১৮৬৭ সালে জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল এমন এক কাল্পনিক সত্ত্বার অবতারণা করেছিলেন যা শতবর্ষ ধরে পদার্থবিজ্ঞানীদের ঘুম হারাম করে রেখেছিল। ধরা যাক একটি পাত্রকে মাঝখানে ছিদ্রযুক্ত একটি দেওয়াল দিয়ে $A$ ও $B$ দুই প্রকোষ্ঠে ভাগ করা হলো। ছিদ্রের মুখে বসে আছে এক অতিক্ষুদ্র বুদ্ধিমান সত্ত্বা—ম্যাক্সওয়েলের “ডিমন” (Demon)। ডিমন প্রতিটি অণুর গতি লক্ষ্য করে। যখন $A$ থেকে দ্রুতগামী গরম অণু আসে, ডিমন দরজা খুলে তাকে $B$-তে যেতে দেয়; আর যখন $B$ থেকে ধীরগতির শীতল অণু আসে, তাকে $A$-তে পাঠায়। কোনো যান্ত্রিক কাজ না করেই সময়ের সাথে সাথে প্রকোষ্ঠ $B$ আরও উত্তপ্ত এবং প্রকোষ্ঠ $A$ আরও শীতল হয়ে যায়—যা তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্রকে সরাসরি লঙ্ঘন করে। এই ধাঁধার সমাধান করতে বিজ্ঞানীদের সময় লেগেছিল ১১৫ বছর, যা পদার্থবিজ্ঞান ও তথ্যতত্ত্বের (Information Theory) মাঝে এক অমর সেতুবন্ধন তৈরি করে: তথ্যও এক ধরনের পদার্থ।
জিলার্ডের একক-অণু ইঞ্জিন (১৯২৯)
১৯২৯ সালে হাঙ্গেরীয় পদার্থবিদ লিও জিলার্ড ম্যাক্সওয়েলের এই চিন্তন-পরীক্ষাকে চরমতম সরল রূপে নামিয়ে আনেন। $T$ তাপমাত্রার আধারের সংস্পর্শে থাকা একটি পাত্রে মাত্র একটি একক গ্যাস কণা রয়েছে। জিলার্ড ইঞ্জিনটি চারটি ধাপে কাজ করে:
- দেওয়াল স্থাপন: পাত্রের ঠিক মাঝখানে একটি ঘর্ষণহীন দেওয়াল নামিয়ে পাত্রটিকে সমান দুই ভাগে ভাগ করা হলো।
- পরিমাপ: পর্যবেক্ষক লক্ষ্য করে কণাটি বামে ($L$) না ডানে ($R$) আছে। এর মাধ্যমে পর্যবেক্ষক ১ বিট তথ্য অর্জন করে।
- সমোষ্ণ কাজ আহরণ: কণাটি যদি বামে থাকে, তবে ডানদিক থেকে একটি পিস্টন যুক্ত করা হয়। কণাটির ধাক্কায় পিস্টন প্রসারিত হয়ে কাজ আহরণ করে:
$$W = k_B T ln 2$$ - রিসেট: দেওয়াল সরিয়ে আদি অবস্থায় ফিরে যাওয়া হয়।
এখানে একটি মাত্র তাপ আধার থেকে ১০০% দক্ষতায় তাপকে কাজে রূপান্তর করা হলো! জিলার্ড বুঝতে পেরেছিলেন যে দ্বিতীয় সূত্র রক্ষা করতে হলে ১ বিট তথ্য সংগ্রহের পেছনে অন্তত $Delta S ge k_B ln 2$ পরিমাণ এন্ট্রপির মূল্য চোকাতে হবে।
পরিমাপের ভুল ধারণা ও ল্যান্ডউয়ারের মূলনীতি (১৯৬১)
বহু দশক ধরে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন যে অণুকে দেখতে গিয়ে আলোর ফোটন নিক্ষেপের সময় (পরিমাপের মুহূর্তে) এই শক্তি অপচয় হয়। কিন্তু ১৯৬১ সালে আইবিএমের গবেষক রলফ ল্যান্ডউয়ার এক যুগান্তকারী সত্য উন্মোচন করেন: নিখুঁত কোয়ান্টাম পদ্ধতিতে তথ্য পরিমাপ করতে তাত্ত্বিকভাবে কোনো শক্তির অপচয় প্রয়োজন হয় না!
ল্যান্ডউয়ার দেখান যে শক্তির আসল অপচয় ঘটে পরিমাপে নয়, বরং তথ্য মুছে ফেলার (Memory Erasure) মুহূর্তে। একটি চক্রাকার ডিমনকে প্রতিবার নতুন পরিমাপ করার আগে তার স্মৃতিভাণ্ডার থেকে পূর্ববর্তী ১ বিট তথ্য ($0$ বা $1$) মুছে ফেলে আদি শূন্য ($0$) অবস্থায় ফিরে যেতে হয়:
$${0, 1} xrightarrow{text{মুছে ফেলা}} 0$$
এই প্রক্রিয়াটি যৌক্তিকভাবে অপ্রত্যাবর্তী (logically irreversible)। মেমোরির দুটি ভিন্ন দশাকে একটিমাত্র দশায় সংকুচিত করায় এর নিজস্ব তথ্য এন্ট্রপি হ্রাস পায় $Delta S_{text{memory}} = -k_B ln 2$। মহাবিশ্বের মোট এন্ট্রপি যেহেতু কমতে পারে না, তাই এই এন্ট্রপিকে তাপ হিসেবে পরিবেশে নিক্ষেপ করতে হয়:
$$Q_{text{dissipated}} ge k_B T ln 2$$
ল্যান্ডউয়ারের নীতি: যেকোনো যৌক্তিকভাবে অপ্রত্যাবর্তী তথ্য প্রক্রিয়াকরণ—যেমন ১ বিট তথ্য মুছে ফেলার জন্য—পরিবেশে সর্বনিম্ন $W_{text{diss}} = k_B T ln 2$ পরিমাণ তাপ শক্তি অপচয় করা বাধ্যতামূলক।
বেনেট কর্তৃক ডিমনের চূড়ান্ত মুক্তি (১৯৮২)
১৯৮২ সালে আইবিএমের চার্লস বেনেট ল্যান্ডউয়ারের নীতি প্রয়োগ করে ম্যাক্সওয়েলের ডিমনের চিরতরে সমাধান করেন। ডিমন কোনো শক্তি খরচ না করেই অণুর গতি মাপতে পারে, কাজও আহরণ করতে পারে। কিন্তু ডিমনের মস্তিষ্ক বা কম্পিউটার একটি ভৌত ব্যবস্থা। চক্র সম্পূর্ণ করতে হলে ডিমনকে তার মেমোরি রিসেট করতে হয়। আর প্রতি বিট তথ্য মুছতে গিয়ে ঠিক $k_B T ln 2$ তাপ পরিবেশে নির্গত হয়—যা আহরিত কাজের সমান হয়ে দ্বিতীয় সূত্রকে অক্ষুণ্ণ রাখে:
$$Delta S_{text{total}} ge 0$$
কক্ষ তাপমাত্রায় ($৩০০ , text{K}$) ল্যান্ডউয়ারের এই সর্বনিম্ন সীমা হলো $২.৮৭ times ১০^{-২১} , text{Joules}$। আধুনিক কম্পিউটার চিপগুলো বর্তমানে এর চেয়ে প্রায় ১০০০ গুণ বেশি শক্তি ব্যয় করলেও ভবিষ্যতে ন্যানো-স্কেল কম্পিউটিং এই প্রাকৃতিক সীমার মুখোমুখি হবে। ল্যান্ডউয়ারের অমর বাণী সত্য প্রমাণিত হয়েছিল: তথ্য কোনো বিমূর্ত শূন্যতা নয়, তথ্য হলো খাঁটি পদার্থবিদ্যা।