এক গ্লাস সাধারণ পানিতে প্রায় $১০^{২৪}$টি অণু থাকে। চিরায়ত বলবিদ্যা ব্যবহার করে প্রতিটি অণুর অবস্থান ও বেগ নিখুঁতভাবে জানতে হলে আমাদের একই সাথে $৬ times ১০^{২৪}$টি ব্যবকলনীয় সমীকরণ সমাধান করতে হবে—যা এই সমগ্র দৃশ্যমান মহাবিশ্বের যাবতীয় কম্পিউটারের ধারণক্ষমতার চেয়েও বেশি। তবুও তাপগতিবিদ্যা মাত্র তিনটি সংখ্যার সাহায্যে এই এক গ্লাস পানির সামগ্রিক অবস্থা ব্যাখ্যা করতে পারে: তাপমাত্রা, চাপ এবং আয়তন। এই বিস্ময়কর সরলীকরণ কীভাবে সম্ভব হলো? ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি ফরাসি গণিতবিদ জোসেফ লিওভিল হ্যামিল্টনীয় বলবিদ্যার এক যুগান্তকারী জ্যামিতিক উপপাদ্য আবিষ্কার করেছিলেন, যা পরিসংখ্যানিক বলবিদ্যার মূলভিত্তি স্থাপন করে: ফেজ স্পেস প্রবাহের অসংকোচনীয়তা।
হ্যামিল্টনীয় বলবিদ্যা ও ৬N-মাত্রিক ফেজ স্পেস
তাত্ত্বিক বলবিদ্যায় $N$ সংখ্যক কণার যেকোনো ব্যবস্থাকে $3N$ সংখ্যক সাধারণ স্থানাঙ্ক $mathbf{q} = (q_1, dots, q_{3N})$ এবং $3N$ সংখ্যক ভরবেগ $mathbf{p} = (p_1, dots, p_{3N})$ দ্বারা প্রকাশ করা হয়। এদের সমন্বয়ে গঠিত $6N$-মাত্রিক স্থানকে বলা হয় ফেজ স্পেস ($Gamma = mathbb{R}^{6N}$):
$$mathbf{x} = (mathbf{q}, mathbf{p}) = (q_1, dots, q_{3N}, p_1, dots, p_{3N}) in Gamma$$
এই মহাজাগতিক ব্যবস্থার কালানুক্রমিক বিবর্তন পরিচালিত হয় একটি একক স্কেলার অপেক্ষক—হ্যামিল্টোনিয়ান $H(mathbf{q}, mathbf{p}, t)$-এর মাধ্যমে, যা হ্যামিল্টনের ক্যানোনিকাল সমীকরণ মেনে চলে:
$$dot{q}_i = frac{partial H}{partial p_i}, quad dot{p}_i = -frac{partial H}{partial q_i} quad (i = 1, dots, 3N)$$
ফেজ স্পেসের প্রতিটি বিন্দু একটি নির্দিষ্ট মাইক্রোস্টেট নির্দেশ করে। সময় বাড়ার সাথে সাথে বিন্দুটি ফেজ স্পেসে একটি একমাত্রিক গতিপথ তৈরি করে। কিন্তু যেহেতু কোনো বাস্তব পরীক্ষায় ট্রিলিয়ন কণার অবস্থান একযোগে মাপা অসম্ভব, তাই জে. উইলার্ড গিবস একক কণার গতিপথ ভাবার পরিবর্তে একটি কাল্পনিক পরিসংখ্যানিক এনসেম্বল (ensemble)-এর ধারণা দেন: একই ব্যবস্থার অগণিত কল্পিত অনুলিপির সমষ্টি, যা একটি সম্ভাবনা ঘনত্ব $rho(mathbf{q}, mathbf{p}, t)$ দ্বারা নির্দেশিত হয়।
লিওভিলের উপপাদ্য: অসংকোচনীয় সিম্প্লেকটিক তরল
ফেজ স্পেসের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র আয়তন $dGamma = d^{3N}q , d^{3N}p$-তে ব্যবস্থাটিকে খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা $dP = rho(mathbf{q}, mathbf{p}, t) , dGamma$। যেহেতু মোট সম্ভাবনা সর্বদা সংরক্ষিত—কোনো ব্যবস্থা নিজে থেকে সৃষ্টি বা ধ্বংস হতে পারে না—তাই সম্ভাবনার ঘনত্বকে ফেজ স্পেসে একটি অবিচ্ছিন্নতার সমীকরণ (continuity equation) মেনে চলতে হয়:
$$frac{partial rho}{partial t} + nabla_{Gamma} cdot (rho dot{mathbf{x}}) = 0$$
হ্যামিল্টনের সমীকরণ ব্যবহার করে বেগের ডাইভারজেন্স বের করলে দেখা যায়:
$$frac{partial dot{q}_i}{partial q_i} + frac{partial dot{p}_i}{partial p_i} = frac{partial^2 H}{partial q_i partial p_i} – frac{partial^2 H}{partial p_i partial q_i} equiv 0$$
যেহেতু আংশিক ব্যবকলনের ক্রম অদলবদল করা যায়, তাই ফেজ স্পেসে হ্যামিল্টনীয় গতিবেগের ডাইভারজেন্স সর্বত্র নিখুঁতভাবে শূন্য! এর ফলে অবিচ্ছিন্নতার সমীকরণটি রূপ নেয় সম্পূর্ণ কনভেক্টিভ ডেরিভেটিভে:
$$frac{drho}{dt} = frac{partial rho}{partial t} + {rho, H} = 0$$
এটাই হলো বিখ্যাত লিওভিল উপপাদ্য। এর অর্থ হলো, ফেজ স্পেসে যেকোনো কণার গতিপথ ধরে চললে সম্ভাবনার ঘনত্ব সময়ের সাথে অপরিবর্তিত থাকে। জ্যামিতিকভাবে ভাবলে, ফেজ স্পেসে এনসেম্বল প্রবাহিত হয় একটি অসংকোচনীয় তরলের মতো। শুরুর একটি বিন্দুপুঞ্জের আয়তন যদি $delta Gamma_0$ হয়, বিশৃঙ্খল সংঘর্ষে তা যতই লম্বা, বাঁকানো বা জালের মতো বিস্তৃত হোক না কেন, তার মোট ফেজ আয়তন চিরকাল অপরিবর্তিত থাকে।
পোঁয়ানকারে পুনরাবৃত্তি ও সাম্যাবস্থার অসঙ্গতি
১৮৯০ সালে অঁরি পোঁয়ানকারে লিওভিল উপপাদ্যের এক বিস্ময়কর অনুসিদ্ধান্ত প্রমাণ করেন। যদি একটি আবদ্ধ ব্যবস্থার শক্তি সসীম হয় (অর্থাৎ মোট সুগম্য ফেজ স্পেসের আয়তন $Omega(E) < infty$), তবে ব্যবস্থাটি যথেষ্ট দীর্ঘ সময় পর প্রায় নিশ্চিতভাবেই তার আদি অবস্থার অত্যন্ত কাছাকাছি ফিরে আসবে: একে বলা হয় পোঁয়ানকারে রিকারেন্স টাইম।
এই উপপাদ্য বিজ্ঞানীদের মাঝে গভীর বিতর্কের জন্ম দিল: যদি ফেজ আয়তন সংরক্ষিত থাকে এবং অণুগুলো আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসতে বাধ্য হয়, তবে এন্ট্রপি বাড়ে কীভাবে? পানিতে এক ফোঁটা কালি পড়লে তা চিরতরে কেন মিশে যায়? উত্তর লুকিয়ে আছে সূক্ষ্ম (fine-grained) এবং স্থূল (coarse-grained) তথ্যের পার্থক্যে। তাত্ত্বিকভাবে সূক্ষ্ম আয়তন সংরক্ষিত থাকলেও, বিশৃঙ্খল গতি ফেজ স্পেসের প্রতিটি কোণে এত সূক্ষ্ম সুতোর মতো ছড়িয়ে পড়ে যে বাস্তব জগতের স্থূল পর্যবেক্ষণে কালি কখনোই আলাদা হতে পারে না—বরং তা চিরস্থায়ী সাম্যাবস্থায় পৌঁছে যায়।