১৯২০ সালে জার্মান পদার্থবিদ উইলহেম লেঞ্জ তার ডক্টরেট ছাত্র আর্নস্ট আইসিংকে একটি গাণিতিক সমস্যা সমাধান করতে দেন: চুম্বকীয় পরমাণুগুলোর মধ্যকার মিথস্ক্রিয়া কি স্বতঃস্ফূর্ত চুম্বকত্ব ব্যাখ্যা করতে পারে? ১৯২৫ সালে আইসিং এক-মাত্রিক ল্যাটিসে এই মডেলটি নিখুঁতভাবে সমাধান করেন এবং হতাশ হয়ে দেখতে পান যে পরম শূন্য তাপমাত্রার উপরে কোনো তাপমাত্রাতেই এতে কোনো দশা রূপান্তর ঘটে না ($T_c = 0$)। আইসিং ভুলভাবে সিদ্ধান্তে আসেন যে এই মডেল কখনোই কোনো মাত্রাতেই চুম্বকত্ব প্রদর্শন করবে না। প্রায় দুই দশক ধরে বিজ্ঞানীদের মনে সংশয় তৈরি হয়েছিল যে পরিসংখ্যানিক বলবিদ্যা হয়তো কখনোই বাস্তব দশা রূপান্তর ব্যাখ্যা করতে সক্ষম নয়। কিন্তু ১৯৪৪ সালে নরওয়েজীয়-আমেরিকান রসায়নবিদ লার্স ওনসাগার দ্বি-মাত্রিক আইসিং মডেলের এক অবিশ্বাস্য নিখুঁত গাণিতিক সমাধান প্রকাশ করে বিশ্বকে স্তব্ধ করে দেন।

আইসিং মডেলের হ্যামিল্টোনিয়ান ও ১ডি ব্যর্থতা

আইসিং মডেলে একটি ল্যাটিসের প্রতিটি বিন্দুতে একটি বাইনারি স্পিন চলক $s_i in {+1, -1}$ ধরা হয়, যা ঊর্ধ্বমুখী বা নিম্নমুখী চৌম্বক দ্বিমেরু নির্দেশ করে। পাশাপাশি দুটি স্পিনের আকর্ষণ বল $J > 0$ এবং বাহ্যিক চৌম্বক ক্ষেত্র $h$ হলে হ্যামিল্টোনিয়ান দাঁড়ায়:

$$H(mathbf{s}) = -J sum_{langle i, j rangle} s_i s_j – h sum_{i=1}^N s_i$$

এক মাত্রায় $2 times 2$ ট্রান্সফার ম্যাট্রিক্স (Transfer Matrix) পদ্ধতির সাহায্যে পার্টিশন ফাংশন সম্পূর্ণ বিশ্লেষণাত্মকভাবে সমাধান করা যায়: $Z_{1D} = lambda_+^N + lambda_-^N$। যেহেতু আইগেনমান $lambda_+$ সকল ধনাত্মক তাপমাত্রায় সম্পূর্ণ মসৃণ ও অশূন্য, তাই কোনো গাণিতিক সিঙ্গুলারিটি তৈরি হওয়া সম্ভব নয়। রুডলফ পিয়ার্লস পরবর্তীতে এর ভৌত কারণ ব্যাখ্যা করেন: এক মাত্রায় স্পিনের বিন্যাস ভাঙতে নির্দিষ্ট শক্তি $Delta E = 2J$ লাগলেও এন্ট্রপি বাড়ে $Delta S = k_B ln N$ হারে। কণা সংখ্যা $N to infty$ হলে মুক্ত শক্তি $Delta F = 2J – k_B T ln N < 0$ হয়ে যায়, ফলে সামান্য তাপীয় কম্পনেই এক-মাত্রিক চৌম্বক শৃঙ্খল ভেঙে ধূলিসাৎ হয়ে যায়।

পিয়ার্লস যুক্তি ও ক্রামার্স-ওয়ানিয়ার দ্বৈততা

১৯৩৬ সালে পিয়ার্লস প্রমাণ করেন যে দ্বি-মাত্রায় নিম্ন তাপমাত্রায় দীর্ঘস্থায়ী চুম্বকত্ব অক্ষুণ্ণ থাকে। বিপরীত স্পিনের অঞ্চলকে আলাদা করতে যে সীমানা তৈরি হয় তার পরিধি $L$ হলে শক্তির ব্যয় হয় $Delta E = 2 J L$। যেহেতু $L$ দৈর্ঘ্যের আবদ্ধ লুপ তৈরির উপায়ের সংখ্যা $c^L$ হারে বাড়ে, তাই নিম্ন তাপমাত্রায় মুক্ত শক্তির পরিবর্তন ধনাত্মক থাকে ($Delta F > 0$), যা স্বতঃস্ফূর্ত চুম্বকত্বকে রক্ষা করে।

১৯৪১ সালে হেন্ড্রিক ক্রামার্স এবং গ্রেগরি ওয়ানিয়ার আবিষ্কার করেন ক্রামার্স-ওয়ানিয়ার দ্বৈততা (Kramers-Wannier Duality)। তারা দেখান যে উচ্চ তাপমাত্রার দ্বি-মাত্রিক বর্গাকার ল্যাটিস হুবহু নিম্ন তাপমাত্রার দ্বৈত ল্যাটিসের সমান। এই প্রতিসাম্য থেকে তারা কোনো সমীকরণ সমাধান না করেই নিখুঁত সন্ধি তাপমাত্রার মান গণনা করেন:

$$sinhleft(frac{2J}{k_B T_c}right) = 1 implies frac{k_B T_c}{J} = frac{2}{ln(1 + sqrt{2})} approx ২.২৬৯১৮৫$$

ওনসাগারের নিখুঁত সমাধান (১৯৪৪)

বিংশ শতাব্দীর গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম সেরা কীর্তি স্থাপন করে লার্স ওনসাগার শূন্য বাহ্যিক ক্ষেত্রে অসীম ল্যাটিসের জন্য ট্রান্সফার ম্যাট্রিক্সকে ক্লিফোর্ড অ্যালজেব্রার মাধ্যমে রূপান্তর করে পার্টিশন ফাংশনের নিখুঁত রূপ প্রতিপাদন করেন:

$$-beta f = ln(2 cosh 2K) + frac{1}{2pi} int_{0}^{pi} lnleft[ frac{1}{2}left( 1 + sqrt{1 – kappa^2 sin^2 theta} right) right] dtheta$$

যেখানে সন্ধি তাপমাত্রায় $kappa = 1$ হলে উপবৃত্তীয় সমাকলনে নিখুঁত সিঙ্গুলারিটি তৈরি হয়। ওনসাগার প্রমাণ করেন যে সন্ধিবিন্দুতে আপেক্ষিক তাপ লগারিদমিক হারে অসীমে ধাবিত হয়:

$$C_V sim – frac{2 k_B}{pi} left(frac{2J}{k_B T_c}right)^2 ln|T – T_c|$$

১৯৫২ সালে সি. এন. ইয়াং সন্ধি তাপমাত্রার নিচে স্বতঃস্ফূর্ত চুম্বকায়নের সঠিক রূপ বের করেন:

$$M(T) = left[ 1 – sinh^{-4}left(frac{2J}{k_B T}right) right]^{1/8} propto (T_c – T)^{1/8}$$

এখানে ক্রিটিক্যাল সূচক $beta = ১/৮ = ০.১২৫$—যা ল্যান্ডউয়ের অনুমানের ($beta = ১/২ = ০.৫$) চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। ওনসাগারের এই সমাধান অকাট্যভাবে প্রমাণ করেছিল যে চরম ওঠানামার মুহূর্তে চিরায়ত গড় ক্ষেত্র তত্ত্ব ভেঙে পড়ে এবং মসৃণ অণুর নিয়ম থেকেই প্রকৃতিতে পরম ম্যাক্রোস্কোপিক রূপান্তরের জন্ম হয়।