তব অস্তিত্ব বিজ্ঞানজগতে চিরতরে প্রতিষ্ঠিত হয়।
ল্যাঞ্জেভিন বলবিদ্যা ও স্টোকাস্টিক সমীকরণ
১৯০৮ সালে পল ল্যাঞ্জেভিন নিউটনের দ্বিতীয় সূত্রকে ব্রাউনীয় কণার ওপর প্রয়োগ করে স্টোকাস্টিক সমীকরণের জন্ম দেন। তিনি কণার ওপর প্রযুক্ত পরিবেশগত বলকে দুটি ভাগে ভাগ করেন:
$$m frac{dv}{dt} = -gamma v + xi(t)$$
- সান্দ্রীয় বাধা ($-gamma v$): এটি একটি নির্দিষ্ট প্রতিরোধক বল যা কণার গতিকে ধীর করে দেয় এবং গতিশক্তিকে তাপে রূপান্তর করে।
- র্যান্ডম বল ($xi(t)$): চারপাশের কোটি কোটি পানির অণুর অবিরাম, আকস্মিক ও এলোমেলো ধাক্কার সমষ্টি, যার গড় মান শূন্য ($langle xi(t) rangle = 0$)।
শক্তির সমবণ্টন নীতি ($frac{1}{2} m langle v^2 rangle = frac{1}{2} k_B T$) প্রয়োগ করে ল্যাঞ্জেভিন প্রমাণ করেন যে র্যান্ডম বলের তীব্রতা সরাসরি সান্দ্র বাধার সমানুপাতিক:
$$langle xi(t) xi(t’) rangle = 2 gamma k_B T , delta(t – t’)$$
ফ্লাকচুয়েশন-ডিসিপেশন উপপাদ্য
এই সমীকরণটিই হলো বিশ্বখ্যাত ফ্লাকচুয়েশন-ডিসিপেশন উপপাদ্যের আদি রূপ। সান্দ্র সহগ $gamma$ নির্দেশ করে শক্তির অপচয় (dissipation), আর $xi(t)$ নির্দেশ করে তাপীয় ওঠানামা (fluctuations)। এই উপপাদ্য প্রমাণ করে যে এই দুটি ভিন্ন কোনো ঘটনা নয়: অপচয় ছাড়া ওঠানামা সম্ভব নয়, এবং ওঠানামা ছাড়া অপচয় অসম্ভব। তাপীয় জগতের সান্দ্রীয় বাধা এবং এলোমেলো কোলাহল মূলত একই আণবিক সত্যের দুটি অবিচ্ছেদ্য পিঠ।