চিরায়ত তাপগতিবিদ্যাকে আক্ষরিক অর্থে ‘থার্মো-ডাইনামিকস’ না বলে ‘থার্মো-স্ট্যাটিকস’ বলাই যুক্তিযুক্ত। এর চিরায়ত সূত্রগুলো ব্যাখ্যা করত পরম শান্ত ও সাম্যাবস্থায় স্থির হয়ে থাকা অপরিবর্তনীয় ব্যবস্থাকে। অথচ আমাদের জীবন্ত পৃথিবী ও আধুনিক প্রযুক্তি পরিচালিত হয় অবিরত প্রবাহের মাধ্যমে: তাপের প্রবাহ, বৈদ্যুতিক চার্জের সঞ্চালন, রাসায়নিক বিক্রিয়কের বিচ্ছুরণ এবং সান্দ্রীয় ভরবেগের রূপান্তর। ১৯৩১ সালে আটাশ বছর বয়সী নরওয়েজীয় রসায়নবিদ লার্স ওনসাগার Physical Review জার্নালে দুটি ঐতিহাসিক গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন, যা তাপগতিবিদ্যাকে অপ্রত্যাবর্তী প্রবাহের জগতে সম্প্রসারিত করে। ওনসাগার আবিষ্কার করেন যে একাধিক পরিবহন প্রক্রিয়া যখন পরস্পরের সাথে যুগ্মভাবে ক্রিয়া করে, তখন প্রকৃতি এক বিস্ময়কর গাণিতিক প্রতিসাম্য কার্যকর করে: আড়াআড়ি পরিবহন ম্যাট্রিক্সের উপাদানগুলো পরস্পর সমান।
তাপগতীয় বল, প্রবাহ ও এন্ট্রপি উৎপাদন
সাম্যাবস্থার কাছাকাছি একটি অপ্রত্যাবর্তী ব্যবস্থাকে বিশ্লেষণ করতে আমরা স্থানীয় আয়তনের উপব্যবস্থা কল্পনা করি। ব্যবস্থার ভেতরে তীব্র চলকের যেকোনো ব্যবধান বা গ্রেডিয়েন্ট তৈরি করে ধারাবাহিক প্রবাহ বা ফ্লাক্স ($J_i$) (যেমন তাপ প্রবাহ $mathbf{J}_q$ বা বিদ্যুৎ প্রবাহ $mathbf{J}_e$)। প্রতিটি প্রবাহ পরিচালিত হয় তার নিজস্ব অনুবন্ধী তাপগতীয় বল ($X_i$) দ্বারা:
- তাপ পরিবহনের জন্য বল: $X_q = -frac{nabla T}{T^2}$
- বিদ্যুৎ পরিবহনের জন্য বল: $X_e = -frac{nabla V}{T}$
- রাসায়নিক বিচ্ছুরণের জন্য বল: $X_k = -nablaleft(frac{mu_k}{T}right)$
দ্বিতীয় সূত্র অনুসারে অপ্রত্যাবর্তী প্রবাহ অনবরত এন্ট্রপি সৃষ্টি করে। প্রতি একক আয়তনে প্রতি সেকেন্ডে এন্ট্রপি উৎপাদনের হার ($sigma$) হলো প্রবাহ ও বলের একটি দ্বি-রৈখিক সমষ্টি:
$$sigma = sum_{i} J_i X_i ge 0$$
এই অসমতা $sigma ge 0$ প্রমাণ করে যে মহাবিশ্বে এন্ট্রপি কেবল সৃষ্টিই হতে পারে, কখনো ধ্বংস হতে পারে না।
রৈখিক পরিবহন সম্পর্ক ও যুগ্ম মিথস্ক্রিয়া
সাম্যাবস্থার কাছাকাছি চালিকা বলগুলোর মান ক্ষুদ্র হওয়ায় প্রতিটি প্রবাহকে সকল বলের একটি রৈখিক সমষ্টি হিসেবে প্রকাশ করা যায়:
$$J_i = sum_{j} L_{ij} X_j$$
এখানে $L_{ij}$ হলো পরিবহন সহগ:
- কর্ণ উপাদানগুলো $L_{ii}$ চিরায়ত সূত্র নির্দেশ করে: যেমন ফুরিয়ারের তাপ পরিবাহিতা বা ওহমের বিদ্যুৎ পরিবাহিতা।
- অ-কর্ণীয় উপাদানগুলো $L_{ij}$ ($i ne j$) নির্দেশ করে যুগ্ম মিথস্ক্রিয়া (cross-coupling)—যেখানে এক বিষয়ের গ্রেডিয়েন্ট সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ভৌত রাশির প্রবাহ তৈরি করে!
এর সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ হলো থার্মোইলেকট্রিসিটি: তাপমাত্রার পার্থক্য $nabla T$ কেবল তাপই পরিবহন করে না, তা ধাতুর ইলেকট্রনগুলোকে ঠেলে দিয়ে ভোল্টেজ বা বিদ্যুৎ প্রবাহ তৈরি করে (সীবেক ক্রিয়া / Seebeck Effect, $L_{eq}$)। বিপরীতভাবে ধাতব সংযোগে বিদ্যুৎ চালনা করলে তা তাপ টেনে নিয়ে শীতল বা উত্তপ্ত করে তোলে (পেল্টিয়ার ক্রিয়া / Peltier Effect, $L_{qe}$)।
ওনসাগারের প্রতিসাম্য উপপাদ্য ও মাইক্রোস্কোপিক রিভার্সিবিলিটি
প্রায় এক শতাব্দী ধরে প্রকৌশলীরা সীবেক ও পেল্টিয়ার সহগকে দুটি সম্পূর্ণ স্বাধীন বৈশিষ্ট্য মনে করতেন। কিন্তু ১৯৩১ সালে ওনসাগার হ্যামিল্টনীয় মেকানিক্সের আণুবীক্ষণিক কাল-প্রতিসাম্য ($langle alpha_i(0) alpha_j(t) rangle = langle alpha_i(t) alpha_j(0) rangle$) প্রয়োগ করে প্রমাণ করেন তার অবিস্মরণীয় উপপাদ্য:
ওনসাগার রেসিপ্রোকাল সম্পর্ক: যদি তাপগতীয় বল $X_i$ এবং প্রবাহ $J_i$ এমনভাবে নির্বাচিত হয় যাতে এন্ট্রপি উৎপাদন $sigma = sum J_i X_i$ হয়, তবে পরিবহন ম্যাট্রিক্সটি সর্বদা নিখুঁত প্রতিসম হতে বাধ্য:
$$L_{ij} = L_{ji}$$
ব্যবস্থায় বাহ্যিক চৌম্বক ক্ষেত্র $mathbf{B}$ উপস্থিত থাকলে ক্যাসিমির এর রূপ নির্ধারণ করেন: $L_{ij}(mathbf{B}) = L_{ji}(-mathbf{B})$।
তাপগতিবিদ্যার চতুর্থ সূত্র
ওনসাগারের এই সম্পর্কটি বিজ্ঞানে এত গভীর যে বহু বিজ্ঞানী একে “তাপগতিবিদ্যার চতুর্থ সূত্র” হিসেবে অভিহিত করেন। এটি প্রমাণ করে যে প্রকৃতির আড়াআড়ি প্রভাবগুলো এক অলৌকিক সুরে বাঁধা: তাপমাত্রার পার্থক্য যত সহজে ভোল্টেজ তৈরি করতে পারে, একটি ভোল্টেজ ঠিক ততখানি নিখুঁত দক্ষতায় তাপীয় পাম্পিং করতে সক্ষম।
গবেষণাপত্র প্রকাশের দীর্ঘ সাঁইত্রিশ বছর পর ১৯৬৮ সালে লার্স ওনসাগারকে রসায়নে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়। ওনসাগারের এই সূত্রই আধুনিক অপ্রত্যাবর্তী তাপগতিবিদ্যার স্বর্ণদ্বার উন্মোচন করেছিল।